Thursday , 19 July 2018
Breaking News
Home » মিথলজি » তারকামণ্ডলীদের নিয়ে পৌরাণিক কাহিনী: পর্ব – ০৩ (মিথুন তারকামণ্ডল)

তারকামণ্ডলীদের নিয়ে পৌরাণিক কাহিনী: পর্ব – ০৩ (মিথুন তারকামণ্ডল)

আগের পর্ব দু’টোয় আমরা মেষ ও বৃষ তারকামণ্ডলের মিথলজি সম্পর্কে জেনেছি। আজকে আমরা মিথুন তারকামণ্ডল সম্পর্কে জানবো। একে ইংরেজিতে ‘Gemini’ বলা হয়।

a

তারকামণ্ডলীদের নিয়ে পৌরাণিক কাহিনী: পর্ব – ০১

তারকামণ্ডলীদের নিয়ে পৌরাণিক কাহিনী: পর্ব – ০২

অনেক তারামণ্ডল নিয়ে একাধিক কাহিনী থাকলেও মিথুন এদিক দিয়ে ভিন্ন। মিথুনকে নিয়ে একটাই কাহিনী প্রচলিত, ক্যাস্টর-পোলাক্স যমজকে নিয়ে। তাদের মা একজনই, নাম লেডা। মা একজন হলেও এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, তাদের দু’জনের বাবা দু’জন। ক্যাস্টরের বাবার নাম টিনডারুস, সে ছিল স্পার্টানের রাজা আর লেডা ছিলো তার রাণী। আর দেবরাজ জিউস ছিলো পোলাক্সের বাবা। এ কারণেই দুই জমজ ভাইয়ের একজন পোলাক্স অমর (ডেমিগড বলে)। অন্যজন, ক্যাস্টর, মরণশীল। আবার অনেক বর্ণনায় বলা হয়, দু’জনের জন্ম একইসাথে এবং ‘হেলেন অব ট্রয়’ ছিলো এই জমজ ভাইদের এক বোন। অনেক মিথলজির বর্ণনায় কখনো দুই ভাইই মরণশীল, কখনো দু’জনেই অমর। তবে যদি অন্তত একজন এদের মাঝে অমর হয়ে থাকে, তবে সেটা হচ্ছে পোলাক্স।

সৌন্দর্য্যের কারণে লেডার খ্যাতি ছিলো অনেক। জিউসেরও তাকে অনেক পছন্দ ছিলো। তাই সে সুযোগ খুঁজছিলো লেডার কাছে যাবার। একদিন লেডা সমুদ্রে গোসল করতে গেলে জিউস এক ফন্দি আঁটে। আকাশে চিল উড়িয়ে দিয়ে সে নিজেকে চিলের ভয়ে পলায়নরত এক রাজহাঁসের রূপ ধরে লেডার দিকে এগিয়ে আসে। লেডাও চিলের হাত থেকে রাজহাঁসটিকে বাচাঁনোর জন্য একে বুকে আগলে ধরে, আর ধূর্ত জিউস এই সুযোগটাই কাজে লাগায় তাকে গর্ভবতী করতে! গর্ভবতী হলে, লেডা দুটি ডিম পাড়ে কোনো মানবসন্তানের বদলে! একটি ডিম থেকে ক্যাস্টর, অন্য ডিম থেকে পোলাক্সের জন্ম হয়।

তারা দু’জন দেখতে ও কাজকর্মে যমজের মতোই ছিল। দেখতে সুদর্শন ছিলো, ছিলো রোমাঞ্চপ্রিয়ও। তাদের কৌতূহলের জন্য সবাই তাদের চিনতো। অভিযান যত কঠিনই হোক, তাদের তা করা চাই-ই চাই। পোলাক্সের শক্তি ছিলো অনেক, সে ছিলো কুস্তিগীর। ক্যাস্টর ভালো ঘোড়াসওয়ার ছিলো, খুব ভালো তরবারি চালাতো (বলা হয়, সে-ই হারকিউলিসকে তরবারি চালনা শিখায়)। সে অনেক অলিম্পিক (তৎকালীন গ্রিসে হওয়া অলিম্পিক, ওটা থেকেই এখনকার যুগের অলিম্পিকের উৎপত্তি) পদক জিতেছে। অন্য খেলোয়াড়দের কাছে সে দেবতাতুল্য ছিলো।

যেমনটা বলেছি, তাদের এক বিখ্যাত বোন ছিল, নাম হেলেন। হেলেনকে চিনে না, এমন মানুষ এখনকার যুগেও কমই পাওয়া যাবে। গ্রিস-ট্রয়ের বিখ্যাত যুদ্ধের কারণ কিন্তু এই হেলেনই ছিলো। ট্রয়ের রাজকুমার প্যারিস হেলেনকে নিয়ে ট্রয়ে পালিয়ে এলেই গ্রিকরা ট্রয়ে এসে হামলা করে। বলা হয় যে, হেলেনকে বিয়ে করতে গ্রিসের সব রাজা ও যুবরাজরা এসেছিলো। হেলেন তার মধ্য হতে মেনেলাউসকে তার স্বামী হিসাবে বেছে নেয়। এ নিয়ে যাতে কোনো সংঘাত না হয়, তাই তখন সবাই মিলে একটা চুক্তি করে যে, হেলেনের যেকোনো বিপদে তারা সবাই এগিয়ে আসবে। আর, সেটাই হয়েছিল। বোনকে উদ্ধারে গ্রীস-ট্রয়ের যুদ্ধে ক্যাস্টর-পোলাক্স দুই যমজ ভাই-ই অংশ নেয়, আরগোনটসদের পক্ষে। যুদ্ধের পর তারা একবার এক যুবকের সাথে মারামারিতে জড়ায়। এটা আস্তে আস্তে ভয়াবহ রূপ নেয়। অবশেষে সেই সংঘাত থেকেই ক্যাস্টরের মৃত্যু হয়, আর পোলাক্স বেঁচে যায়।

ক্যাস্টর মারা যায়, কারণ সে অমর ছিলো না। পোলাক্স তার ভাইয়ের এ অপমৃত্যু নিয়ে অনেক হতাশ ছিলো। তারা সব কাজই একসাথে করতো। কি জীবনটাই দুইভাই একত্রে কাটানোর পরিকল্পনা করছিলো। কিন্তু, নিয়তির খেলা ছিল ভিন্ন। ক্যাস্টর চলে গেলো, পোলাক্স একা রয়ে গেলো। সেও ক্যাস্টরের সাথেই মরে যেতে চেয়েছিলো; কিন্তু সে তো অমর! তাই তার কিছুই করার ছিলো না।

একা থাকতে না পেরে সে তার বাবা জিউসের কাছে গেল। বললো, হয় আমার ভাইকে জীবিত করো, নয় আমাকে তার কাছে পাঠিয়ে দাও। জিউসের তার নিজের সন্তানকে হত্যার কোনো কারণই নেই – তাই সে ক্যাস্টরকে বাঁচিয়ে অমর করে দিলো। আর, এভাবেই দুইভাই মিথুন রূপে সারাজীবন একসাথে থেকে গেলো রাতের আকাশে।

আরেকটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, জিউস কর্তৃক গর্ভবতী হওয়ার পর লেডা প্রথমে পলিডিউস ও হেলেন এবং পরে আবার ক্যাস্টর ও ক্লাইটেমনেস্ট্রার জন্ম দেয় (ক্লাইটেমনেস্ট্রার সাথে আগামেননের বিয়ে হয়। আগামেনন ছিলো গ্রীস-ট্রয়ের যুদ্ধে গ্রীসপক্ষের প্রধান। ক্লাইটেমনেস্ট্রাই আগামেননকে ঘটনাক্রমে হত্যা করে এবং তাদের পুত্র ওরেস্টেস আবার পরে তাকে হত্যা করে)।

আরগোনটসদের সোনালি পশম খোঁজার দলের তারা সদস্য ছিলো। ঘটনাক্রমে তারা অ্যামিকাসের (পোসাইডনের ছেলে, তৎকালীন এশিয়ার রাজা) এলাকায় এলে অ্যামিকাস তাদের কুস্তিতে আমন্ত্রণ জানায়। অ্যামিকাস আগে থেকেই কিছু আরগোনোটসকে বন্দি করে রেখেছিলো। তাদের বাঁচাতে পোলাক্স চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে ও সহজেই কুস্তিতে জিতে যায়। তারা বেশ কিছু কারণেই আরগোনটসদের বাঁচাতে আসে। তাদেরকে “নাবিকদের রক্ষক” বলা হতো। তাদের জাহাজভাঙ্গা নাবিকদের বাঁচানোর ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। এমনকী, পোসাইডন স্বয়ং তাদের দুটি সাদা ঘোড়া দিয়েছিলো। আর, রক্ষক বলেই নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা তাদের বাঁচাতে আসে।

এই যমজ সেন্ট এলমোর আগুনের সাথেও সম্পর্কিত। এটা আবহাওয়া সংক্রান্ত এক ধরণের বৈদ্যুতিক ঘটনা। এটির নামকরণ নাবিকদের আরেক রক্ষকের নামে করা হয়, যার নাম – সেন্ট ইরাসমাস অফ ফরমিয়া। সেন্ট এলমোর আগুন একটা উজ্জ্বল বলের আকারে বিদ্যুৎ চমকানোর সাথে দেখা দিতো, যা নাবিকদের জানিয়ে দিতো যে, তাদের রক্ষাকর্তা তাদের সাথেই আছেন।

ঘটনাক্রমে, ক্যাস্টর ও পলিডিউসের মারামারি লাগে ইডাস ও লিনসিয়াসের সাথে, ফীবি ও হিলাইরা নামে দুই মেয়ের জন্য। ফীবি ও হিলাইরার সাথে ইডাস ও লিনসিয়াসের বাগদানও হয়ে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও জমজ দুই ভাই তাদের নিয়ে পালাতে নিলে এ সংঘর্ষ বাঁধে। ইডাস ও লিনসিয়াস তাদের ধাওয়া করে ধরে ফেলে। লিনসিয়াস ক্যাস্টরকে তলোয়ারের কোপে মেরে ফেলে। পালটা আঘাতে পলিডিউসও লিনসিয়াসকে মেরে ফেলে। ইডাস তার ভাইকে মরতে দেখে পলিডিউসকে মারত তেড়ে আসে। জিউস তার পুত্রের দুর্গতি দেখে বজ্র নিক্ষেপ করেন ও তাকে রক্ষা করেন। পলিডিউস তার অমরত্ব তার ভাইয়ের সাথে শেয়ার করতে চাইলে জিউস তাতে সম্মতি দেন ও তাদের আকাশে তুলে দেন। আলফা ও বিটা তারা এই দুই ভাইয়ের দুই মাথা নির্দেশ করে।

তবে সবাই যে, ক্যাস্টর ও তার ভাইকে এই তারা দিয়ে চিহ্নিত করেছে, তা নয়। হাইজিনাস ও টলেমী দুটো তারাকে অ্যাপোলো ও হেরাক্লিসের সাথেও সম্পর্কযুক্ত বলে মানতেন; যারা ছিল জিউসের দুই ছেলে।

মিথুন তারকামণ্ডল নিয়ে কিছু তথ্য
অবস্থান উত্তরাকাশে। ল্যাটিন ভাষায় ‘জেমিনি’ শব্দের অর্থ ‘যমজ’। এর তারাগুলো হলো, ক্যাস্টর (আলফা জেমিনোরাম), পোলাক্স (বিটা জেমিনোরাম), আলহেনা (গামা জেমিনোরাম), মেবসুতা (ইপ্সাইলন জেমিনোরাম) ইত্যাদি।

লিখেছেন – আজমাইন তৌসিক ওয়াসি

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

About Admin