Tuesday , 17 July 2018
Breaking News
Home » মিথলজি » বিভিন্ন পুরাণের প্রেম কাহিনীগুলোঃ এডোনিস এবং আফ্রোদিতি (গ্রীক পুরাণ)

বিভিন্ন পুরাণের প্রেম কাহিনীগুলোঃ এডোনিস এবং আফ্রোদিতি (গ্রীক পুরাণ)

‘এডোনিস’ নামটা এসেছে ক্যানানাইট (উত্তরপূর্ব সেমিটিক ভাষা; ফিনিশীয় এবং প্রাচীন ইসরাইলীয় সভ্যতার ভাষা এর অন্তর্গত) শব্দ ‘আদন’ থেকে। আদনের মানে হচ্ছে ‘প্রভু’। গ্রীক পুরাণে এডোনিস ছিলো চিরসবুজ প্রকৃতির দেবতা। সেই সাথে ছিলো সৌন্দর্য এবং উর্বরতার প্রতীক। আমাদের আজকের গল্পটা মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগে থাকবে দেবতা এডোনিসের জন্ম কাহিনী। সেই জন্ম কাহিনীর সুবাদে মঞ্চে প্রবেশ করবে ভালোবাসার দেবী আফ্রোদিতি। দ্বিতীয় ভাগে থাকবে এডোনিসের লালনপালনের কাহিনী। আর তৃতীয় ভাগে থাকবে আফ্রোদিতির সাথে এডোনিসের ভালোবাসার উপাখ্যান।

আ

বিভিন্ন পুরাণের প্রেম কাহিনীগুলোঃ তাম্মুজ এবং ইশতার (ব্যাবিলনীয় এবং সুমেরীয় পুরাণ)

এডোনিসের জন্ম

রোমান মহাকবি ‘অভিদ’-এর বর্ণনায় (মেটামরফসিস – ১০ম খণ্ড) পাওয়া যায়, সাইপ্রাসের রাজা ‘সিনাইরাস’-এর ছিলো এক রূপবতী কন্যা ‘মিরিয়া’ (কোনো কোনো বর্ণনায় আবার রাজার নাম বলা হয়েছে ‘থিয়াস’)। সিনাইরাস তার অনিন্দ্যসুন্দরী কন্যার রূপের প্রশংসা করতে গিয়ে তাকে প্রায়ই ভালোবাসা ও সৌন্দর্যের দেবী আফ্রোদিতির সাথে তুলনা করতো (রোমানদের কাছে দেবী আফ্রোদিতির নাম ছিলো ‘ভেনাস’)। যখন আফ্রোদিতি দেখলো ব্যাপারটা, ভীষণ ক্ষেপে গেলো সে। ক্ষেপে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিলো রাজাকে শাস্তি দেয়ার। আর এইজন্যে আফ্রোদিতি দ্বারস্থ হলো তারই পুত্র, কামনার দেবতা ‘এরোজ’-এর নিকট। এরোজের জাদুর বাণে রাজকুমারী মিরিয়া তার পিতাকে প্রলুব্ধ করতে বাধ্য হলো যৌনমিলনে। এই মিলনের ফলে গর্ভবতী হয়ে পড়লো মিরিয়া।

রাজা সিনাইরাস যখন বুঝতে পারলো নিজের কন্যার সাথেই শারীরিক ভাবে মিলিত হয়েছে, তখন প্রচণ্ড ঘৃণায় এবং রাগে অন্ধ হয়ে গেলো সে। নিজ কন্যা এবং তার গর্ভের সন্তানকে হত্যা করতে খোলা তরবারি হাতে ছুটলো সে। পিতার ধাওয়া খেয়ে প্রাণ বাঁচাতে পালাতে লাগলো মিরিয়া। ভীষণ লজ্জিত এবং অনুতপ্ত হয়ে পড়েছিলো সে এহেন কৃতকর্মের জন্যে। তাই অনুশোচনায় দগ্ধ হয়েই দেবদেবীদের কাছে প্রাণ বাঁচাতে সাহায্য প্রার্থনা করলো মিরিয়া। তার আহবানে সাড়া দিলো স্বর্গের দেবতারা। মিরিয়াকে বানিয়ে দিলো ‘মির গাছ’ (আঠালো কষ বিশিষ্ট এক প্রকার রাবার গাছ)। মিরিয়া গাছে পরিণত হবার সময়েই রাজা সিনাইরাস একটা কোপ বসিয়েছিলো গাছের গোড়ায়। তাতে এক গর্তের সৃষ্টি হয়েছিলো গাছের গুঁড়িতে। নয় মাস পরে সেই ফোকরের ভিতর থেকেই জন্ম নিলো ‘এডোনিস’।

এডোনিসের লালনপালন

শিশু এডোনিস ছিলো বর্ণনাতীত রকমের সুন্দর। কিন্তু তাকে লালনপালনের জন্যে কেউ ছিলো না। তার মাতা মির গাছে রূপান্তরিত হয়ে বেঁচে আছে, আর পিতা তো তাকে হাতে পেলে খুনই করে ফেলবে! তখন এডোনিসের লালনের জন্যে এগিয়ে এলো দেবী আফ্রোদিতিই। এডোনিসের অসামান্য রূপে মুগ্ধ হয়ে পড়েছিলো সে। সেই মুগ্ধতা থেকেই আফ্রোদিতি সিদ্ধান্ত নিলো এডোনিসকে বাকি সব মানুষ এবং দেবদেবী হতে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখবে। তাই তাকে একটা সিন্দুকে ভরে সেই সিন্দুকটা আফ্রোদিতি রেখে আসলো পাতালের মৃত্যুপুরীর দেবী পার্সেফোনের কাছে। মৃত্যুপুরীতে স্বর্গের কোনো দেবদেবী যায় না। মানুষেরাও সেখানে জীবিত ঢুকতে পারে না। সুতরাং এডোনিস সেখানে নিরাপদ। পার্সেফোনেকে সিন্দুকটা বিশ্বাস করে দেয়ার সময়ে বারে বারে স্মরণ করিয়ে দিলো আফ্রোদিতি, কেউ যাতে সিন্দুকটা না খুলে। তাতে ভয়ানক বিপদ হবে। পার্সেফোনেও তাকে আশ্বাস দেয় সিন্দুক না খুলার ব্যাপারে। আফ্রোদিতি হালকা মনে ফিরে যায় স্বর্গে।

এদিকে পার্সেফোনের মনে দিনে দিনে কৌতূহল জন্মাতে থাকে সিন্দুকটা নিয়ে। একদিন আর না পেরে শর্ত ভঙ্গ করে খুলেই ফেলে সে সিন্দুকটা। খুলতেই বেরিয়ে আসে অনিন্দ্যসুন্দর এক শিশু। আফ্রোদিতির মতো পার্সেফোনেও মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে শিশুটার এমন অভাবনীয় সৌন্দর্যে। সে তাকে নিজের সন্তানের মতো করে লালনপালন করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে আফ্রোদিতি যখন ফেরত চায় এডোনিসকে, তখন পার্সেফোনে তাতে অস্বীকৃতি জানায়। ব্যস! ধুন্ধুমার লেগে গেলো এডোনিসকে নিয়ে দুই দেবীর মাঝে।

এই ঝামেলা মিটাতে পরে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিলো স্বয়ং দেবতা জিউসকে। ভালোবাসার দেবী এবং মৃত্যুর দেবী, দুইজনের কথাই শুনলো জিউস। তারপরে সিদ্ধান্ত দিলো, বছরের তিন ভাগের এক ভাগ সময় এডোনিস পার্সেফোনের কাছে থাকবে, এক ভাগ সময় সে থাকবে আফ্রোদিতির কাছে।, আর বাকি একভাগ সময় সে নিজের ইচ্ছামতো যেখানে মন চায় থাকবে। জিউসের আদেশ শিরোধার্য! এডোনিস বছরে চার মাস থাকতে লাগলো দেবী আফ্রোদিতির সাথে স্বর্গে, আর চার মাস সময় দেবী পার্সেফোনের সাথে পাতালে। এদিকে এডোনিস দেবী আফ্রোদিতিকে ভীষণ পছন্দ করতো। তাই দেখা গেলো, যে চার মাস সময় সে নিজের জন্যে হাতে পাচ্ছে, সেই সময়টুকুও সে আফ্রোদিতির সাথে কাটাচ্ছে। ফলে যখন এডোনিস পাতালে থাকে, তখন পৃথিবীতে বিরাজ করে শীত, ভূমিরা থাকে অনুর্বর। আর বাকি সময়টায় প্রকৃতি থাকে সতেজ-সবুজ।

এর আগে আমরা যে তাম্মুজ এবং ইশতারের গল্প পড়েছিলাম, সেটারই গ্রীক সংস্করণ হচ্ছে এডোনিসের গল্পটা। সেখানে বলা হয়েছিলো, ব্যাবিলনীয় দেবী ইশতারের গ্রীক সংস্করণ হচ্ছে আফ্রোদিতি। এখন সেই সাথে যোগ করা যায়, সেমিটিক দেবতা ‘তাম্মুজ’-এর (উর্বরতা এবং চিরসবুজ প্রকৃতির প্রতীক) গ্রীক সংস্করণ হলো দেবতা এডোনিস। সুমেরীয় পুরাণের ‘ইনান্না-তমুজিদ’ কিংবা আক্কাদীয় এবং ব্যাবিলনীয় পুরাণের ‘ইশতার-তাম্মুজ’-এর গল্পটাই নিও-ক্লাসিকাল যুগে ভিন্ন রূপে ঠাঁই পেয়েছে গ্রীক পুরাণে, ‘অভিদ’-সহ বিভিন্ন মহাকবির কাব্যগ্রন্থে।

দেবী আফ্রোদিতির সাথে এডোনিসের প্রণয়

এডোনিস যতই বড় হচ্ছিলো, ততই বাড়ছিলো তার শিকারের দক্ষতা। যৌবনে পা ফেলতে ফেলতেই দুর্ধর্ষ শিকারি হয়ে উঠেছিলো সে। বনে-বাদাড়ে চরে বেড়াতো সারাদিন। শিকারের দক্ষতার পাশাপাশি রূপে-সৌন্দর্যেও দারুণ খোলতাই হয়েছিলো যুবক এডোনিসের সুঠাম শরীর। দেবী আফ্রোদিতি ভীষণ প্রেমে পড়ে গিয়েছিলো তার। আফ্রোদিতি চাইতো এডোনিসকে সারাক্ষণ নিজের কাছে কাছে রাখতে। দেবী তাকে বলতো, শিকারের মতো বিপজ্জনক খেলায় মস্ত বড় ক্ষতি হতে পারে তার। সে যেন এসব থেকে দূরে থাকে। কিন্তু শিকারের নেশায় মত্ত এডোনিসকে ঘরে বেঁধে রাখে কে? ফলে আফ্রোদিতির নিষেধ উপেক্ষা করেই বনের এমাথা-ওমাথা ঘুরে বেড়াতো।

এখানে এসে গল্পটা দুই সংস্করণে পাওয়া যায়। এক সংস্করণে বলা হয়, শিকারের দেবী আর্তেমিস এডোনিসের শিকারের দক্ষতায় ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠেছিলো। ফলে সে একটা বুনো দাঁতাল শুকরকে লেলিয়ে দেয় এডোনিসের পিছনে। সেই হিংস্র দাঁতাল শুকরের আঘাতে মারা যায় এডোনিস। আরেক সংস্করণে বলা হয়, যুদ্ধের দেবতা অ্যারিস (Ares) ভালোবাসতো দেবী আফ্রোদিতিকে। কিন্তু আফ্রোদিতি ভালোবাসতো এডোনিসকে। ফলে প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে হিংসা বশত এক দাঁতাল শুকরের মাধ্যমে এডোনিসকে হত্যা করে দেবতা অ্যারিস।

যাই হোক, শুকরের আঘাতে এডোনিস যখন আহত হয়ে পড়ে রয়েছে বনে, তখন তার আর্তনাদে স্বর্গীয় রথে চড়ে সেখানে নেমে আসে দেবী আফ্রোদিতি। রথ থেকে নেমে ছুটে এসে কোলে তুলে নেয় এডোনিসের মাথাটা। অভিসম্পাত করে ভাগ্য এবং আর্তেমিস/অ্যারিসকে, এডোনিসের মৃত্যুর কারণ হবার জন্যে। পরিশেষে শুনশান বনে আফ্রোদিতির কোলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে এডোনিস। জখমের স্থান থেকে যেসব রক্তের ফোঁটা পড়ছিলো, সেগুলো দিয়ে ‘অ্যানেমোন’ নামক এক ফুল তৈরি করে দেবী আফ্রোদিতি তাদের ভালোবাসার স্মরণে। এদিকে এডোনিসের রক্ত গড়িয়ে গিয়ে পড়ে বনের পাশের নদীতে। তাতে লাল হয়ে যায় নদীর জল। এই নদীটার নাম হয় ‘এডোনিস নদী’ (বর্তমানে লেবাননের আফকা নামক গ্রামের পাশে অবস্থিত নদীটি ‘নহরে ইব্রাহিম’ নামে পরিচিত)।

এডোনিসের মৃত্যুতে ভীষণ খুশি হয় পার্সেফোনে। এখন থেকে সে পাতালেই থাকবে আজীবন পার্সেফোনের সাথে। কিন্তু আফ্রোদিতি মানতে চাইলো না। অশ্রুসিক্ত নয়নে গিয়ে দাঁড়ালো জিউসের সামনে। দেবীকে শান্ত করতে তখন জিউস বাধ্য হয়ে নতুন নিয়ম জারি করলো। এখন থেকে বছরের অর্ধেকটা সময় এডোনিস পার্সেফোনের সাথে পাতালে থাকবে, আর বাকি অর্ধবছর স্বর্গে থাকবে আফ্রোদিতির সাথে। এই ব্যাপারটাকে গ্রীক পুরাণে প্রতীকী হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। পুরুষেরা তাদের জীবনটা দুই নারীর নিকট কাটিয়ে দেয়। অর্ধেকটা জীবন মায়ের সাথে, আর বাকি অর্ধেকটা জীবন স্ত্রীর সাথে। সেটার প্রতীক হিসেবেই ধরা হয় এডোনিসের এই অর্ধবছর করে পাতালে এবং স্বর্গে থাকার ঘটনাটাকে।

তথ্যসূত্র:
১। http://www.ancient.eu/Adonis/
২। https://www.greekmyths-greekmythology.com/myth-aphrodite-adonis/
৩। http://www.greeka.com/greece-myths/adonis.htm
৪। https://en.wikipedia.org/wiki/Adonis

লিখেছেন – রিজওয়ানুর রহমান প্রিন্স

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

About Admin