Tuesday , 17 July 2018
Breaking News
Home » মিথলজি » ক্যালিপ্সো আর ওডিসিউসঃ অমর দেবীর সাথে মরণশীল মানুষের প্রেমের গল্প

ক্যালিপ্সো আর ওডিসিউসঃ অমর দেবীর সাথে মরণশীল মানুষের প্রেমের গল্প

ক্যালিপ্সোকে নিয়ে আমাদের এই পোস্ট। কিন্তু ‘পাইরেট’স অফ দা ক্যারিবিয়ান’ মুভির চরিত্র মিথলজি পেইজে কী করে? পুরাণেও কি তাহলে ক্যালিপ্সো নামের চরিত্র আছে? যদি থেকেই থাকে, তাহলে কে এই ক্যালিপ্সো? একে নিয়ে পোস্ট পড়া তো দূরের কথা, অনেকে হয়ত পৌরাণিক চরিত্র হিসেবে এর নামই শোনেননি। গ্রিক পুরাণের নিয়মিত পাঠকদের কথা বাদ দিলাম, কিন্তু অনিয়মিত পাঠকদের কাছে হেরাক্লেস, প্রমিথিউস, পারসিউস, হেরা, জিউস, পসাইডন, এন্ড্রোমিডা, ডিমিটার প্রমুখ দেবদেবীর নাম চেনা মনে হলেও ক্যালিপ্সো বেশ অচেনা একটা নাম। ‘পাইরেট’স অফ দা ক্যারিবিয়ান’ মুভির সৌজন্যে ডেভি জোন্সের প্রেমিকা হিসেবে কিংবা সমুদ্রের একজন দেবী হিসেবে ক্যালিপ্সোকে আমরা চিনি। কিন্তু অবহেলায় পড়ে থাকা ক্যালিপ্সোকে নিয়ে দুটো কথা না বললেই নয়, কারণ গ্রিক বীর ওডিসিউসের সাথে ক্যালিপ্সোর আছে স্মরণীয় প্রেম কাহিনী। দেবী এবং মানুষের মধ্যকার চিরাচরিত বিয়োগান্তক প্রেম কাহিনী।

ক্যালিপ্সো ছিলো গ্রিক পুরাণের একজন নিম্ফ। নিম্ফ হলো গ্রিক এবং ল্যাটিন পুরাণে বর্ণিত ছোটখাট দেবী চরিত্র, যারা একটা নির্দিষ্ট এলাকার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকতো। নিম্ফরা সাধারণত সুন্দরী তরুণী (এবং কুমারী) হতো। এদের হাতে ভার ছিলো প্রকৃতিকে সাজানোর। তো, ক্যালিপ্সো বাস করতো ওজিজিয়া নামের একটা দ্বীপে। এই দ্বীপ কিংবা ক্যালিপ্সো সম্পর্কে তেমন কিছুই পুরাণে পাওয়া যায় না। মজার ব্যাপার হলো, ক্যালিপ্সো নামের অর্থও “লুকিয়ে রাখা” বা “গোপন রাখা”। নামকরণের সার্থকতা টাইপের প্রশ্ন আসলে এই উদাহরণ দিতে পারেন!

a

গ্রিক পুরাণে ক্যালিপ্সোকে ভালো এবং মন্দ – দুইভাবেই দেখা হয়। যৌনকর্মে প্ররোচিত করা কিংবা তথ্য গোপন রাখার কারণে তাকে খারাপ চোখে দেখা হয়। আবার ওডিসিউসের রক্ষাকারী হিসেবেও সে নামডাক কুড়িয়েছিলো।

কবি হোমার তার ‘ওডিসি’ মহাকাব্যে ক্যালিপ্সোর বাবা-মা হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিখ্যাত টাইটান ‘এটলাস’ এবং সমুদ্রের একজন নিম্ফ ‘প্লাইয়োনি’কে। এই ক্যালিপ্সো ছিলো স্থলের নিম্ফ (ওজিজিয়া দ্বীপ), যে সরাসরি অলিম্পিয়ান দেবদেবীদের কাছ থেকে কাজের নির্দেশ পেতো। কিন্তু হোমারের সমসাময়িক কবি হেসিওদ ক্যালিপ্সোকে বলেছেন দুইজন টাইটান – ‘টেথিস’ এবং ‘ওশেনাস’-এর তিন হাজার কন্যার মধ্যে একজন, যারা ছিলো সমুদ্রের নিম্ফ। এমনও হতে পারে, হেসিওদ অন্য কোনো ক্যালিপ্সোর কথা বলছেন। কারণ তার লেখায় যে ক্যালিপ্সোকে পাওয়া যায়, তার সাথে হোমারের ক্যালিপ্সোর কোনো মিল নেই। আবার বিখ্যাত ইতিহাসবিদ এপোলোডোরাস বলছেন, ক্যালিপ্সোর বাবা-মা হলেন নেরিয়াস এবং ডোরিস। ফলে ক্যালিপ্সো হচ্ছে নেরিয়াস এবং ডোরিসের ঘরে জন্মানো ৫০ জন কন্যার একজন, যারা সকলেই ছিলো সমুদ্রের নিম্ফ (এদেরকে একত্রে নেরিয়েড বলে)।

যাই হোক, ক্যালিপ্সোর বংশ পরিচয় নিয়ে আর ঘাঁটাঘাঁটি না করে আমরা মনোযোগ দিই তার প্রেম কাহিনীতে। বাবা-মায়ের পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও ক্যালিপ্সোর প্রেম কাহিনী নিয়ে স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায় পুরাণে।

ক্যালিপ্সো কেন বিখ্যাত?

ক্যালিপ্সোকে বিখ্যাত করে রেখেছেন হোমার তার “ওডিসি” মহাকাব্যে স্থান দিয়ে। এতে ক্যালিপ্সো বিষয়ে যেভাবে বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, আর কোথাও এভাবে উল্লেখ নেই। এই মহাকাব্যটি রচিত হয়েছে গ্রিক বীর ওডিসিউসকে নিয়ে। আর ওডিসিউসের সাথেই ঘটেছিলো ক্যালিপ্সোর বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি কাহিনী।
ওজিজিয়া দ্বীপ ছিলো ক্যালিপ্সোর ঘাঁটি। কিন্তু এখানে সে ইচ্ছে করে আসেনি। অলিম্পিয়ান দেবতারা তাকে বন্দী হিসেবে এই দ্বীপে পাঠিয়েছিলো। কারণ টাইটান এবং অলিম্পিয়ানদের মধ্যে যুদ্ধের সময় ক্যালিপ্সো তার টাইটান বাবা এটলাসের পক্ষ নিয়েছিলো।

দ্বীপটি বর্তমানে ঠিক কোথায় অবস্থিত, সেটা জানা যায়নি। কারণ এই দ্বীপের অবস্থান সম্পর্কে কোনো পৌরাণিক কাহিনীতেই স্পষ্ট করে কিছু লেখা নেই। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, ওজিজিয়া ভূমধ্যসাগরের পশ্চিম পাশে অবস্থিত ছিলো; কেউ মনে করেন এটা ছিলো আয়োনিয়ান সাগরের একটা দ্বীপ।
যাই হোক, দ্বীপে এসে ক্যালিপ্সো মন খারাপ করে বসে থাকেনি। যেহেতু সে এই দ্বীপের নিম্ফ, তাই দ্বীপটিকে সুন্দর করে তোলার দায়িত্বও তার। নিজের বাসাকে সে ভরিয়ে তুললো সাজানো বাগান, ঘন বন, আর ঝর্না দিয়ে। তাকে সাহায্য করার জন্য অনেক নিম্ফ সহকারী ছিলো, যারা ক্যালিপ্সোকে রাণী বলে মানতো। এই নিম্ফরা ছিলো দ্বীপে অবস্থিত গুহা, নদী এবং গাছের নিম্ফ।

ক্যালিপ্সো যেহেতু দেবী ছিলো, তাই তার খাওয়া দাওয়া মানুষের মত ভাত, মাছ, মাংস ছিলো না। সে খেতো দেবতাদের খাবার – অমৃত (ambrosia), আর পান করতো দেবতাদের পানীয় (nectar)। অবসর সময়ে সে দ্বীপের কাছাকাছি সমুদ্রে স্নান করতে যেতো। তার সহচরীরা গা মোছার কাপড় আর পোশাক নিয়ে তীরে অপেক্ষা করতো।

কাহিনীতে ওডিসিউসের আগমন

প্রাচীন গ্রিসের স্পার্টা নগর রাজ্যের রাণী হেলেনকে ঘিরে ট্রয় নগরীর সাথে স্পার্টা নগর রাজ্যের যুদ্ধের কথা আমরা সবাই কমবেশি জানি। সে যুদ্ধে গ্রিসের পক্ষে ভীষণ বীরত্ব দেখিয়েছিলো ইথাকা রাজ্যের রাজা ওডিসিউস। তার বুদ্ধিতেই কাঠের ঘোড়ার ভিতরে ঢুকে ট্রয় নগরীতে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিলো গ্রিক সৈন্যরা। তো, দশ বছর ধরে চলা যুদ্ধ শেষে ওডিসিউস যখন ট্রয় থেকে নিজের দেশে ফেরার জন্য সমুদ্রে জাহাজ ভাসিয়েছিলো, তখন একটার পর একটা বিপদ এসে তাকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলছিলো। সবশেষ বিপদ এলো যখন ওডিসিউস তার জাহাজ নোঙর করলো সূর্য দেবতা ‘হেলিওস’-এর দ্বীপে।

দুজন বিজ্ঞ ব্যক্তি ওডিসিউসকে বলেছিলেন, ইথাকা যাওয়ার পথে হেলিওসের দ্বীপ পড়বে। এই দ্বীপে হেলিওসের সাত পাল ষাঁড় আর সাত পাল ভেড়া বাস করে। কিন্তু সেখানে যেন তারা নোঙর না ফেলে। ওডিসিউসের সহকারীরা কী না কী করতে যেয়ে হেলিওসকে রাগিয়ে দেবে… তখন শুরু হবে কুরুক্ষেত্র। কিন্তু এই দ্বীপের পাশ দিয়ে যাবার সময় ওডিসিউসের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ‘ইউরিলোকুস’ অনুরোধ করলো, রাতের খাবার তৈরি করার জন্য দ্বীপটিতে নোঙর ফেলতে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওডিসিউস অনুরোধটা মেনে নিলো। কিন্তু সে তার সব সহচরের কাছ থেকে প্রতিজ্ঞা আদায় করে নিলো যে, কেউ পালের পশুদের কোনোরকম অনিষ্ট করবে না।
দ্বীপে নামার পর শুরু হলো ঝড়। টানা একমাস ধরে চলতে লাগলো সেই ঝড়। সমুদ্র দেবতা পসেইডনের অভিশাপে এই ঝড় শুরু হয়েছিলো। জাহাজের সবাই চিন্তিত হয়ে পড়লো এমন বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা দেখে। একদিন ওডিসিউস দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিরিবিলিতে প্রার্থনা করার জন্য দ্বীপের ভেতরের দিকে চলে গেলো। সে সময় প্রতিজ্ঞা ভেঙ্গে ইউরিলোকুস বাকি সবাইকে বললো, “চলো, আমরা দেবতাদের তুষ্ট করার জন্য পালের সবচেয়ে হৃষ্টপুষ্ট পশুটাকে বলি দিই। এতে করে যদি সমুদ্রের ঝড় থামে!” সবাই ইউরিলোকুসের কথায় সায় দিয়ে পালের একটা পশুকে বলি দিয়ে ফেললো।

a

দেবতাদের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা শেষ করে ওডিসিউস যখন জাহাজে ফিরে এলো, তখন দেখলো ইউরিলোকুসের কুবুদ্ধিতে সূর্য দেবতা হেলিওসের সবচেয়ে ভালো ভালো পশুগুলোকে বলি দেওয়া হয়েছে। সবার আশা, এতে দেবতারা সন্তুষ্ট হয়ে ঝড় থামিয়ে দেবেন। অবশ্য এপোলোডোরাসের লেখা থেকে প্রাপ্ত কাহিনী কিছুটা আলাদা। সেখানে বলা হয়েছে, দ্বীপে থাকাকালে টানা এক মাস ওডিসিউসরা জাহাজে রাখা খাবার দিয়ে পেট পূজা করেছিলো। কিন্তু এরপর খাবার শেষ হয়ে যায়। ইউরিলোকুস বুদ্ধি আঁটে, হেলিওসের গবাদি পশু জবাই করে খানা খাবে। কিন্তু ওডিসিউস তো সেটা করতে দিবে না! তাই সে ওডিসিউসকে কিছু না জানিয়ে পরিকল্পনা করলো অন্যদের সাথে।

একদিন দুপুরে ওডিসিউস যখন দিবানিদ্রায় মগ্ন, তখন ইউরিলোকুস আর অন্যরা মিলে হেলিওসের কয়েকটা পশুকে জবাই দিয়ে ফেললো। দুটো ক্ষেত্রেই প্রতিজ্ঞা ভাঙার ঘটনা দেখে ওডিসিউস প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হলো আর সবাইকে তিরস্কার করতে লাগলো। কিন্তু লাভ কী? যেটা গেছে, সেটা তো আর ফিরে আসবে না। এদিকে নিজের পশুদের এই হাল দেখে হেলিওসও রেগে কাঁই হয়ে গেলেন। তিনি অন্য দেবতাদের বললেন, “তোরা দ্রুত এই ঘটনার প্রতিশোধ নে। যদি ওডিসিউস আর তার দলবল এই হীন কাজের জন্য প্রায়শ্চিত্ত না করে, তাহলে জেনে রাখ, আমি সূর্যকে পৃথিবীর উপর থেকে সরিয়ে পাতালে নিয়ে যাবো। সেখানে মৃতদের উপর আমি আলোক বর্ষণ করবো, হুহ!”

হেলিওসের হম্বিতম্বি দেখে দেবতাদের রাজা যিউস বললেন, “চেতিস না, আমি এর প্রতিশোধ নিচ্ছি। ওদের জাহাজ যখন সমুদ্রের মাঝ বরাবর থাকবে, তখন আমি জাহাজের উপর বজ্র দিয়ে তীব্র আঘাত করবো। এতে করে জাহাজ ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে, আর একজনও বাঁচবে না।”
ওডিসিউসরা তো আর দেবতাদের এই ফন্দির কথা জানতো না। তাই ঝড় থামলে তারা সাগরে জাহাজ ভাসিয়ে দিলো। আর ঠিকই যিউস তার প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী মাঝ সাগরে ওডিসিউসের জাহাজের উপর বজ্রপাত ঘটালেন। এতে ওডিসিউস ছাড়া সকলেই মারা পড়লো। ওডিসিউস ভাঙা জাহাজের তলি নিয়ে সেটাকে ভেলা বানিয়ে সমুদ্রে ভাসতে লাগলো। নয় দিন বেচারা এভাবে ভেসে রইলো। দশ দিনের মাথায় ভাসতে ভাসতে সে চলে এলো ওজিজিয়া দ্বীপে। শান্ত ওজিজিয়া দ্বীপ ধাক্কা খেলো এ ঘটনায়। শুরু হল নতুন গল্প।

ওজিজিয়া দ্বীপে ওডিসিউসের আগমন

দ্বীপের তীর থেকে ওডিসিউসকে উদ্ধার করলো ক্যালিপ্সো। এই প্রথম সে কোনো গ্রিক ব্যক্তির সামনে নিজের চেহারা দেখালো। ওডিসিউসের বর্ণনা অনুযায়ী, ক্যালিপ্সোর লম্বা চুল ছিলো বেণী করা। সে ছিলো অসম্ভব রূপসী। আর পুরো দ্বীপে ক্যালিপ্সো ছাড়া অন্য কোনো দেবদেবী বা মানুষ ছিলো না। কিন্তু হোমারের ওডিসি মহাকাব্যে লেখা আছে, রাতের আঁধারে যখন ওডিসিউস ওজিজিয়া দ্বীপে এসে পৌঁছলো, তখন ভেলা থেকে নেমে সে হাঁটা শুরু করলো দ্বীপের ভেতরের দিকে। কিছুদূর গিয়ে তার চোখে পড়লো বিশাল একটা গুহা, যার ভিতরে ঢুকে সে আবিষ্কার করলো দেবী ক্যালিপ্সোকে। গুহাকে গরম রাখার জন্য জ্বলছে আগুন। বেশ দূরে রাখা আছে জুনিপার গাছের ফল থেকে পাওয়া তেল আর পাইন গাছের কাঠ। সেগুলো পুড়ে পুড়ে তৈরি করছে সুগন্ধ। এরই মাঝে ক্যালিপ্সো তার তাঁতে সোনার তৈরি মাকু দিয়ে কাপড় বুনে যাচ্ছে। সামনে পেছনে দুলতে দুলতে সে কিন্নর কণ্ঠে গেয়ে যাচ্ছে গান।

a

গুহার চারপাশ দিয়ে গোলাকারে জন্মেছে দামী দামী বৃক্ষের সারি। সেখানে আছে অল্ডার, পপ্লার আর সাইপ্রেস বৃক্ষ। এসব বৃক্ষে লম্বা পাখাওয়ালা পাখিরা বাসা বেঁধেছে, পেঁচা-বাজপাখি আর সামুদ্রিক কাক মিলে হইচই করছে। লম্বা গুহার শেষ মাথা দিয়ে বের হওয়া যায় এক আঙ্গুর বাগানে, যেখানে থোকায় থোকায় ঝুলছে বড় বড় আঙ্গুর। আর আছে পরপর চারটা ঝর্না, যারা বয়ে যেতে যেতে এক জায়গায় গিয়ে মিশেছে… তৈরি করেছে একটা মাত্র জলধারা। পুরো জায়গা ঘিরে রয়েছে নরম তৃণভূমি, যেখানে ফুটে আছে বেগুনী রঙের বুনো ফুল আর সুগন্ধিযুক্ত গুল্ম “পার্স্লে”।

ক্যালিপ্সো যখন সমুদ্রের তীর থেকে ওডিসিউসকে উদ্ধার করলো, কিংবা ওডিসিউস যখন আশ্রয় খুঁজতে খুঁজতে ক্যালিপ্সোর গুহায় চলে এলো, তখন ক্যালিপ্সো অসুস্থ-একাকী ওডিসিউসকে দেখে তাকে সেবা করতে শুরু করলো। তাকে খাবার খাওয়ালো, ক্ষতস্থানে মলম লাগিয়ে দিলো। যতদিন পর্যন্ত ওডিসিউস সম্পূর্ণ সুস্থ না হলো, ততদিন পর্যন্ত ক্যালিপ্সো তার শুশ্রূষা করে গেলো। এই করতে করতে একদিন দেবী ক্যালিপ্সো মরণশীল মানুষের প্রেমে পড়ে গেলো। ঠিক যেভাবে গ্রিক দেবতারা মরণশীল নারীর প্রেমে পড়ে।

ওডিসিউস যেন কোনো নৌকা বা ভেলা বানিয়ে দ্বীপ ছেড়ে চলে যেতে না পারে, সেজন্য গ্রিক বীরের কাছে থাকা সমস্ত যন্ত্রপাতি দেবী লুকিয়ে রাখলো। কিন্তু ওডিসিউস এই বিষয়ে কিছু জানতে পারলো না। তাই ক্যালিপ্সোর মতিগতি সম্পর্কেও তার মনে সন্দেহ জাগলো না। সে দেবীকে তার ত্রাণকর্তা হিসেবেই সম্মান করতে লাগলো।

একদিন ক্যালিপ্সো আর থাকতে না পেরে ওডিসিউসকে নিজের মনের কথা খুলে বললো। জানালো, ওডিসিউসকে সে নিজের জামাই হিসেবে পেতে চায়। মরণশীল ওডিসিউসকে সে অমরত্ব দান করতে চায়। দুজনে মিলে যুগ যুগ ধরে ভালোবাসা রচনা করে যেতে চায়। একজন মানুষের জন্য এটা খুবই লোভনীয় প্রস্তাব। একে তো ক্যালিপ্সোর মত অসম্ভব সুন্দর একজন দেবী তাকে বিয়ে করতে চায়, তার উপর রয়েছে অমর হওয়ার সুযোগ। কিন্তু ওডিসিউস সেটা প্রত্যাখ্যান করলো। তার মনে যে তখনও ইথাকা রাজ্যে রেখে আসা স্ত্রী “পেনেলোপ”-এর কথা ভাসছে! প্রিয়তমা পেনেলোপ আর পুত্র টেলেমাকুসের কাছে যাওয়ার জন্য ওডিসিউসের মন আনচান করছে।

ক্যালিপ্সো কিন্তু প্রত্যাখ্যাত হয়ে দমলো না। সে এতই প্রেমে পড়ে গিয়েছিলো মর্ত্যের মানুষের যে, ওডিসিউসকে দিনের পর দিন সে প্রলুব্ধ করে যেতে লাগলো। আশা করতে লাগলো, একদিন ওডিসিউসের মন গলবে। তাঁতে কাপড় বুনতে বুনতে ক্যালিপ্সো সুমধুর কণ্ঠে গান গাইতো, আর সেই গানের মাধ্যমেই বশ করে রাখতো ওডিসিউসকে। একসময় ঠিকই ওডিসিউস ক্যালিপ্সোর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়লো। তারা রাতে একইসাথে ঘুমাতে শুরু করলো। কিন্তু তারপরও ওডিসিউসের মনের কোণে একটু হলেও ইথাকায় ফিরে যাওয়ার বাসনা রয়ে গিয়েছিলো। তাই প্রায় সে সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে দূর পানে চেয়ে রইতো।

a

এদিকে ক্যালিপ্সোর এখন স্বর্ণযুগ চলছে। এত বছর ধরে দ্বীপে কোনো মানুষের পদধূলি পড়েনি। কোনো দেবদেবীও এখানে আসেনি। এই প্রথম একজন মানুষ এখানে এসেছে। আর সেই ওডিসিউসের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে ক্যালিপ্সো। এতদিন সহচরদের সাথে নিয়ে দ্বীপ পরিচালনা করেছে সে। কিন্তু এখন ওডিসিউসকেও পাশে রেখে ক্যালিপ্সো রাজ্য চালানো শুরু করলো। যখন দেবী কাজ করে, তখন ওডিসিউস সারা দ্বীপে ঘুরে বেড়ায়। বিনোদনের জন্য সে গহীন বনে শিকার করতে যায়, সমুদ্র আর নদীতে মাছ ধরে বেড়ায়, শরীরচর্চা করে। রাতে দেবীর সাথে ভোজে বসে, ভোজ শেষে অন্যান্য নিম্ফদের সাথে মিলে দুজনে গান গায়, নাচে, গল্প করে, হুল্লোড় করে। এরপর একসাথে ঘুমুতে যায়। এভাবে ভালোই চলছিলো দিনরাত্রি।

হোমারের মতে, ক্যালিপ্সো ওডিসিউসকে ওজিজিয়া দ্বীপে সাত বছর ধরে আটকে রেখেছিলো। কিন্তু এপোলোডোরাস বলেছেন, পাঁচ বছর। আর হাইজিনুসের মতে, ওডিসিউসের বন্দী দশা স্থায়ী হয়েছিলো মাত্র এক বছর!

a

এই সাত বছরে কি তাদের কোনো সন্তানাদি হয়নি? হেসিওদের মতে, ক্যালিপ্সোর গর্ভে ওডিসিউসের দুটো পুত্র জন্মেছিলো। তাদের নাম নাউসিথউস এবং নাউসিনউস। কিন্তু হাইজিনুস বলছেন অন্য কথা। তার মতে, নাউসিথউস ক্যালিপ্সোর সন্তান নয়। সার্সে নামক একজন নিম্ফের সাথে ওডিসিউসের মিলনের ফলে জন্ম নেওয়া পুত্রই হলো নাউসিথউস। আবার এপোলোডোরাস বলছেন পুরোপুরি ভিন্ন কথা। তার লেখা থেকে জানা যায়, ক্যালিপ্সো আর ওডিসিউসের ঘরে জন্মেছিলো একটা মাত্র ছেলে, যার নাম ল্যাটিনুস (এই ল্যাটিনুসের মা হিসেবে আপনারা হয়তো সার্সে নিম্ফের নামও শুনে থাকবেন। কিন্তু কী আর করা? পুরাণে কে কার বাবা-মা, সেটা খুব ঘোলাটে একটা ব্যাপার)। অবশ্য গ্রিক লোককথায় আরেকটা মজার তথ্য প্রচলিত আছে। ক্যালিপ্সো আর ওডিসিউসের নাকি নাম না জানা একটা মেয়েও ছিলো, যে বড় হয়ে নিজের সৎ ভাই, অর্থাৎ পেনেলোপ আর ওডিসিউসের ঘরে জন্মানো টেলেমাকুসকে বিয়ে করতে গিয়েছিলো।

ক্যালিপ্সোর জন্ম পরিচয়ের মত তার সন্তানদের পরিচয়ও বেশ ধোঁয়াটে। তবে সেটা নিয়ে আমাদের মাথা না ঘামালেও চলবে। চলুন আমরা দেখি, ক্যালিপ্সোর সাথে ওডিসিউসের প্রেমের পরিণতি কী হলো, সেটা।

ক্যালিপ্সো ছেড়ে দিলো ওডিসিউসকে…

ওডিসিউসকে ক্যালিপ্সো অনেক আদর আর ভালোবাসায় জড়িয়ে রেখেছিলো। পুরো ওজিজিয়া দ্বীপ জুড়ে ওডিসিউসের জন্য ছিলো হাজারো বিনোদনের ব্যবস্থা। ওডিসিউসের মনেও ক্যালিপ্সোর জন্য হালকা দুর্বলতা তৈরি হয়েছিলো। কিন্তু তারপরও তার মনের এক কোণে সবসময়ই ইথাকার জন্যে টান অনুভূত হতো। বিশেষ করে, শেষদিকে এসে স্ত্রী পেনেলোপ আর দুই পুত্রের অভাব খুব বেশি বোধ করতে শুরু করেছিলো ওডিসিউস। আর পারছিলো না সে পেনেলোপের থেকে দূরে থাকতে। সাত/পাঁচ/এক – যত বছরই সে ক্যালিপ্সোর সাথে ওজিজিয়া দ্বীপে কাটাক না কেন, গ্রিক বীর পুরোপুরি ভুলতে পারেনি নিজের বাড়ি, সংসার, রাজ্যের কথা। কিন্তু ক্যালিপ্সোকে সরাসরি সে বলতেও পারছিলো না চলে যাওয়ার কথা। শেষমেশ নিজের রক্ষাকারী দেবী এথেনাকে মনের কথা বলার সিদ্ধান্ত নিলো ওডিসিউস।

এথেনা সব শুনে বললো, “চিন্তা নিও না বৎস, দেখো আমার ভেল্কিবাজি।” তারপর এথেনা গেলো দেবদেবীর রাজা যিউসের কাছে। গিয়ে বললো, তার ভক্ত ওডিসিউসকে ক্যালিপ্সো আটকে রেখেছে ওজিজিয়া দ্বীপে। বেচারা এখন নিজের রাজ্য ইথাকায় ফিরতে চায়। কিন্তু ক্যালিপ্সো তাকে আসতে দিতে চায় না, কারণ সে ওডিসিউসের প্রেমে মশগুল। ওডিসিউসকে সে নিজের অমর জামাই হিসেবে রেখে দিতে চায়। শুনে যিউস তার বার্তাবাহক হারমিসকে বললো, “যাও, ক্যালিপ্সো গিয়ে বলো, আমি আদেশ দিয়েছি সে যেন ওডিসিউসকে ইথাকায় ফিরতে দেয়। একজন দেবী হিসেবে মরণশীল মানুষের সাথে আজীবন থাকাটা তার নিয়তি নয়।”
প্রভুর আদেশ সঠিক জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য হারমিস ওজিজিয়া দ্বীপে এলো। হারমিসকে দেখে নিশ্চয় ক্যালিপ্সো খুশি হয়েছিলো, কারণ তার দ্বীপে কেউ বেড়াতে আসে না। কিন্তু হারমিসের বলা কথাগুলো যে ক্যালিপ্সোকে খুশি করতে পারেনি, সেটা সহজেই অনুমেয়। হারমিসকে ইচ্ছেমত কথা শুনিয়ে দিলো সে। রাগত স্বরে বললো, দেবতারা ইচ্ছেমত মরণশীল মানবীর সাথে প্রেম করে বেড়াচ্ছে। অথচ তারা চায় না, তাদের মত দেবীরাও মানবের সাথে প্রেম করুক। কিন্তু কেন? দেবীদের ব্যাপারে তাদের এমন যথেচ্ছ মনোভাব কেন?

বলা বাহুল্য, হারমিসের কাছে এই প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না। আর সুখের কথা হলো, ক্যালিপ্সোর রাগ একসময় পড়ে এলো। সে রাজী হলো ওডিসিউসকে তার নিজের রাজ্যে পাঠাতে। ইথাকায় ফিরে যাওয়াই যদি ওডিসিউসের একান্ত ইচ্ছে হয়, তাহলে সেটাই পূরণ হোক! শুধু তাই নয়, নৌকা বানানোর জন্য প্রেমিককে প্রয়োজনীয় জিনিসপাতিও দিলো সে। সমুদ্রপথে ভ্রমণে যেন কোনো সমস্যা না হয়, সেজন্য খাদ্য হিসেবে প্রচুর পরিমাণে মদ আর রুটিও দিয়ে দিলো ক্যালিপ্সো। এমনকি সমুদ্রের বাতাসকেও মৃদু আর যাত্রাপথের অনুকূল বানিয়ে দিলো।

এখানে গ্রিক দেবতাদের সাথে গ্রিক দেবী ক্যালিপ্সোর চরিত্রের একটা বিশাল পার্থক্য দেখতে পাই আমরা। সে নিজের পছন্দের মানুষকে তার ইচ্ছার বিপরীতে গিয়ে আটকে রাখেনি, উপরন্তু তাকে নিরাপদে বাড়িয়ে ফিরিয়ে দেবার জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করেছে। অথচ অলিম্পাস পর্বতে বসবাসকারী গ্রিক দেবতাদের দিকে তাকালে আমরা দেখি, তারা মানবীদের সাথে ইচ্ছেমত ব্যবহার করে থাকে। কোনো মানবীকে পছন্দ হলে দেবতারা ছলে বলে কৌশলে তার সাথে মিলিত হয় এবং মনের ইচ্ছে পূরণ করা শেষে ছেড়ে চলে যায়। এমন বহু কাহিনী আমাদের জানা। দেবতা যিউস নিজেই তো মানবী ‘গ্যানিমিড’কে অপহরণ করে নিয়ে এসেছিলো! অথচ দেবীরা মানুষের সাথে প্রেম করলে সেটা দেবতারা ভালো চোখে দেখে না। ক্যালিপ্সোও অনুভব করেছিলো, যিউস তার প্রেম করার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে। কিন্তু দেবতাদের রাজার নির্দেশের বিপরীতে যাওয়ার রাস্তা তার ছিলো না। তাই মনের রাগ মনেই চেপে রেখে সে যেতে দিয়েছিলো ওডিসিউসকে।

ওডিসিউস শুভ দিনক্ষণ দেখে নৌকা ভাসিয়ে দিলো ইথাকার উদ্দেশ্যে। কিন্তু ক্যালিপ্সোর কী হলো? পরিতাপের বিষয়, প্রেমিককে হারিয়ে ক্যালিপ্সো আত্মহত্যার চেষ্টা করলো। কিন্তু সে তো অমর দেবী! সে কীভাবে নিজেকে শেষ করবে? ফলে আত্মহত্যা তো সফল হলোই না, উল্টো সে প্রচণ্ড ব্যথা আর ভোগান্তির মধ্য দিয়ে গেলো। বিষ খেয়ে কোনো মানুষ মরতে চাওয়ার পর যদি তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, এবং পেট থেকে বিষ বের করার জন্য পাম্প করা হয়, তখন সে যেমন ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যায়, ঠিক তেমন অবস্থা!

a

অবশ্য হাইজিনুস তার লোককথায় বলেছেন, ওডিসিউস চলে যাওয়ার পর ক্যালিপ্সো আত্মহত্যা করেছিলো। একজন অমর দেবী কীভাবে আত্মহত্যা করে, সেটা সম্পর্কে কোনো তথ্য এখানে পাওয়া যায়নি। আবার অন্য উৎস থেকে জানা যায়, ওডিসিউস তার নৌকা ভাসানোর পর থেকে ক্যালিপ্সো আকুল প্রতীক্ষায় সমুদ্রের তীরে বসে থাকতো। যদি তার হারানো ভালোবাসা আবার ফিরে আসে? এভাবে থাকতে থাকতে ক্যালিপ্সো জীর্ণ, শীর্ণ হয়ে পড়লো। কিন্তু তবু যে পথে ওডিসিউস গেছে, সে পথ থেকে সে চোখ সরাতো না…।

তথ্যসূত্র
en.wikipedia.org/wiki/Calypso_(mythology)
greekgodsandgoddesses.net
greekmyths-greekmythology.com
greeklegendsandmyths.com/calypso.html

মিথলজি লিখেছেনঃ নির্ঝর রুথ ঘোষ

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

About Admin