Thursday , 19 July 2018
Breaking News
Home » মিথলজি » গ্রীক পুরাণ মিথ: প্যান্ডোরার বাক্স এবং মহাপ্লাবন

গ্রীক পুরাণ মিথ: প্যান্ডোরার বাক্স এবং মহাপ্লাবন

প্যান্ডোরাকে আমরা চিনি ‘প্যান্ডোরার বাক্স’ নামক কাহিনী থেকে। গ্রীক পুরাণ অনুযায়ী প্যান্ডোরাই প্রথম মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছিলো সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, রোগ-শোক। কিন্তু এর বাইরেও প্যান্ডোরার মানব সভ্যতার নির্মাণে আরেকটা বড় ভূমিকা আছে। আদি মানব সভ্যতার সমাপ্তি ঘটিয়ে পরবর্তী সভ্যতার নতুন সূচনা ঘটানোর পেছনেও প্যান্ডোরাই দায়ী। তার আগে প্যান্ডোরার বাক্সের কাহিনীটা বলে নিই।

Greek mythology

গ্রীক মিথলজি প্যান্ডোরার বাক্স এবং মহাপ্লাবন

গল্পটা অনেকটা এমন- যদিও জিউসকে সবকিছুর শাসক ধরা হয়, কিন্তু মানব সভ্যতার সূত্রপাত তার হাতে হয়নি। এই কাজ করেছিলো প্রমিথিউস। সে ছিলো অলিম্পিয়ানদের পূর্বসূরী টাইটানদের মধ্যে একজন। গ্রীক মিথলজির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রমিথিউস কাদামাটি হতে তৈরি করেছিলো প্রথম মানুষ। তাদের শিখিয়েছিলো আগুনের ব্যবহার। কিন্তু দেবতা জিউস ভয় পেয়ে যায় এই ভেবে যে, মরণশীল মানুষেরা আগুনের ব্যবহার শিখলে অনেক উন্নত হয়ে যাবে, তাই সে আগুন চুরি করে নিয়ে যায় মানুষের থেকে। প্রমিথিউস পালটা সেই আগুন চুরি করে এনে আবার উপহার দেয় মানুষদের।

এসব দেখে বিরক্ত হয় জিউস। সে প্রকৌশলী দেবতা হেফিস্টাসকে গোপনে ডেকে কিছু নির্দেশনা দেয়। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী হেফিস্টাস কাদামাটি থেকে তৈরি করে দ্বিতীয় আরেক প্রকারের মানুষ। সে ছিলো নারী। হেফিস্টাস তার এই সৃষ্টির নাম দেয় ‘প্যান্ডোরা’। জিউসের নির্দেশে দেবী এথিনা প্যান্ডোরার পোশাক-পরিচ্ছদ এবং বিভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে দেয়। পরে জিউস প্যান্ডোরার হাতে একটা বাক্স ধরিয়ে দেয় এবং পই পই করে তাকে বলে দেয়, প্যান্ডোরা যাতে বাক্সটা না খুলে। অতঃপর তাকে পাঠিয়ে দেয় পৃথিবীতে। সেখানে তার সাথে সাক্ষাৎ হয় প্রমিথিউসের ভাই ‘এপিমেথিউস’-এর। টাইটান প্রমিথিউসকে দেবতা জিউস বন্দী করে রেখেছিলো মানুষকে আগুন চুরি করে এনে দেয়ার জন্যে। ফলে তার ভাই এপিমেথিউস মানুষের দেখভাল করছিলো। সে প্রেমে পড়ে যায় প্যান্ডোরার। বিয়ে হয় তাদের। সেই ঘরে জন্ম নেয় এক কন্যা, যার নাম ‘পিরিয়া’ বা ‘পিরা’। এই পিরা আবার পরে বিয়ে করে তার চাচা প্রমিথিউসের পুত্র ‘ডিউকেলিওন’-কে।

যাই হোক, প্যান্ডোরার হাতের বাক্সটার ব্যাপারে জানার পরে তার স্বামী এপিমেথিউস তাকে বারবার সাবধান করেছিলো, প্যান্ডোরা যাতে বাক্সটা না খোলে। কিন্তু তারপরেও প্যান্ডোরা ধৈর্য ধরে থাকতে পারছিলো না। অবশেষে একদিন কৌতূহলে ফেটে পড়ে সে খুলে ফেললো বাক্সটা। আর তা থেকে হাসি-আনন্দ যেমন ছড়িয়ে পড়েছিলো পৃথিবীর মানুষের মাঝে, সাথে ছড়িয়ে পড়েছিলো রোগ-শোক-বিষাদ-ঈর্ষা ইত্যাদি।

আমাদের পরের গল্প শুরু এখান থেকেই। জিউসের প্ল্যান সফল হলো। প্রমিথিউসের তৈরি মানুষের মনকে সে বিষাক্রান্ত করে দিতে পেরেছে। এখন শুধু সুযোগের অপেক্ষা তাদের শাস্তি দেবার। প্রমিথিউস ছিলো ভবিষ্যৎদ্রষ্টা। সে দেখতে পেলো মানুষের ভবিষ্যৎ। বন্দীদশাতেই তার সন্তান ডিউকেলিওনকে ডেকে সে বললো, খুব দ্রুত একটা নৌকা বানাতে, যেটায় সে আর তার স্ত্রী পিরা চড়তে পারে। ডিওকেলিওন তাই করলো। যখন জিউসের উপহার দেয়া প্যান্ডোরার বাক্সের সুবাদে মানুষেরা খারাপ হয়ে গেলো, জিউস ঠিক করলো তাদের বিশাল এক বন্যা দিয়ে ধ্বংস করে দিবে। ডিউকেলিওন বারে বারে জিউসের কাছে প্রার্থনা করে ক্ষমা চাইছিলো। কিন্তু এক পর্যায়ে গিয়ে আর জিউসের মন গলাতে পারলো না। জিউস প্রবল বৃষ্টি এবং বজ্রপাতে বন্যার সূত্রপাত ঘটালো পৃথিবীতে। বন্যা শুরু হতেই ডিউকেলিওন এবং তার স্ত্রী পিরা চড়ে বসলো তাদের বানানো নৌকাতে। বহুদিন ধরে ভেসে চললো তারা জলে। এই বন্যায় পৃথিবীর সব মানুষ মারা গিয়েছিলো। সবকিছু ডুবে গিয়েছিলো, শুধু অলিম্পাস পর্বত এবং পারনাসুস পর্বত বাদে। বন্যা থামলে তারা দু’জনে নৌকা ভেড়ালো সেই পারনাসুস পর্বতে। পরে যখন পানি নেমে গেলো, পৃথিবীর অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো তারা দু’জনে।

এদিকে তারা যেখানে এসে নেমেছিলো, সেখানে ছিলো দেবী ডেলফির মন্দির। তারা দু’জনে ডেলফির কাছে সাহায্য চাইলো মানব সভ্যতার পুনরায় সূচনা ঘটাতে। ডেলফি তাদের আহ্বানে সাড়া দিলো। বললো, “তোমরা তোমাদের মায়ের হাড় হাতে নিয়ে কাঁধের উপর দিয়ে পিছনে ছুঁড়ে ফেলো”। তারা দু’জনে প্রথমে ব্যাপারটা বুঝতে পারলো না। পরে উপলব্ধি করলো, পৃথিবী হচ্ছে আসলে দেবীমাতা গায়া। তাই মাটি থেকে পাথর হাতে নিয়ে ছোঁড়ার কথা বলা হচ্ছে। তারা দু’জনে তাই করলো। ডিউকেলিওন যে পাথর ছুঁড়েছিলো, সেটা হতে তৈরি হয়েছিলো পুরুষ; আর পিরা যে পাথর ছুঁড়েছিলো, তা হতে তৈরি হয়েছিলো নারীরা। এদের মাধ্যমেই যাত্রা শুরু হয়েছিলো পরবর্তী মানব সভ্যতার।

সুতরাং বলা যায়, এক প্যান্ডোরার বাক্সেই প্যান্ডোরার ভূমিকা শেষ হয়ে যায়নি। গ্রীক মিথলজি অনুযায়ী, মহাপ্লাবনের মাধ্যমে নতুন মানব সভ্যতার সূত্রপাতেও প্যান্ডোরার পরোক্ষভাবে বেশ ভালো রকমের অবদান ছিলো।

 

লিখেছেন – রিজওয়ানুর রহমান প্রিন্স

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

About Admin