Monday , 21 May 2018
Breaking News
Home » মিথলজি » গ্রীক মিথলজির দেবতা ‘হেইডিস’ কি আসলেই ভীষণ খারাপ ছিলো?

গ্রীক মিথলজির দেবতা ‘হেইডিস’ কি আসলেই ভীষণ খারাপ ছিলো?

মিথলজিরা আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে হাজার বছর ধরে। এককালে যেগুলো সত্যি গল্প বলে শোনানো হতো, যাতে খুঁজে ফেরা হতো প্রকৃতির গূঢ় সব রহস্য; কালের আবর্তনে সেগুলো হয়ে গেছে শুধুই একেকটা রোমাঞ্চকর গল্প। কোনোটায় হয়তো এখনো কিছু কিছু নৈতিকতার বা ভাবনার খোরাক পাওয়া যায়, কিন্তু বাকিরা সব শুধু মনের আনন্দ যোগায়। বহুকাল আগের মানুষের তার আশপাশের জগৎ নিয়ে চিন্তাভাবনার ধরণ সম্পর্কে ধারণা দেয়। কথা হলো, হাজার বছরের গড়িয়ে চলা সময়ের স্রোতে মিথলজিতেও ঢুকে পড়েছে অনেক মিথ বা ভ্রান্ত ধারণা। এর কারণ কখনো সময়ের সাথে সাথে গল্পকথকের কথিত কাহিনীর রূপান্তর, আবার কখনো স্রেফ ভালো-মন্দের পার্থক্যকরণে আমাদের অতি সরলীকরণ করে ফেলার চিরন্তন অভ্যাস। মিথলজির এমনই কিছু মিথ বা ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে আগামী কয়েক পর্ব চলবে আমাদের এই ‘মিথলজির মিথ’ নামক লেখাটা। সবাইকে স্বাগতম!

a

গ্রীক মিথলজির দেবতা ‘হেইডিস’ কি আসলেই ভীষণ খারাপ ছিলো?

গ্রীক মিথলজির চরিত্র হেইডিস ছিলো পাতালের দেবতা। মৃত্যুপুরীর সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণাধীন। ‘টারটারুস’ নামের এই আঁধারময় জগতে বিচরণ করে লাভা হতে উদগিরীত অগ্নিকুণ্ডলী। সাক্ষাৎ এক নরকপুরী যেন! আর এই নরকের যে শাসনকর্তা, মৃতদের আত্মা নিয়ে যার কাজকারবার, সে যে শয়তানের অধম হবে- এ আর আশ্চর্য কী!

কিন্তু যারা গ্রীক মিথলজি সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখেন, তাদের জিজ্ঞেস করে দেখুন। তারা এই বক্তব্যের সাথে একমত হবেন না। গ্রীক পুরাণে হেইডিস আসলে মোটেও তেমন খারাপ কোনো চরিত্র না, যতোটা তাকে মনে করা হয়। প্রাচীন গ্রীকরা আসলে হেইডিসকে যথেষ্ট যুক্তিবাদী এক দেবতা হিসেবে গণ্য করতো।

প্রথমত, অর্ফিয়াস এবং ইউরিদাইসের প্রেম উপাখ্যানে হেইডিস অর্ফিয়াসের সংগীত শুনে আবেগে বিগলিত হয়ে গিয়েছিলো। ইউরিদাইসের প্রতি অর্ফিয়াসের ভালোবাসা দেখে তাকে অনুমতি দিয়েছিলো প্রেমিকা ইউরিদাইসকে পাতাল হতে নিয়ে যাবার। তবে এক শর্তে। পাতাল পেরুবার সময় যখন ইউরিদাইস অর্ফিয়াসের পেছন পেছন আসবে, সে পেছন ফিরে তাকাতে পারবে না। তাকালেই ইউরিদাইস চিরতরে হারিয়ে যাবে। কিন্তু অর্ফিয়াস এই শর্ত মানতে ব্যর্থ হয়েছিলো বলেই চিরতরে হারিয়েছিলো ইউরিদাইসকে।

দ্বিতীয়ত, হারকিউলিস যখন তার ১২টা শ্রমের এক পর্যায়ে হেইডিসের কাছে এসেছিলো তার পোষা তিন মাথাওয়ালা কুকুর সেরবেরাসকে নিয়ে উপরের জগতে যেতে, হেইডিস পালটা চুক্তির বিনিময়ে হারকিউলিসকে দিয়েছিলো সেই অনুমতি। চুক্তি অনুযায়ী হারকিউলিস কাজ শেষ হলে সেরবেরাসকে আবার ফিরিয়ে দিয়েছিলো হেইডিসের কাছে। পুরো শ্রমটায় হারকিউলিসের কষ্ট হয়েছিলো সেরবেরাসকে বশ মানাতে, এই যা!

তৃতীয়ত, হেইডিস ছিলো শিল্পানুরাগী। অর্ফিয়াসের সংগীতে মুগ্ধ হয়েছিলো সে, সেটা আগেই বলেছি। এছাড়াও এইস্কাইলোস এবং ইউরিপিদিস নামক দুই মহাকবির মধ্যে প্রতিযোগিতায় বিচারক নির্ধারিত হয়েছিলো হেইডিস স্বয়ং। তাকে বিচারক নির্ধারণ করার কারণ ছিলো, সবাই জানতো সুষ্ঠু বিচার হেইডিসই করবে। তার সেই ক্ষমতা আছে।

এছাড়াও আরো অনেক কারণ বলা যায়। জিউসকে ক্ষমতা হতে সরানোর ষড়যন্ত্রে পোসাইডন, হেরা এবং এথেনা জড়িত ছিলো। কিন্তু এই সময়টায় হেইডিস ছিলো জিউসের অনুগত। উপরন্তু কখনো শোনা যায়নি যে, তার উপাসনা না করার কারণে হেইডিস তার ভক্তদের কারো উপরে শোধ নিয়েছে। হেইডিস পাতালপুরীর শাসক হয়েছিলো এই কারণে নয় যে, সে খারাপ। বরং জিউস, হেইডিস এবং পোসাইডন- এই তিন ভাই মিলে লটারি করেছিলো, কে কোন রাজ্য শাসন করবে তা নিয়ে। তাতে জিউসের ভাগ্যে পড়েছিলো স্বর্গ, পোসাইডনের জন্যে সমুদ্র আর হেইডিসের জন্যে রয়ে গিয়েছিলো পাতালপুরী।

হেইডিসের কিছু ত্রুটি আছে অবশ্য। সে পার্সেফোনেকে ভালোবেসে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিলো পাতালে। কিন্তু মূল গ্রীক বয়ান অনুযায়ী, এতে পার্সেফোনের কোনো সমস্যা ছিলো না। উপরন্তু জিউসেরও সম্মতি ছিলো এতে। কিন্তু বাগড়া দিয়ে বসেছিলো পার্সেফোনের মা ডিমিটার। ডিমিটারের চেঁচামেচিতে এবং পার্সেফোনের অনুপস্থিতির কারণে পৃথিবীতে শস্য উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জিউস হেইডিসকে চাপ দিয়েছিলো পার্সেফোনেকে ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু পার্সেফোনে পাতালের ফল ভক্ষণ করায় হেইডিস চাইলেও তাকে ফিরিয়ে দিতে পারছিলো না। পরে হেইডিস ব্যবস্থা করেছিলো যে, পার্সেফোনে ছয় মাস পৃথিবীতে থাকবে আর তখন পৃথিবী শস্য-শ্যামলা হয়ে উঠবে। বাকি ছয় মাস সে হেইডিসের সাথে থাকবে পাতালে। তখন পৃথিবী অনুর্বর হয়ে থাকবে।

উপরন্তু গ্রীক পুরাণে এও বলা আছে, হেইডিস মানুষের ভালো-মন্দের বিচারক নয়। এটার দায়িত্বে ছিলো অন্য তিনজন, যাদের নাম- মিনোস, আয়াকোস এবং র‍্যাডাম্যান্থিস। এরাই ছিলো মানুষের পাপ-পূণ্যের বিচারক।

তাহলে হেইডিসকে এভাবে কুটিল চরিত্র হিসেবে আমরা দেখি কেন? কিছু ধন্যবাদ দিতে পারেন নিজেদেরকে। কারণ আমাদের বিশ্বাস জন্মে গেছে, মৃত্যুপুরীর শাসক মানেই ইবলিস শয়তান। আর বাকি ধন্যবাদ প্রাপ্য হলিউডের। তাদের সিনেমায় প্রায়ই হেইডিসকে ভীষণ কুটিল চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখতে গেলে, তার ভাই জিউসের থেকে অন্তত হাজার গুণে ভালো হচ্ছে হেইডিস। মৃত্যুপুরী যদি একটা প্রতিষ্ঠান হয়, সেই প্রতিষ্ঠানের সিইও হচ্ছে হেইডিস। প্রতিষ্ঠানের মাথা হিসেবে সে সবকিছু দেখেশুনে রাখে, এই যা!

 

লিখেছেন – রিজওয়ানুর রহমান প্রিন্স

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

About Admin