Tuesday , 17 July 2018
Breaking News
Home » মিথলজি » বিভিন্ন পুরাণের প্রেম কাহিনীগুলোঃ লিন্ডার এবং হিরো (গ্রীক পুরাণ)

বিভিন্ন পুরাণের প্রেম কাহিনীগুলোঃ লিন্ডার এবং হিরো (গ্রীক পুরাণ)

‘হেলিসপন্ট’ অঞ্চলে চলছিলো বিশেষ উৎসব। ‘আফ্রোদিতি এবং এডোনিস’-এর ভালোবাসার স্মরণে প্রতিবছর এই উৎসব পালিত হয় এখানে। আশেপাশের শহর থেকে অনেক মানুষ এসে জড়ো হয়েছে মেলায়। আফ্রোদিতি এবং এডোনিসের ভালোবাসা গাঁথা নিয়ে চলছে গান গাওয়া, কবিতা আবৃত্তি, মঞ্চাভিনয় ইত্যাদি।

Hero and Leander mythology

লিন্ডার এবং হিরো (গ্রীক পুরাণ)

‘এবাইডস’ শহর থেকে মেলায় এসেছে সুদর্শন যুবক ‘লিন্ডার’। মুগ্ধতা নিয়ে উপভোগ করে যাচ্ছে উৎসবটাকে, বেশ ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে মেলার এমাথা-ওমাথা।

হঠাৎ তার চোখ পড়লো এক অনিন্দ্যসুন্দরী নারীর দিকে। গ্রীসের বসন্তের বিকেলের সোনালী রোদে অসাধারণ এক দ্যুতি ছড়াচ্ছে সেই নারীটার মুখ হতে। দূর হতে তাকে মুগ্ধ বিস্ময়ে লক্ষ্য করতে লাগলো লিন্ডার। খানিক লক্ষ্য করেই বুঝলো লিন্ডার, মানুষটা সাধারণ ঘরের কেউ নয়। কথাবার্তা এবং আচার-আচরণে অসাধারণ রকমের শিষ্টতা তার, শিক্ষাদীক্ষার ছাপ প্রকট। কোনো মন্দিরে গিয়ে দীক্ষা নিচ্ছে সে হয়তো।

আসলে নারীটা ছিলো এক পুরোহিত। নাম ‘হিরো’। দেবী আফ্রোদিতির উপাসনা করে সে। মেলায় এসেছিলো দেবী আফ্রোদিতির ভালোবাসার দীক্ষা সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে। লিন্ডার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনলো তার কথামালা। যত না কথা শুনলো, তার চেয়েও বেশি হাঁ করে গিললো সে যাজিকা হিরোর শান্ত, মায়াময় মুখশ্রীটাকে। মেলার পরে হিরোকে অনুসরণ করে লিন্ডার খুঁজে বের করলো তার থাকার জায়গাটা। হিরো একাকী-নিরিবিলি থাকে ‘সেস্টাস’ শহরের শেষ মাথায়, সমুদ্রের কিনারা ঘেঁষে দাঁড়ানো এক উঁচু টাওয়ারে। দেবী আফ্রোদিতির উপাসনা করে সে ওখানে বসে। উপাসনায় হিরো নিজেকে এতোটাই আত্মোৎসর্গ করেছিলো যে, সারাজীবন চিরকুমারী থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো সে।

প্রথম দেখাতেই হিরোর প্রেমে পড়ে গেলো লিন্ডার। অহর্নিশি ভেবে চললো সেই শান্ত-স্নিগ্ধ চেহারার রূপসী যাজিকার কথা। শেষে না পেরে একদিন সে গিয়ে উপস্থিত হলো হিরোর আবাসস্থল, সেই উঁচু টাওয়ারে। মুখোমুখি হলো হিরোর। তাকে জানালো নিজের মনের কথাগুলো। হিরো প্রথমে প্রচণ্ড ক্ষেপে গেলো। প্রত্যাখ্যান করলো লিন্ডারকে। কিন্তু লিন্ডারও নাছোড়বান্দা। সে লেগে রইলো অনিন্দ্যসুন্দরী হিরোর পিছনে। যুবক লিন্ডারের ছিলো দারুণ রকমের কথার জাদুতে যে কাউকে বশে আনার ক্ষমতা। সে হিরোকে যুক্তি দেখালো, সে হচ্ছে আফ্রোদিতির উপাসক। আর আফ্রোদিতি হচ্ছে ভালোবাসার দেবী। আফ্রোদিতি কি কখনো মানবে- তার এক ভক্ত তাকে উপাসনা করে, অথচ ভক্তটা তার জীবনে আসা ভালোবাসাকে পায়ে ঠেলে দূরে সরিয়ে দেয়?
হিরোর পালটা যুক্তি, হ্যাঁ মানবে। কারণ আফ্রোদিতিকে ভালোবেসে আমি আমার জীবনে আসা ভালোবাসাটাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছি। দেবী আফ্রোদিতিই আমার আসল ভালোবাসা।
এবারে লিন্ডারের যুক্তিখণ্ডন, তুমি কী করে জানো, দেবী আফ্রোদিতি খুশি হয়ে তোমার জীবনে এই ভালোবাসাটা পাঠায়নি? আফ্রোদিতি হয়তো চায়, আরেকটা মানুষকে ভালোবেসে, তাকে জীবনসঙ্গী করেই তুমি ভালোবাসার মাহাত্ম্যটা উপলব্ধি করো। আফ্রোদিতির ভালোবাসার শক্তিটাকে বুঝতে শেখো।

Hero and Leander mythology

ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসতে থাকে হিরো। লিন্ডারের কথার জাদুতে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়ে সে। একদিন টের পায় সেও লিন্ডারকে ভালোবেসে ফেলেছে। কিন্তু নতুন আরেক সমস্যা দেখা দেয়। হিরোর বাবা-মা, যারা মূল শহরে থাকে, তারা কখনো অন্য শহরের এক বাসিন্দার সাথে তার বিয়ে দিতে রাজি হবে না। দু’জনের বংশও মিলে না। হিরো হচ্ছে পুরোহিত। সমাজের সবচেয়ে উঁচু শ্রেণির একজন। আর লিন্ডার হচ্ছে বহিরাগত এক সাধারণ মানুষ।

লিন্ডার এসব নিয়ে ভাবতে রাজি নয়। সে হিরোকে পেতে যা করা দরকার, তাই করতে প্রস্তুত। প্রতিদিন সে এবাইডস শহর থেকে সাঁতার কেটে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আসে সেস্টাস নগরীর শেষ মাথায় উঁচু টাওয়ারটাতে, হিরোর সাথে দেখা করতে। পাছে মানুষের চোখে পড়ে যায়, এজন্যে রাতের আঁধারে মিলিত হয় তারা। টাওয়ারের জানালায় মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখে হিরো। রাতের আঁধারে সমুদ্রে ঝাঁপ দেয় লিন্ডার। সে ছিলো দুর্দান্ত রকমের সাঁতারু। হিরোর টাওয়ারটা লাইটহাউজের কাজ করে। সেই আলোর নির্দেশনা নিয়ে আঁধার সমুদ্রে সাঁতার কেটে হিরোর ঘরের দুয়ারে উপস্থিত হয় লিন্ডার।

পুরো এক গ্রীষ্মকাল কাটে তাদের এভাবে। রাতের অন্ধকারে মিলিত হয় প্রেমিক-যুগল। ভোরের আলোয় বিচ্ছেদ ঘটে তাদের। আবার সমুদ্রে সাঁতার কেটে নিজের শহর এবাইডসে ফিরে যায় লিন্ডার।

গ্রীষ্মের শেষে একবার উঠে প্রচণ্ড ঝড়। সমুদ্র হয়ে উঠে উত্তাল। হিরো যথারীতি টাওয়ারের চূড়ার জানালায় মোমবাতি জ্বালিয়ে রেখেছে। লিন্ডার সমুদ্রের ভীষণ ঢেউ দেখে একটু দমে যায়। কিন্তু হিরোকে না দেখেও থাকতে পারছে না সে। অবশেষে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে উত্তাল সমুদ্রে। হিরো টাওয়ারের চূড়া হতে নেমে এসে দরজার কাছে বসে অপেক্ষা করছে লিন্ডারের। লিন্ডারও সাঁতার কাটছে সমুদ্রের প্রচণ্ড ঢেউ ঠেলে। ঠিক এসময় দমকা বাতাসে নিভে গেলো মোমবাতিটা। সমুদ্রের ঢেউয়ের ধাক্কায় পথ হারিয়ে ফেললো লিন্ডার। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সারারাত সাঁতার কেটে চললো সে। কিন্তু কোনো কূল খুঁজে পাচ্ছে না! একপর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে ঝড়ের মাঝে সমুদ্রের জলে ডুবে গেলো সে।

সারারাত লিন্ডারের অপেক্ষায় থেকে ক্লান্ত হয়ে টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলো হিরো। সকালে সূর্যের আলোয় ঘুম ভাংলো তার। কিন্তু লিন্ডার কোথায়? সে গতরাতে আসেনি কেন? দুয়ার খুলে বাইরে এসে দাঁড়ালো হিরো। ভোরের আলোয় সমুদ্রের শান্ত ঢেউ চিকমিক করছে। এই সমুদ্রই গতরাতে কি ভীষণ উত্তাল ছিলো! কিন্তু ওটা কী দেখা যায় সমুদ্রের পারে? মানুষের মতো কী একটা যেন পড়ে আছে!

দুরুদুরু বুকে কাছে এগিয়ে গেলো হিরো। গিয়ে আবিষ্কার করলো লিন্ডারের মৃতদেহ। মোমবাতির আলো নিভে যাওয়ায় ঝড়ে পথ হারিয়ে জলে ডুবে মারা গিয়েছে সে। লিন্ডারের লাশ এখন হিরোকে ফিরিয়ে দিয়েছে সমুদ্র। এটা কি সমুদ্রদেবতা পসাইডনের রসিকতা?! শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়লো হিরো। লিন্ডারের দেহটা টেনে নিয়ে এলো নিজের ঘরের দরজার সামনে। তারপরে জীবন্মৃতের মতো হেঁটে উঠে এলো টাওয়ারের চূড়ায়। সেখান থেকে জানালা দিয়ে বাইরে মুখ গলালো। তাকালো নিচে। ঐ দেখা যাচ্ছে মৃত লিন্ডারকে! আর বেশি কিছু ভাবলো না সে। সোজা লাফ দিলো উঁচু টাওয়ার হতে। ভালোবাসা উড়তে শিখিয়েছিলো তাকে। উড়তে উড়তেই হিরো সোজা গিয়ে পড়লো ভূমিতে, লিন্ডারের পাশে।

শেষ করি হিরো এবং লিন্ডারের গল্পে দার্শনিক প্লেটোর বর্ণনা দিয়ে, “…. তাদের ছিলো না কোনো ডানা। কিন্তু যখন তারা শরীর হতে আলাদা হচ্ছিলো, তখন তাদের ডানা গজাতে শুরু করেছিলো। উন্মত্ত ভালোবাসার পুরস্কার হিসেবে তারা শিখেছিলো উড়তে। এটাই নিয়ম যে, যারা একবার এভাবে উড়তে শিখে, তাদের যাত্রা হয় স্বর্গ-পানে। তারা কখনো ফিরে যায় না আঁধারে, নেমে আসে না ধরিত্রীতে। তারা একত্রে যাত্রা করে আলোর পথে। আর তাদের ডানার পালক হয় একই ছাঁচে গড়া, কারণ তারা পরস্পরকেও ভালোবেসেছিলো একই ভাবে”। (Plato, Phaedrus 256d)

তথ্যসূত্র:
১। https://en.wikipedia.org/wiki/Hero_and_Leander
২। http://www.maicar.com/GML/Hero.html
৩। http://www.mythencyclopedia.com/Go-Hi/Hero-and-Leander.html
৪। http://www.shmoop.com/hero-leander/summary.html
৫। https://www.amazon.com/exec/obidos/ASIN/0521097037/carlosparada-20

লিখেছেন – রিজওয়ানুর রহমান প্রিন্স

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

About Admin