Monday , 21 May 2018
Breaking News
Home » মিথলজি » বিভিন্ন পুরাণের প্রেম কাহিনীগুলোঃ হিপোলাইটাস এবং ফেইড্রা (গ্রীক পুরাণ)

বিভিন্ন পুরাণের প্রেম কাহিনীগুলোঃ হিপোলাইটাস এবং ফেইড্রা (গ্রীক পুরাণ)

হেরাক্লেস এবং পার্সিউসের মতোই গ্রীক পুরাণে আরেক জনপ্রিয় হিরো হচ্ছে থেসিউস (Theseus)। হেরাক্লেস কিংবা পার্সিউসের মতো থেসিউসেরও অনেকগুলো অভিযানের বর্ণনা আছে গ্রীক মিথলজিতে, যেখানে সে চোর-ডাকাত হতে শুরু করে দৈত্য-দানব পর্যন্ত বিভিন্ন শত্রুর মোকাবিলা করে। আমাদের আজকের গল্প পুরোটাই অবশ্য থেসিউসকে নিয়ে নয়। গল্পের বিশাল অংশই হচ্ছে তার পুত্র হিপোলাইটাস এবং স্ত্রী ফেইড্রা (হিপোলাইটাসের সৎ মা)-কে নিয়ে। থেসিউস এখানে ছোট্ট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কাহিনীটার বিভিন্ন সংস্করণ পাওয়া যায়। এখানে ‘ইউরিপিদিস’ লিখিত সংস্করণটি বর্ণিত হয়েছে।

আ

বিভিন্ন পুরাণের প্রেম কাহিনীগুলোঃ এডোনিস এবং আফ্রোদিতি (গ্রীক পুরাণ)

বীর থেসিউস বিভিন্ন অভিযানের সময়ে একবার আমাজন গোত্রের (গ্রীক পুরাণের যোদ্ধা নারীদের গোত্র। ধরা হয়, যুদ্ধের দেবতা অ্যারিসের বংশধর তারা) মাঝে গিয়ে উঠেছিলো। সেখানে আমাজনদের রাণী ‘হিপোলাইট (মতান্তরে ‘এন্টিওপ’)’-এর সাথে তার প্রেম হয়ে যায়। বিয়ে করে দু’জনে। তাদের ঘরে জন্ম নেয় পুত্র সন্তান হিপোলাইটাস। থেসিউস বেশ কিছুকাল আমাজনদের মাঝে কাটিয়ে পুত্র হিপোলাইটাসকে নিয়ে ফিরে যায় এথেন্স নগরীতে। সেখানে রাজা হয়ে রাজ্য শাসন শুরু করে। তার কিছুকাল পরে হিরো থেসিউস দ্বিতীয়বারের মতো বিয়ে করে আরেক নারীকে। ক্রিটের রাজা মিনোসের কন্যা ‘ফেইড্রা’। রাজকুমারী ‘আরিয়াদনে’-র বোন।

এবারে চোখ ঘুরাই হিপোলাইটাসের দিকে। হিপোলাইটাস ছিলো দেবী আফ্রোদিতির অনুসারী। কিন্তু কোনো এক কারণে সে একপর্যায়ে ভালোবাসা ও উর্বরতার দেবী আফ্রোদিতির উপাসনা ছেড়ে শিকারের দেবী আর্তেমিসের ভক্ত হয়ে পড়ে। তার উপাসনা শুরু করে। এতে আফ্রোদিতি অপমানিত হয়ে ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। সে হিপোলাইটাসকে শাস্তি দেবার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী পুত্র এরোজকে (কামনার দেবতা) দিয়ে রাণী ফেইড্রার মনে তার সৎ পুত্র, সুদর্শন যুবক হিপোলাইটাসের জন্যে ভালোবাসার উদ্রেক করে। (আফ্রোদিতির জন্যে এইসব অবশ্য নতুন কিছু না। এর আগে বর্ণিত এডোনিসের গল্পেও একই কাহিনী ঘটিয়েছিলো সে। আফ্রোদিতি কাউকে পুরষ্কার হিসেবে ভালোবাসা উপহার দিতো, কাউকে দিতো শাস্তি হিসেবে!)

প্রথম প্রথম ফেইড্রা প্রচণ্ড ভাবে দমন করে নিজের কামনাকে। নিজেকে বুঝায়, এটা ঠিক নয়। কিন্তু একপর্যায়ে আর পেরে উঠে না। মনের কথা হিপোলাইটাসকে না বলতে পেরে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে যায় তার। শরীর রুগ্ন হতে থাকে। তার খাস পরিচারিকার নজর এড়ায় না ব্যাপারটা। পরে পরিচারিকা ফেইড্রাকে চেপে ধরলে তার কাছে সব খুলে বলে সে। সব শুনে থ’ মেরে যায় দাসীটি। তারপরে সামলে উঠে ফেইড্রাকে বলে এমন অসম্ভব ইচ্ছা দমন করতে। সে সাহায্য করবে ফেইড্রাকে এই অবস্থা হতে উত্তরণে। তার কাছে এক বিশেষ ঔষধ আছে, যা খেলে শরীর এবং মন দু’দিনেই ঠিক হয়ে যাবে ফেইড্রার।

এই দাসীটি একপর্যায়ে গিয়ে হিপোলাইটাসকে বলে ফেলে তার প্রতি ফেইড্রার ভালোবাসার কথাটা। বলে ফেলেই ভয়ে কুঁকড়ে যায় সে। যদি কোনো প্রকারে থেসিউসের কানে যায় এই ঘটনা, তাহলে দাসীটার প্রিয় মালিক ফেইড্রার ক্ষতি হবে। দাসীটি এই খবর চাউর করে বেড়াচ্ছে, তার জন্যেও গর্দান নিবে থেসিউস। তাই সে সাথে সাথেই হিপোলাইটাসের থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করে যে সে কাউকে বলবে না এই ঘটনাটা। হিপোলাইটাস কথা দেয় জীবন গেলেও সে এই ঘটনাটা কাউকে বলবে না, কিন্তু একই সাথে নারীদের চরিত্রকে সাপের বিষের সাথে তুলনা করেও বিষোদগার করে।

হিপোলাইটাসের এই বিষোদগারের ব্যাপারটা রাণী ফেইড্রার কানে পৌঁছায়। ভীষণ অপমানিত বোধ করে সে। বুঝে ফেলে, তার ভালোবাসা ধ্বংস হয়ে গেছে। ভালোবাসার মানুষের থেকে এই অপমান সইতে না পেরে তাই সে আত্মহত্যা করে বসে। আত্মহত্যার আগে একটা নোট লিখে যায়। তাতে লেখা, “আমার এই অপমানের জন্যে হিপোলাইটাস দায়ী”।

থেসিউস রুমে ফিরে এসে খুঁজে পায় তার স্ত্রীর লাশ। হাতে পায় চিরকুট। সেটা পড়ে ভীষণ ক্ষেপে উঠে সে। ঘটনা অনুসন্ধানের জন্যে ডেকে পাঠায় পুত্র হিপোলাইটাসকে। তাকে জিজ্ঞেস করে ফেইড্রার মৃত্যুর ব্যাপারে। হিপোলাইটাস কোনো সদুত্তর দিতে পারে না। নিজের দেয়া প্রতিশ্রুতির কাছে বাঁধা পড়ে যায় সে। আমতা আমতা করতে থাকে। তার এমন ভাব দেখে থেসিউসের বদ্ধমূল ধারণা হয়ে যায়, যুবক হিপোলাইটাস তার সৎ মা ফেইড্রার সাথে জোরপূর্বক মিলনের চেষ্টা করেছিলো। তাতেই ভীষণ অপমানিত হয়ে আত্মহত্যা করেছে সে। কিন্তু হিপোলাইটাস বারে বারে এই অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবী করে, কিন্তু কীভাবে সে নির্দোষ সেটা আর ব্যাখ্যা করে বুঝাতে পারে না।

থেসিউস ছিলো জলরাশির দেবতা পসাইডনের সন্তান। দেবতা পসাইডন তাকে তিনটে বর দিয়ে আশীর্বাদ করেছিলো, যেগুলো থেসিউস চাইলে জীবনের যেকোনো সময়ে ব্যবহার করতে পারতো। প্রচণ্ড রাগে ফেটে পড়ে থেসিউস এবারে সেই বরগুলোর একটাই ব্যবহার করে বসলো। প্রথমে পুত্রকে ধিক্কার দিয়ে তাকে রাজ্য হতে বেরিয়ে যেতে বললো। তারপরে অভিশাপ দিয়ে বললো, দেবতা পসাইডনের ক্রোধে যাতে তার মৃত্যু ঘটে।

হিপোলাইটাস পিতৃ-আদেশ মেনে ঘোড়ায় টানা রথে চড়ে বেরিয়ে গেলো রাজ্য ছেড়ে। রাজ্য ছাড়ার পরে কিছুদূর যেতেই গিয়ে পড়লো দেবতা পসাইডনের পাঠানো সমুদ্র দানবের মুখে। সেই সমুদ্র দানবের প্রচণ্ড হুংকারে ভয় পেয়ে গেলো হিপোলাইটাসের রথের ঘোড়া। একেকটা একেক দিকে ছুটে পালালো। রথ ভেঙ্গে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়লো হিপোলাইটাস। পাথরে আঘাত খেয়ে মারা গেলো সে।

এক দূত ছুটে এসে থেসিউসকে জানালো হিপোলাইটাসের মৃত্যু সংবাদ। ঠিক এই সময়ে থেসিউসের সামনে আবির্ভূত হলো দেবী আর্তেমিস। রাজাকে খুলে বললো পুরো ঘটনা। ঘোষণা দিলো, হিপোলাইটাস নির্দোষ। রাণী ফেইড্রারই আসলে দোষ। আর পুরো ঘটনার জন্যে দায়ী আসলে দেবী আফ্রোদিতি। সে-ই সব নাটের গুরু। থেসিউস তখন দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে দেবী আর্তেমিসকে শুধালো, আরো আগেই কেন সে তার ভক্ত হিপোলাইটাসকে বাঁচাতে এলো না? কীভাবে নিজ চোখে সে নিজের ভক্তের এমন মৃত্যু সহ্য করলো?
দেবী আর্তেমিস তখন জানালো, সমস্ত দেবদেবীর মাঝে এক অলিখিত চুক্তি আছে। এক দেবতার ভক্তকে নিয়ে আরেক দেবতার কোনো পরিকল্পনায় কেউ বাগড়া দিবে না। যদি মনে হয় নিজের ভক্তের প্রতি অন্যায় করা হয়েছে, তবে প্রতিশোধস্বরূপ সেই দেবতা অন্য আরেক দেবতার ভক্তেরও অনিষ্ট করতে পারে।

ঠিক এমন সময়ে নিয়ে আসা হলো হিপোলাইটাসের লাশ। সেই মৃতদেহ ছুঁয়ে দেবী আর্তেমিস শপথ করলো, তার অতি প্রিয় এক ভক্তকে হিংসা বশত হত্যা করেছে আফ্রোদিতি। সেও আফ্রোদিতির সবচেয়ে পছন্দের এক ব্যক্তিকে হত্যা করবে। এই বলে অদৃশ্য হয়ে গেলো দেবী আর্তেমিস।

(প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, দেবী আর্তেমিসের হাতেই আফ্রোদিতির ভালোবাসা এডোনিসের মৃত্যু ঘটেছিলো বলে কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়। তবে সেটা হিপোলাইটাসের হত্যার প্রতিশোধ কিনা, সেটা গ্রীক বা রোমান পুরাণের কোথাও উল্লেখ নেই। দেবদেবীদের একজন আরেকজনের ভক্তকে হত্যা করার ব্যাপারটা নিয়েই শেকসপিয়ার তাঁর ‘কিং লিয়ার’ নাটকে লিখেছিলেন, “খেলায় রত বালকদের কাছে ফড়িংরা যেমন, ঈশ্বরদের কাছেও আমরা তাইই। তারা আমাদের হত্যা করে নিজেদের ক্রীড়ামোদের জন্যে”।)

তথ্যসূত্রঃ
১। http://www.ancient-literature.com/greece_euripides_hippolyt…
২। http://www.pantheon.org/articles/p/phaedra.html
৩। https://en.wikipedia.org/wiki/Hippolytus_(son_of_Theseus)
৪। https://en.wikipedia.org/wiki/Phaedra_(mythology)

লিখেছেন – রিজওয়ানুর রহমান প্রিন্স

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

About Admin