Monday , 21 May 2018
Breaking News
Home » মতামত » বিভিন্ন পুরাণের প্রেম কাহিনীগুলোঃ ওকুনি-নুশি এবং সুসেরি-হিমে (জাপানী পুরাণ)

বিভিন্ন পুরাণের প্রেম কাহিনীগুলোঃ ওকুনি-নুশি এবং সুসেরি-হিমে (জাপানী পুরাণ)

জাপানের প্রাচীন পৌরাণিক গ্রন্থসমূহের মধ্যে দু’টি হলো ‘কোজিকি’ (৭১২ খ্রিস্টাব্দের দিকে রচিত) এবং ‘ইৎযুমো নো কুনি ফুদোকি’ (৭৩৩ খ্রিস্টাব্দের দিকে রচিত)। এই দুই গ্রন্থে ‘ওকুনি-নুশি’ নামক এক দেবতার কাহিনী বলা হয়। ইৎযুমো অঞ্চলে তাকে দেবতা মেনে উপাসনা এবং বিভিন্ন উৎসব পালন করা হয়। ঔষধ-পথ্যের দেবতা হিসেবে মানা হয় তাকে। এছাড়া ধারণা করা হয়, জাপানের ইৎযুমো অঞ্চলের গোড়াপত্তন সে-ই করেছিলো। তার নামের অর্থ দাঁড়ায় ‘স্বর্গের নিচের যা কিছু আছে, তার শাসনকর্তা’। এই ওকুনি-নুশি একবার প্রেমে পড়েছিলো পাতাল দেবতার কন্যা ‘সুসেরি-হিমে’-র। সেই কাহিনীই বলতে যাচ্ছি আজ।

আ

ওকুনি-নুশি এবং সুসেরি-হিমে (জাপানী পুরাণ)

ওকুনি-নুশিরা ছিলো আশি (৮০) ভাই। সব দেবতা ভাই-বেরাদর মিলে একত্রে বসবাস করতো। সবার মধ্যে ছোট ছিলো ওকুনি-নুশি। বাকি সব ভাইদের মধ্যে সে-ই ছিলো ভীষণ ভদ্র এবং দয়ালু। তার বাকি ভাইয়েরা তাকে ভীষণ খাটাতো। একবার তাদের কানে খবর এলো, ‘ইনাবা’ অঞ্চলের এক অতি রূপসী দেবী, ‘ইয়াগামি-হিমে’, বিয়ের জন্যে পাত্র খুঁজছে। তারা সবাইই চাইলো ইয়াগামি-হিমেকে নিজের স্ত্রী হিসেবে পেতে। তাই রওনা করলো ইনাবা অঞ্চলের উদ্দেশ্যে। সব ভাই মিলে তাদের বাক্স-পেঁটরা চাপালো ছোট ভাই ওকুনি-নুশির ঘাড়ে। তাদের সবার বাক্স ঠেলতে গিয়ে সে পড়ে গেলো দল থেকে অনেক পিছনে।

বড় ভাইদের দল যখন ইনাবার সমুদ্র তটে এসে পৌঁছালো, তখন দেখলো সেখানে একটা খরগোশ বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে আছে। তার সারা গায়ের লোম কেউ কামড়ে ছিঁড়ে নিয়েছে, এমন মনে হয় দেখলে। ব্যথায় ভীষণ কাঁদছে সে। তারা জিজ্ঞেস করলো, খরগোশটার এই অবস্থা কী করে হয়েছে?
খরগোশটা কাঁদতে কাঁদতে বললো, সে সমুদ্রের ওপারের ‘ওকি’ নামক এক রাজ্য হতে ইনাবায় এসেছে। সমুদ্র পার হবার সময় সে ওখানকার হাঙ্গরগুলোর সাথে এক চালাকি করেছিলো। তাদের একজনকে ডেকে চ্যালেঞ্জ করেছিলো এই বলে যে, দেখি তোমাদের হাঙ্গর গোত্রের সদস্য সংখ্যা বেশি, নাকি আমাদের খরগোশ গোত্রের সদস্য সংখ্যা বেশি। তোমরা একজনের পেছনে একজন লাইন ধরে দাঁড়িয়ে যাও।
হাঙ্গরেরা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে দাঁড়িয়ে পড়তেই খরগোশ হাঙ্গরের সংখ্যা গোনার ভান করে একটার পর একটা হাঙ্গরের পিঠে লাফিয়ে চলে সমুদ্র পার হতে থাকলো। যখন সে সমুদ্র প্রায় পার হয়ে যায় যায় অবস্থা, তখন হাঙ্গরেরা বুঝলো, কিছু একটা ঠিক নেই। খরগোশ তাদের সাথে চালাকি করেছে। তখন লাইনের শেষ হাঙ্গরটা খরগোশটাকে খপ করে মুখে ধরে ফেললো। পরে তাকে কামড়ে, পশম সব ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলে রেখে গেলো ইনাবার সমুদ্র তটে। খরগোশটা সেই দেবতাদের দলকে জিজ্ঞেস করলো, কী করলে তার শরীরের যন্ত্রণা কমবে?

খরগোশের কাহিনী শুনে বড় ভাইদের দলটা খিক খিক করে হেসেই অস্থির। তবুও তারা গম্ভীর মুখে পরামর্শ দিলো, খরগোশটা যাতে সমুদ্রের জলে ভালোমতো গা ধুয়ে এরপরে উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকে। সেখানকার বাতাসে সে ভালো হয়ে যাবে।
খরগোশ তাই করলো। কিন্তু যখন পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ালো, তখন তার শরীরের চামড়া ফেটে গেলো আর সেই ফাটল দিয়ে ঢুকে পড়লো সমুদ্রের জলের লবণ। তীব্র ব্যথায় কাতর হয়ে পড়লো সে।

খানিক বাদেই সেই পথ ধরে এগিয়ে এলো ওকুনি-নুশি। সে খরগোশের দুরবস্থা দেখে শুধালো, কী হয়েছে? সব শুনে পরে বললো, তুমি নদীর মিষ্টি আর পরিষ্কার জলে আগে স্নান করে নাও। তারপরে বনের ভেতরে Cattails (৬-১০ ফুট লম্বা তৃণ জাতীয় উদ্ভিদ) পাবে। সেগুলো সংগ্রহ করে বিছানা বানিয়ে তাতে গড়াগড়ি খাও। তাতে তুমি আগের মতো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবে।
খরগোশটা তাই করলো এবং আগের মতো পুরো সুস্থ হয়ে উঠলো। তখন সে খুশি হয়ে ওকুনি-নুশিকে জানালো, তোমার বড় ভাইয়েরা ইয়াগামি-হিমেকে বিয়ে করতে যাচ্ছে। কিন্তু শুনে রাখো, ইয়াগামি তোমাকেই পছন্দ করবে বর হিসেবে।

পরে দেখা গেলো, খরগোশের কথাই ফলেছে। স্বয়ম্বর সভায় হাজার হাজার সুদর্শন দেবতাকে ফেলে ওকুনি-নুশির মতো ভদ্র এবং দয়ালু এক দেবতাকেই বেছে নিয়েছে দেবী ইয়াগামি-হিমে। এটা দেখে ভীষণ ক্ষেপে গেলো তার বড় ভাইয়েরা। মেরে ফেলার পরিকল্পনা করলো তাদের ছোট ভাইকে। প্রথমে একবার তাকে মারলো পাহাড়ের বিশাল বড় এক পাথরের চাঁই দিয়ে। তখন তার মা দেবতা ‘কামি-মুসুবি’-র কাছে আর্জি জানালো তার সন্তানকে বাঁচিয়ে তুলতে। সে তা-ই করলো। এরপরে আবার ওকুনিকে তার ভাইয়েরা মেরে ফেললো এক বিশাল গাছের গুঁড়িতে চাপা দিয়ে। তার মা এবারও তাকে বাঁচিয়ে তুললো। এরপরে তাকে পরামর্শ দিলো, সে যাতে পাতালের দেবতা ‘সুসানো-ও’-এর কাছে গিয়ে আশ্রয় নেয়, তার পরামর্শ চায়।

ওকুনি-নুশি মায়ের কথা মেনে গেলো পাতাল রাজ্যে। সেখানে গিয়ে দেখা করলো দেবতা সুসানো-ওর সাথে। পরামর্শ চাইলো তার। সুসানো-ও প্রথমে চাইলো ওকুনি-নুশির সামর্থ্য সম্পর্কে পরীক্ষা করে দেখতে। সে ওকুনিকে বললো, প্রথম রাতে সে যেন তার দেখিয়ে দেওয়া একটা নির্দিষ্ট কক্ষে গিয়ে ঘুমায়। ওকুনি তাই চললো সেই কক্ষে বিশ্রাম নিতে। হঠাৎ তাকে ভীষণ মিষ্টি স্বরে কে যেন ডাকলো। ওকুনি এদিক-সেদিক খুঁজে দেখতে পেলো, আড়াল হতে এক অপূর্ব সুন্দরী নারী তাকে হাত ইশারা করে ডাকছে।
রূপসী নারীটা ছিলো আসলে সুসেরি-হিমে, পাতাল রাজ সুসানো-ওয়ের কন্যা। আড়াল থেকে ওকুনি-নুশিকে দেখছিলো সে। এক দেখাতেই এই সরল-সোজা পুরুষটাকে ভীষণ ভালো লেগে গিয়েছিলো তার। সে ওকুনিকে ডেকে বললো, বাবা তোমাকে যে কক্ষে বিশ্রাম নিতে পাঠাচ্ছে, ওটা বিষধর সাপে ভর্তি। তুমি এই স্কার্ফটা নাও। এটা তোমার সাথে রাখলে ঐ বিষধর সাপেরা কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।

ওকুনি তা-ই করলো। ঐ বিষধর সাপে ভর্তি কক্ষে সুসেরি-হিমের দেয়া স্কার্ফটা সাথে রেখেই আরামসে ঘুম দিলো সে। পরদিন তাকে জীবিত দেখে সুসানো-ওয়ের চোখ ছানাবড়া। তারপরও নিজেকে সামলে নিয়ে সে বললো, আজকে রাতে তুমি অন্য আরেকটা কক্ষে ঘুমিয়ো। সেই কক্ষ ছিলো বিছা, শতপদী আর মৌমাছিতে ভর্তি। কিন্তু সেই রাতেও সুসেরি-হিমে গোপনে ওকুনিকে তার আরেকটা স্কার্ফ উপহার দিলো। সেটা সাথে রেখে ঘুমানোয় কিছুই হলো না ওকুনির।

সুসানো-ও বুঝতে পারলো না তার পাতাল রাজ্যে এসে এই ছোকরাটা কীভাবে পরপর দুই রাত টিকে গেলো। তাই সে আরো কঠিন এক পরীক্ষা নেয়ার চিন্তা করলো। সে ধনুক থেকে একটা তীর ছুঁড়লো বিশাল এক মাঠের মাঝখানে। তারপরে বললো তীরটা খুঁজে নিয়ে আসতে। ওকুনি গেলো তীরটা খুঁজে বের করতে। সে মাঠের মাঝামাঝি যেতেই সুসানো-ও মাঠের চারপাশে আগেই জমা করে রাখা খড়ে আগুন ধরিয়ে দিলো। সেই আগুন পুরো ঘিরে ধরলো ওকুনিকে। ওকুনির দুরবস্থা দেখে ভীষণ তটস্থ হয়ে দেবী সুসেরি-হিমে পাঠিয়ে দিলো একটা ইঁদুরের দলকে। তারা ঐ মাঠের ভিতরেই গর্ত করে বাসা বেঁধে থাকতো। ইঁদুরেরা গিয়ে ওকুনিকে বললো তাদের গর্তে ঢুকে পড়তে। ওকুনি তা-ই করলো। পরে আগুন যখন নিভে গেলো, তখন ইঁদুরেরা গিয়ে খুঁজে আনলো সেই তীরটা। তীর নিয়ে হাজির হলো ওকুনি সুসানো-ওর নিকট। সুসানো-ওর চোয়াল ঝুলে পড়লো। সে ধীরে ধীরে ওকুনিকে পছন্দ করতে শুরু করলো। তাকে বিভিন্ন বিদ্যা শিক্ষা দিতে লাগলো।

এদিকে ওকুনি-নুশি আর সুসেরি-হিমের মধ্যে চলছে তুমুল প্রেম। কিন্তু দু’জনেই জানতো, পাতালরাজ তাদের এই সম্পর্ক মেনে নিবে না। তখন ওকুনি সুসেরিকে বললো, সে যেন চিন্তা না করে। সে যেভাবেই হোক এই অন্ধকার পাতাল রাজ্য হতে সুসেরিকে উদ্ধার করবেই। পরে তারা দু’জনে বিয়ে করবে।

একদিন সুসানো-ওকে ওকুনি-নুশি মাথার চুলে বিলি কেটে ঘুম পাড়িয়ে দিলো। তারপরে তার চুলের বিশাল বিশাল জটাগুলো বেঁধে দিলো প্রাসাদের কয়েকটা পিলারের সাথে। সুসেরি-হিমে প্রস্তুত হয়েই ছিলো আগের থেকে। পাতালরাজ ঘুমিয়ে পড়তেই সে ওকুনির সাথে বেরিয়ে পড়লো প্রাসাদ ছেড়ে। ওকুনি প্রাসাদ ছাড়ার আগে সঙ্গে করে নিয়ে নিলো সুসানো-ওয়ের তরবারি, তীর-ধনুক এবং হার্প (বাদ্যযন্ত্র – এটার মাধ্যমে পাতালরাজ ভূমিকম্প ঘটাতো)। দু’জনে ছুটতে শুরু করলো। ছুটতে ছুটতে হার্পটা বাড়ি খেলো পাথরে ঠুকে। সাথে সাথে ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেলো। জেগে উঠলো সুসানো-ও। ঘটনা বুঝতেই সে ধাওয়া করলো তাদের দু’জনকে। ধাওয়া করার সময় পিলারের উপরে তার জটার টানে ধসে পড়লো প্রাসাদ। ছুটতে ছুটতে পাতালের প্রবেশ মুখ পেরিয়ে গেলো ওকুনি এবং সুসেরি। সুসানো যখন বুঝলো তাদের আর ধরার আশা নেই, তখন ভগ্নহৃদয়ে সে চেঁচিয়ে বলতে লাগলো – ওকুনি যেন তার তরবারি আর ধনুক নিয়েই ভাইদের সাথে লড়াই করে। তাহলে সে লড়াইয়ে জিতবে। আর দু’জনে যাতে বিয়ে করে সুখী হয়।

ওকুনি-নুশি পরে পাতালরাজ সুসানো-ওর অস্ত্র দিয়ে লড়াই করে পরাজিত করেছিলো তার ৭৯ জন দেবতা ভাইকে। দেবী সুসেরি-হিমেকে বিয়ে করে সে বসত গেড়েছিলো ইৎযুমো অঞ্চলে। পরে তার শাসনেই ইৎযুমো অঞ্চল এক প্রভাবশালী রাজ্যে পরিণত হয়।

তথ্যসূত্র:
১। http://en.japanese-culture.info/essays/legends/suseri_and_okuninushi_no_mikoto
২। http://www.mythologydictionary.com/okuni-nushi-mythology.html
৩। https://en.wikipedia.org/wiki/Ōkuninushi
৪। https://en.wikipedia.org/wiki/Ōkuninushi
৫। http://www.japanesemythology.jp/okuninushi/

লিখেছেন – রিজওয়ানুর রহমান প্রিন্স

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

About Admin