Tuesday , 17 July 2018
Breaking News
Home » মিথলজি » বিভিন্ন পুরাণের প্রেম কাহিনীগুলোঃ ওসাইরিস এবং আইসিস (মিশরীয় পুরাণ)

বিভিন্ন পুরাণের প্রেম কাহিনীগুলোঃ ওসাইরিস এবং আইসিস (মিশরীয় পুরাণ)

প্রাচীন মানুষেরা আশেপাশের জগত নিয়ে কীভাবে চিন্তা করতো, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় বিভিন্ন পৌরাণিক গ্রন্থে উঁকি মারলে। আমাদের জগতটা কীভাবে, কোথা থেকে এলো কিংবা কোনটা সঠিক, কোনটা ভুল, কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায় – এসব চিন্তাভাবনার পাশাপাশি প্রেম-ভালোবাসা নামক জিনিসটাও অবশ্য কালে কালে মানুষকে ভাবিয়ে এসেছে বেশ। ফলে বিভিন্ন পুরাণে সৃষ্টিতত্ত্ব, ন্যায়-নীতির বিভিন্ন তত্ত্ব নিয়ে আলোচনার সাথে সাথেই উঠে এসেছে প্রেম-ভালোবাসা সম্পর্কিত অনেক কাহিনী, যেগুলো আজও অবিস্মরণীয় হয়ে আছে মানুষের হৃদয়ে। বর্তমানকালে মানুষ বিভিন্ন পুরাণের প্রকৃত উৎস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকা সত্ত্বেও এই সব প্রেমের গল্প-গাঁথার রস আস্বাদন হতে বিন্দুমাত্র পিছু হটেনি।

আ

ওসাইরিস এবং আইসিস (মিশরীয় পুরাণ)

সূর্য দেবতা ‘রা’ এবং রাতের আকাশের দেবী ‘নুট’ এর সংসারে জন্ম নিয়েছিলো চার সন্তান: ওসাইরিস, আইসিস, সেট এবং নেপথিস। এদের মধ্যে দেবতা ওসাইরিস ছিলো সবচেয়ে বড়, তার ছোটজন ছিলো দেবী আইসিস, এরপরে দেবতা সেট এবং সবশেষে নেপথিস।

এই চারজনের মধ্যে ওসাইরিসকে দেবতা ‘রা’ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতো। ওসাইরিসকে তৎকালীন মিশরীয় প্রথা অনুযায়ী বিয়ে দেয়া হয়েছিলো তার বোন আইসিসের সাথে। পরে দেবতা রা ওসাইরিসকেই মনোনীত করেছিলো মিশরের ফারাও হিসেবে। ওসাইরিস এবং আইসিসের ছিলো অত্যন্ত সুখের সংসার। দু’জনে মিলে ন্যায় এবং নিষ্ঠা সহকারে রাজ্য পরিচালনা করে যাচ্ছিলো। তাদের শাসনে মিশরীয়রা ছিলো অত্যন্ত সুখী।

কিন্তু বড় ভাইয়ের এতো প্রশংসা, জনপ্রিয়তা আর ক্ষমতা দেখে জ্বলে পুড়ে মরছিলো ছোট ভাই সেট। মিশরের ফারাও হয়ে বসারও খুব শখ তার! দেবতা সেটের বিয়ে হয়েছিলো তার ছোট বোন নেপথিসের সাথে। প্রসঙ্গত একটা ঘটনা বলে রাখি। একবার সেট রেগে মেগে দেবী নেপথিসকে জানিয়ে দিলো, সে তাকে গর্ভে কোনো সন্তান জন্ম নিতে দিবে না। নেপথিসকে সে মা হতে দিবে না। পরে নেপথিস মা হবার প্রচণ্ড আকাঙ্ক্ষায় একটা কূটচাল চাললো। সেটের চরিত্র সম্পর্কে তার জানা ছিলো। নারীসঙ্গের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ তার। তাই নেপথিস তার বড় বোন আইসিসের ছদ্মবেশে গিয়ে উপস্থিত হয় সেটের সামনে এবং তাকে প্রলুব্ধ করে মিলনের জন্যে। সেই মিলনে জন্ম নেয় দেবতা ‘আনুবিস’। আনুবিসের জন্মের পরে সেট মূল ঘটনা বুঝে ফেলে তাকে মেরে ফেলতে পারে, এই ভয়ে নেপথিস দেবী আইসিসের কাছে গিয়ে পুরো ঘটনা ফাঁস করে দেয়। সেই সাথে তাকে আকুতি জানায় আনুবিসকে নিজের সন্তান পরিচয়ে বড় করে তোলার জন্যে। নেপথিসের দুঃখ বুঝে আইসিস এবং ওসাইরিস যুগল রাজি হয় আনুবিসকে নিজেদের সন্তান পরিচয়ে পালতে।

ফিরে আসি মূল ঘটনায়। বলছিলাম ওসাইরিসের প্রতি তার ভাই সেটের হিংসার কথা। সে উপায় খুঁজতে লাগলো, কীভাবে ওসাইরিসকে সরিয়ে মিশরের ফারাও হয়ে বসা যায়! একবার রাজদরবারে এক উৎসবের সময়ে সেট একটা অতি সুন্দর কারুকার্য করা বাক্স সাথে নিয়ে এসে হাজির হলো। সেই বাক্স দেখিয়ে সবাইকে বললো, যে এই বাক্সটার ভিতরে নিখুঁতভাবে সেঁধে যেতে পারবে, তাকে অতি মনোহর ডিজাইনের বাক্সটা উপহার দেয়া হবে। বাক্সটা আসলে ওসাইরিসের শরীরের মাপে বানিয়েছিলো সেট। ওসাইরিস ঘুমে থাকার সময়ে তার শরীরের মাপ বুঝে নিয়েছিলো সে গোপনে। একে একে সবাই চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু বাক্সটা কারো মাপমতো হয় না। কারো বেশি হয় মাপে, কারো হয় কম। এবারে ঘটনাটায় মজা পেয়ে এলো দেবতা ওসাইরিস। সেও চেষ্টা নিতে চাইলো। তাকে দেয়া হলো সুযোগ। বাক্সটার ভিতরে একদম খাপে খাপে সেঁধে যেতে পারলো ওসাইরিস। ঠিক তখনই বাক্সটার ঢাকনা লাগিয়ে সেটা আটকে দিলো দেবতা সেট। বাক্সটা হয়ে গেলো ওসাইরিসের কফিন। সেই কফিনটা সর্বশক্তিতে নীল নদে ছুঁড়ে ফেললো দেবতা সেট। সেই সাথে তাড়ালো দেবী আইসিসকেও সিংহাসন থেকে। পরে নিজেই একচেটিয়া শাসক হয়ে বসলো মিশরের। শুরু হলো মিশরের অন্ধকার এক শাসনকালের।

এদিকে ভাই এবং স্বামী ওসাইরিসের বিয়োগব্যথায় কাতর দেবী আইসিস ঘুরে বেড়াচ্ছে উদভ্রান্তের মতো এদিক সেদিক। খুঁজে ফিরছে তার স্বামীর লাশের কফিন। খুঁজতে খুঁজতে বহুকাল পরে নীল নদের পাড়ে এক বিশাল গাছের গুঁড়িতে আটকে থাকা অবস্থায় পাওয়া গেলো সেটা। কফিনটা ভাসতে ভাসতে ঐখানে এসে উঠেছিলো। পরে সেই কফিনের চারপাশে জন্মেছিলো বিশাল গাছটা। আইসিস কফিনটাকে সেখান হতে বের করে এনে লুকিয়ে রাখলো আরেক জায়গায়। তার ইচ্ছা, ওসাইরিসকে কিছু সময়ের জন্যে জীবনদান করা। পরে তার সাথে মিলনে একটা সন্তান জন্মানো। সেই সন্তানকে সঠিকভাবে দীক্ষা দিয়ে যাতে পরে দেবতা সেটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘটিয়ে তার অপকর্মের প্রতিশোধ নেয়া যায়।

কিন্তু এতো লুকোছাপার পরেও কফিনটা উদ্ধারের ব্যাপারে জেনে গেলো সেট। সে তখন নিজেই কফিনটাকে নিয়ে এসে ভেতরে থাকা ওসাইরিসের লাশটাকে অনেকগুলো টুকরো করলো (কারো মতে ১৪টা, আবার কোনো কোনো বর্ণনায় লেখা আছে ৪২টা)। পরে সেই সব টুকরো ছড়িয়ে দিলো মিশরের বিভিন্ন জায়গায়। দেবী আইসিসকে এবারে শোকের সাথে সাথে প্রচণ্ড হতাশাও আঁকড়ে ধরলো। ঠিক এই সময়ে তার পাশে এসে দাঁড়ালো তার ছোট বোন নেপথিস। নিজের ভাই ও স্বামী সেটের এমন সব অপকর্ম সে কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলো না। তাই আইসিসকে সে সাহস যোগালো আবার। দুই বোন মিলে বের হলো মিশর অভিযানে। সারা মিশর দেশ বহুকাল ধরে ঘুরে ওসাইরিসের শরীরের সব ছড়ানো টুকরো একত্র করলো দু’জনে। কিন্তু একটা অংশ বহু খুঁজেও পেলো না। সেটা হচ্ছে ওসাইরিসের পুরুষাঙ্গ। নীল নদের মাছেরা খেয়ে ফেলেছিলো ঐ অংশটা। পরে দেবী আইসিস একটা কাঠের পুরুষাঙ্গ বানিয়ে নিয়েছিলো। তারপর তাকে নিয়ে যাওয়া হলো দেবতা আনুবিসের কাছে (যে কিনা নেপথিসের সন্তান, কিন্তু বড় হয়েছিলো ওসাইরিস এবং আইসিসের পরিচয়ে)। দেবতা আনুবিস সব টুকরো একত্র করে জোড়া লাগালো ওসাইরিসকে। তারপর কিছু সময়ের জন্যে প্রাণ দিলো ওসাইরিসের শরীরে। আবার কোনো কোনো বর্ণনায় আছে দেবতা ‘ঠোট (Thoth)’-এর ক্ষমতায় প্রাণ ফিরে পেয়েছিলো ওসাইরিস।

প্রাণ পেয়ে চোখ মেললো ওসাইরিস। বহুকাল পরে পরস্পরের চোখে চোখ রেখে তাকালো ওসাইরিস এবং আইসিস। মিলিত হলো দু’জনে। তাদের মিলনে জন্ম নিলো ‘হোরাস’। এই হোরাস পরে বড় হয়ে দেবতা সেটের দুঃশাসনের অবসান করেছিলো তাকে হত্যা করে। সেটা আরেক বিশাল কাহিনী। ওদিকে আর যাবো না। আইসিসের গর্ভে হোরাসকে জন্ম দিয়ে শেষবারের মতো আলিঙ্গন করলো ওসাইরিস তার স্ত্রীকে। এরপরে আবার মৃতদের জগতে চলে গেলো সে। সেখানে ওসাইরিসকে দেবতা ‘রা’ বানালো পাতালপুরীর শাসক। মৃতদের দেবতা হয়ে বসলো ওসাইরিস। ওসাইরিস এবং আইসিসকে দেবদেবীরা খুবই পছন্দ করতো। কিন্তু এরপরেও ওসাইরিসকে মৃতদের জগত থেকে ফেরানোর আর কোনো উপায় ছিলো না। ফলে সম্ভব ছিলো না ওসাইরিস এবং আইসিসের পুনর্মিলন ঘটা। এখন থেকে অনাদিকাল আইসিস থাকবে স্বর্গে আর ওসাইরিস থাকবে পাতালপুরীতে। বিরহে প্রচণ্ড কাতর হয়ে পড়লো দেবী আইসিস।

কথিত আছে, এখান থেকেই সূত্রপাত নীল নদের প্লাবনের। প্রতি বছরের একটা বিশেষ দিনে দেবী আইসিস স্বর্গ হতে নেমে আসে নীল নদের নিকট, যেখানে প্রথম সে খুঁজে পেয়েছিলো তার স্বামী ওসাইরিসের লাশের কফিন। সেখানে বসে সারারাত জেগে কেঁদে চলে সে ওসাইরিসের জন্যে। তার চোখের জলে ঢল নামে নীল নদে। উর্বর করে দিয়ে যায় মিশরের সকল আবাদি জমি।

তথ্যসূত্র:
———-
১। https://en.wikipedia.org/wiki/Osiris_myth
২। https://en.wikipedia.org/wiki/Isis
৩। http://www.egyptianmyths.net/osiris.htm

লিখেছেন – রিজওয়ানুর রহমান প্রিন্স

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

About Admin