আগের পর্বগুলোতে আমরা বেশ কিছু তারকামণ্ডলের মিথলজি সম্পর্কে জেনেছি। আজকে আমরা সিংহ তারকামণ্ডল সম্পর্কে জানবো। সিংহ তারকামণ্ডলটি ইংরেজিতে “Leo” নামে পরিচিত।

a

তারকামণ্ডলীদের নিয়ে পৌরাণিক কাহিনী: পর্ব – ০১ (মেষ তারকামণ্ডল)

তারকামণ্ডলীদের নিয়ে পৌরাণিক কাহিনী: পর্ব – ০২ (বৃষ তারকামণ্ডল)

তারকামণ্ডলীদের নিয়ে পৌরাণিক কাহিনী: পর্ব – ০৩ (মিথুন তারকামণ্ডল)

তারকামণ্ডলীদের নিয়ে পৌরাণিক কাহিনী: পর্ব – ০৪ (কর্কট তারকামণ্ডল)

সিংহ তারকামণ্ডল নিয়ে মিথটি একটু জটিল। ‘লিও’ নামে একটা সিংহের কাহিনী এতে বর্ণনা করা হয়, যাকে হারকিউলিসের ১২টি কাজের সুবাদে আমরা চিনি। হারকিউলিসকে দেয়া ১২টি কাজের একটি ছিল এই নেমিয়ান সিংহকে খোঁজা ও শিকার করা। লিও ছিলো বিশাল, শক্তিশালী। তার লুকোনোর জায়গা খুঁজে পাওয়া ছিলো বলতে গেলে অসম্ভব! সে স্থানীয় বাসিন্দাদের জ্বালাতন করতো। তার চামড়া এতোটাই শক্ত ছিলো যে, কোনো অস্ত্র দিয়েই এটা ভেদ করা বা ছেঁড়া যেতো না। তাই, কেউ এর কোনো ক্ষতিও করতে পারতো না।
.
হারকিউলিস অবশ্য তাকে এতোটা পাত্তা দেয়নি প্রথমে। সে ভেবেছিল, তাকে সহজেই খুঁজে পাবে, আর তীর ছুঁড়ে হত্যা করবে। খুঁজে পেতে একটু সময় লাগলেও সে অবশেষে খুঁজে পেল লিওকে এবং তার পরিকল্পনা অনুযায়ী তীর ছুঁড়ল। কিন্তু, এতে সিংহের কিছু তো হলোই না, বরং এটা ভয়ানক খেপে গেলো! রেগেমেগে সে হারকিউলিসকে তাড়া করলো!
.
হারকিউলিস ছিল অসীম সাহসী। সে তো পিছু হটলই না, বরং সিংহটাকেই হামলা করে বসলো! পালটা হামলায় অপ্রস্তুত সিংহ বেচারা অবাকও হলো, ভয়ও পেলো। দৌড়ে নিজের গুহায় গিয়ে লুকালো। গুহার দু’টো প্রবেশমুখ ছিল। হারকিঊলিস একটা মুখ বন্ধ করল। তারপর, গদা হাতে ভিতরে দৌড়ে গেল। সিংহটা পালানোর রাস্তা তো পেলোই না, উপরন্তু হারকিউলিসের গদার আঘাতে তার মাথা ঝনঝন করে উঠল । হারকিউলিস তাকে পাল্টা আঘাতের সুযোগ দিলো না, দু’হাতে সিংহের মুখ ধরে টেনে মেরে ফেললো।
.
হারকিউলিসের কাজ এখানেই শেষ হয়নি। নিজের বিজয় বোঝাতে তাকে সিংহের চামড়া নিয়ে যেতে হতো। কিন্তু, এখানেই বাঁধলো বিপত্তি। অনেক চেষ্টা করেও চামড়া কাটা দূরে থাক, একটু আঁচড়ও বসাতে পারলো না। সে নানাভাবে চেষ্টা করল। কিন্তু, ফলাফল শূন্য! তাহলে কি সিংহটা মেরেও সে তার বিজয় পাবে না?
.
অনেক ভাবনা-চিন্তার পর তার মাথায় এলো যে, সিংহটার নিজের থাবা দিয়েই হয়তো এটা কাটা যাবে। পরে সে তা দিয়েই চেষ্টা করলো, এবং সফল হলো। তারপর সেই চামড়া গায়ে রাজা ইউরিথিউসের কাছে গেলো এবং চামড়াটা দিয়ে নিজের জন্য বর্ম বানিয়ে নিলো। এটা ভবিষ্যতে হারকিউলিসকে অনেকবার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিলো।
.
.
আরেকটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, জিউস বা তার পত্নী হেরার মধ্যে কোনো একজন সিংহ তারামণ্ডল তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু, বর্ণনায় এই সিদ্ধান্তের পেছনের কারণটা অস্পষ্ট। কেউ কেউ বলেন যে, এটা হারকিউলিসের সম্মানে করা হয়েছে, কিন্তু এ কথাটাও এতোটা যৌক্তিক শোনায় না। তাছাড়াও, হারকিউলিসকে নিয়ে তার নামেই একটি তারকামণ্ডল আছে। আবার, নেমিয়ান সিংহের নামে করাটাও অযোক্তিক। কেননা, সে হারকিউলিসকে হারাতে পারেনি। হারাতে পারলে না হয় তাকে আকাশে তুলে অমর করে রাখার ব্যাপারটি মানা যেত। এক্ষেত্রে, নিচের বর্ণনাটির মাধ্যমে বেশ যৌক্তিকতা পাওয়া যায়-
.
দেবী হেরাকে অনেক দেবদেবী এবং আরো অনেক সৃষ্টির জন্মদাত্রী বলা হয়। নেমিয়ান সিংহকেও তার সন্তান হিসেবে গণ্য করা হয়। টারটারুস ও গায়ার কাছে হেরাই প্রথম ‘টাইফন’-কে (সকল দানবের দেবতা) সৃষ্টির আবেদন করেছিলো। এই টাইফনই লিওর বাবা।
.
কিছু বর্ণনায় বলা হয়, হেরা আর সিলিনি (চাঁদের দেবী) মিলে নেমিয়ান সিংহের দেখভাল করেছিলো। দু’টি বর্ণনা মিলে এটা পরিষ্কার যে, জিউসের চেয়ে হেরার সাথেই লিওর সম্পর্ক বেশি। তার নাম নেমিয়ান সিংহ হওয়ার পিছনেও হেরার অবদান আছে। হেরা জিউসের সাথে একদা রেগে গিয়ে সিংহটাকে নেমিয়ায় (করিন্থ-এর দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত) পাঠালে জায়গার নামানুসারে তার নাম ‘নেমিয়ান’ সিংহ হয়। নেমিয়াতে জিউসের মন্দির ছিলো। আর, এতো শক্তিশালী একটা সিংহ থাকায় সেখানে কেউ গিয়ে জিউসের পূজা করার সাহস পেতো না!
.
নেমিয়ান সিংহের মৃত্যুর জন্য হেরা নিজেকেই দোষী মনে করল। তার অনেক মায়া হলো। সে চন্দ্রদেবী সিলিনির আদরের কথা ভেবে তাকে চাঁদের পাশে আকাশে স্থান দিলো। ইরাতোস্থেনিস ও হাইজিনাস – দুইজনেই মত দেন যে, পশুদের রাজা বোঝাতেই একে তারকামণ্ডলে অবস্থান দেয়া হয়েছে।
.
সিংহ তারকামন্ডল নিয়ে কিছু তথ্যঃ
————————————-
কর্কটের মতো এই তারামণ্ডলটিও টলেমী আবিষ্কার করেন। এর উল্লেখযোগ্য তারাগুলো হলোঃ রেগুলাস (আলফা লিওনিস), ডেনেবোলা (বিটা লিওনিস), আলজেইবা (গামা লিওনিস), জোস্মা (ডেল্টা লিওনিস) ইত্যাদি।
.
এটি বেশ পুরনো তারামণ্ডল। খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ সালে মেসোপটেমিয়ানদের ঠিক এটার মতোই একটা তারামণ্ডল ছিলো। পারস্যের অধিবাসীরা একে ‘শির’ বা ‘শের’ বলতো; ব্যবিলনীয়রা একে ‘URGULA’ (শক্তিশালী সিংহ) বলতো; সিরিয়ানরা একে ‘আরিও’ এবং তুর্কিরা ‘আরতান’ বলতো।
.
আকাশে ৬টা অপ্রধান তারা মিলে সিংহের মাথা, রেগুলাস – সিংহের বুক (ব্যবিলনীয়রা ‘রেগুলাস’-কে চিনতো রাজতারা বা ‘যে তারা সিংহের বুকে অবস্থিত’ নামে) , ডেনেবোলা – লেজ, আলজেইবা – ঘাড় ও জোসমা – সিংহের নিতম্ব নির্দেশ করে। এভাবে পুরো তারামণ্ডলটি সিংহের গঠন তৈরি করে।

লিখেছেন – আজমাইন তৌসিক ওয়াসি

TankiBazzমিথলজিabout Constellations
আগের পর্বগুলোতে আমরা বেশ কিছু তারকামণ্ডলের মিথলজি সম্পর্কে জেনেছি। আজকে আমরা সিংহ তারকামণ্ডল সম্পর্কে জানবো। সিংহ তারকামণ্ডলটি ইংরেজিতে “Leo” নামে পরিচিত। তারকামণ্ডলীদের নিয়ে পৌরাণিক কাহিনী: পর্ব – ০১ (মেষ তারকামণ্ডল) তারকামণ্ডলীদের নিয়ে পৌরাণিক কাহিনী: পর্ব – ০২ (বৃষ তারকামণ্ডল) তারকামণ্ডলীদের নিয়ে পৌরাণিক কাহিনী: পর্ব – ০৩ (মিথুন তারকামণ্ডল) তারকামণ্ডলীদের নিয়ে পৌরাণিক কাহিনী: পর্ব...