গ্রীক মিথলজিতে অ্যারিস এবং এথিনা দু’জনেই ছিলো যুদ্ধের দেবতা এবং দেবী। অ্যারিস ছিলো দেবতা জিউস এবং দেবী হেরার সবচেয়ে বড় সন্তান। এদিকে এথিনার জন্ম নিতে হয়েছিলো অনেক বাধা পেরিয়ে। জিউস এবং মেটিসের মিলনের ফলে মেটিস গর্ভবতী হয়ে পড়ে। সেই সময় জিউসের মনে পড়ে তার মাতা গায়ার ভবিষ্যদ্বাণীর কথা। গায়া বলেছিলো, “মেটিস এমন এক সন্তান জন্ম দিবে, যে জিউসের থেকেও বিচক্ষণ হবে”। ফলে জিউস আসন্ন সন্তানের জন্ম ঠেকাতে মেটিসকেই গিলে ফেলে পুরোপুরি। কিন্তু তাতেও কাজ হয় না। জিউসের প্রচণ্ড মাথাব্যথা শুরু হয়। এক পর্যায়ে তার কপাল ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে মাথায় হেলমেট এবং শরীরে বর্ম পরিহিত এক বীরবেশী যোদ্ধা নারী। কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়, জিউসের নির্দেশে তার সন্তান অ্যারিস কুড়াল দিয়ে জিউসের মাথা ফেঁড়ে বের করে আনে এথিনাকে।

a

গ্রীক মিথলজির মিথ: অ্যারিস বনাম এথিনা

বর্তমানে গ্রীক মিথলজি নিয়ে নানান আলোচনায় যুদ্ধদেবতা হিসেবে এরিস এবং এথিনা দু’জনেই ঘুরেফিরে আসে। কিন্তু এরিস একটু বেশিই প্রাধান্য পায় অনেক ক্ষেত্রেই। যুদ্ধের দেবতা হিসেবে সবার আগে অনেক ক্ষেত্রে তার নামই ভেসে উঠে। কিন্তু প্রাচীন গ্রীসে ব্যাপারটা এমন ছিলো না। যুদ্ধের ক্ষেত্রে বরং দেবী এথিনার নামই উচ্চারণ করতো গ্রীকরা সবার আগে। এর পেছনে যথেষ্ট কারণও আছে।

প্রথমত, অ্যারিস যুদ্ধদেবতা হলেও গ্রীক মিথলজিতে তাকে দেখা হতো উন্মাদ এক চরিত্র হিসেবে। জিউস এবং হেরার আদরে বেশ বখে গিয়েছিলো সে। অ্যারিস ছিলো রক্তপিপাসু এক দেবতা। সে চাইতো তার মনুষ্য ভক্তরা যুদ্ধ করুক, কাটাকাটি করে মরুক। কবি হেসিওদের বর্ণনায় আছে, অ্যারিস চাইতো পৃথিবীর সব নদীতে জলের বদলে লাল রক্তের স্রোত বয়ে যাক। এদিকে এথিনা যুদ্ধের দেবী হলেও সে ছিলো নগরীর প্রতিরক্ষার দায়িত্বে। গ্রীকবাসীরা যুদ্ধের সময় প্রার্থনা করতো যাতে দেবী এথেনা তার যুদ্ধকৌশল দিয়ে নিজেদের নগরীকে রক্ষা করে। অ্যারিসের নিকট কেউ কোনো কিছু চাইতো না যুদ্ধে জয়লাভের ব্যাপারে। কারণ, অনেক সময় দেখা যেতো অ্যারিস নিজের ভক্তকেও হত্যা করেছে শুধু নিজের রক্তপিপাসা মেটানোর জন্যে।

দ্বিতীয়ত, যদিও অ্যারিস ছিলো যুদ্ধদেবতা, তথাপি তাকে কাপুরুষ হিসেবে দেখা গিয়েছে মিথলজির বিভিন্ন বর্ণনায়। যেমন, একবার ট্রোজান যোদ্ধাদের হাতে আহত হলে সে ছুটে গিয়েছিলো তার পিতা জিউসের কাছে। বলেছিলো, ট্রয়ের উপরে যেন জিউস অভিশাপ বর্ষণ করে। কিন্তু জিউস প্রত্যুত্তরে বলেছিলো, “তোমার মায়ের (দেবী হেরা) মতো সবকিছু নিয়ে অভিযোগ করা বন্ধ করো”। তদুপরি তাকে গণ্য করা হতো আত্মমর্যাদাহীন এক দেবতা হিসেবে। ট্রয়ের যুদ্ধে অ্যারিস কথা দিয়েছিলো গ্রীকদের পক্ষে থাকবে। কিন্তু পরে যখন দেখলো তার সৎ বোন এথিনাও গ্রীকদের পক্ষে লড়ছে, তখন সে প্রতিশ্রুতি ভেঙ্গে ট্রয়বাসীর পক্ষে চলে গিয়েছিলো। এথিনাকে দু’চোক্ষে দেখতে পারতো না অ্যারিস। জিউসের কাছে সবসময় তার নামে অভিযোগ দিতো। অ্যারিসকে পাশে পেয়েও ট্রয়বাসীরা হেরে গিয়েছিলো, কারণ এথিনার চতুর ও বুদ্ধিদীপ্ত রণকৌশলে গ্রীকরা অজেয় হয়ে উঠেছিলো। অ্যারিসের শক্তিমত্তা কোনো কাজেই আসেনি ট্রয়ের। এথিনা একিলিসকে গাইড করে যখন ট্রয়ের বীর হেক্টরকে বধ করেছিলো, তখন অ্যারিস তার বাবা জিউসের কাছে গিয়ে আরেক দফা এথিনার নামে অভিযোগ জানিয়ে এসেছিলো।

তৃতীয়ত, ধারণা করা হতো, অ্যারিসের নিকট প্রার্থনা করলে প্রার্থনাকারী উন্মাদ হয়ে পড়ে, ঠিক অ্যারিসের মতোই। তখন তার কপালে মৃত্যু নিশ্চিত। হয় সে রক্তপাত ঘটাতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করবে, নতুবা পাগল হয়ে আত্মহত্যা করবে। একারণেও অ্যারিসের ভক্ত সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিলো। তার নামে তেমন কোনো মন্দিরই ছিলো না প্রাচীন গ্রীসে। বরং এথিনার নামে বহু মন্দির উৎসর্গ করা হয়েছিলো সেই সময়ে।

গ্রীক মিথলজিতে অ্যারিস খুব একটা বেশি আসেনি। কিন্তু যখনই এসেছিলো, হয় অপমানিত হবার উদ্দেশ্যে, না হয় তাকে দিয়ে খারাপ কোনো কাজ করানোর উদ্দেশ্যে তাকে আনা হয়েছিলো। যেমন, হেফিস্টাস তার স্ত্রী আফ্রোদিতির সাথে পরকীয়ার সময় নিজের তৈরি ফাঁদে হাতেনাতে ধরে ফেলেছিলো অ্যারিসকে। পরে সব দেবতার সামনে তাদের অপমান করেছিলো। এই অ্যারিস আবার এক পর্যায়ে আফ্রোদিতির প্রেমিক, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পুরুষ হিসেবে খ্যাত ‘অ্যাডোনিস’-কে বন্য দাঁতাল শূকর সেজে হত্যা করেছিলো।

অ্যারিস এবং এথিনা, দু’জনেই যুদ্ধের দেবদেবী হলেও অ্যারিস ছিলো শক্তিমত্তার উপরে নির্ভরশীল ও রক্তপিপাসু। এদিকে এথিনা ছিলো রণকৌশলে বুদ্ধিমত্তা এবং চতুরতা প্রয়োগের সমর্থক। একারণে অ্যারিসের চেয়ে এথিনাই প্রাচীন গ্রীসে বেশি উপাসিত হতো যুদ্ধকালীন সময়ে।

 

লিখেছেন – রিজওয়ানুর রহমান প্রিন্স

মিথলজির মিথ: অ্যারিস বনাম এথিনাTankiBazzমিথলজিares vs athena,গ্রীক মিথলজি,গ্রীক মিথলজি বই,মিথলজি এডিথ হ্যামিল্টন,মিথলজি কি
গ্রীক মিথলজিতে অ্যারিস এবং এথিনা দু'জনেই ছিলো যুদ্ধের দেবতা এবং দেবী। অ্যারিস ছিলো দেবতা জিউস এবং দেবী হেরার সবচেয়ে বড় সন্তান। এদিকে এথিনার জন্ম নিতে হয়েছিলো অনেক বাধা পেরিয়ে। জিউস এবং মেটিসের মিলনের ফলে মেটিস গর্ভবতী হয়ে পড়ে। সেই সময় জিউসের মনে পড়ে তার মাতা গায়ার ভবিষ্যদ্বাণীর কথা। গায়া...