এই গল্পটির উৎপত্তি ২৬০০ বছর আগে, চীন দেশে। অর্থাৎ যিশুখ্রিস্টের জন্মেরও ৬০০ বছর আগে। চীনের প্রধান কয়েকটি পৌরাণিক কাহিনীর মাঝে এটা হচ্ছে একটা। বর্তমানে এই গল্পের অনেক সংস্করণ পাওয়া যায় জাপান, কোরিয়া, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া এবং ভিয়েতনামে। কিন্তু সব সংস্করণের আদি উৎস ঐ ২৬০০ বছর আগের চীনদেশীয় পুঁথিটাই, যাতে কবিতার আকারে বলা আছে ‘নিউ-লাং’ নামক এক রাখাল বালক এবং ‘ঝি-নু’ নামক স্বর্গের এক কাপড় বুননের দেবীর ভালোবাসার গল্প।

আ

নিউ-লাং’ এবং ‘ঝি-নু’ (চীনদেশীয় পুরাণ)

ঝি-নু (মতান্তরে ‘চিহ-নু’ কিংবা ‘চিহ-নি’) ছিলো স্বর্গের দেবতাদের রাজা ‘ইউ-হুয়াং’-এর কন্যা। ঝি-নু ছিলো কাপড় বুননের দেবী। চীনা তাঁতিরা এই দেবীর পূজা-অর্চনা করতো, যাতে কাপড় বুননের সময়ে এই দেবীর আশীর্বাদ প্রাপ্ত হয় তারা, আর উন্নতমানের কাপড় বুনতে পারে। তাছাড়া শরতের আকাশে ভেসে চলা সাদা মেঘেদের দেবীও ছিলো সে। ঝি-নু দুর্দান্ত রকমের কাপড় বুনতে পারতো। তার তৈরি পোশাকে কোনো জোড়া চিহ্ন বুঝা যেতো না। মনে হতো, পুরো পোশাকটাই কাটাকুটি ছাড়া একখণ্ড কাপড় দ্বারা তৈরি করা হয়েছে। তার তৈরি সেই সব পোশাক হতো শরতের তুলোর মেঘের মতোই হালকা এবং পরতে ভীষণ আরামদায়ক। স্বর্গের সবাই তার বোনা পোশাক পরিধান করতে চাইতো। কন্যার এমন পারদর্শিতায় খুশি হয়ে তার পিতা দেবতা ইউ-হুয়াং তাকে পুরস্কার দিতে চাইলো। ঝি-নু তার কাপড় বোনার কাজ হতে দিন কয়েকের ছুটি চাইলো। সে চাইলো পৃথিবীতে একটু ঘুরতে যেতে। ইউ-হুয়াং তা মঞ্জুর করলো। ছুটি পেয়ে ঝি-নু এবং তার বোনেরা নেমে এলো পৃথিবীতে। সেখানে এক স্বচ্ছ জল টলমল সরোবরে তারা স্নান করতে নামলো।

এদিকে ছিলো এক চীনদেশীয় রাখাল বালক। নাম তার নিউ-লাং। এই রাখালের সাতকুলে কেউ ছিলো না। ছিলো শুধু একটা পোষা ষাঁড়। কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়, তার পালক পিতা মৃত্যুর সময় এই ষাঁড়টা তাকে দিয়ে যায় এবং বলে যায়, এটার বিশেষ যত্ন নিতে। সেই ষাঁড়টা ছিলো আসলে জ্ঞানী এক প্রাচীন আত্মা, যে ছদ্মবেশ ধরে আছে। আবার কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়, তার পালক পিতাই সন্তানের প্রতি ভালোবাসার টানে মৃত্যুর পরে আবার ষাঁড়ের রূপ ধরে রাখাল বালকের কাছে ফিরে এসেছিলো।

যাই হোক, ষাঁড়টা সময়ে সময়ে বেশ পরামর্শ দিতো রাখাল বালকটাকে। বেশ কিছুদিন ধরে ষাঁড়টা ঘ্যানঘ্যান শুরু করে দিয়েছিলো রাখালের বিয়ের জন্যে। তার বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সে এখনো কোনো উপযুক্ত পাত্রীর সন্ধান করছে না! রাখাল নির্বিকার গলায় জবাব দিতো, তার মতো হত-দরিদ্র এক রাখালকে কে বিয়ে করবে, যার সাতকুলে কেউ নেই?
জবাবে জ্ঞানী ষাঁড়টা বললো, ঠিক আছে। রাখালের জন্যে পাত্রীর ব্যবস্থা সে-ই করবে।

যখন ঝি-নু আর তার বোনেরা নেমে এলো রাখালের গ্রামের পাশের সরোবরে স্নান করতে, ষাঁড়টা রাখাল বালককে পরামর্শ দিলো তাদের খুলে রাখা কাপড়গুলো চুরি করে নিতে। নিউ-লাং তাই করলো। স্নান সেরে যখন ঝি-নু আর তার বোনেরা তাদের কাপড়চোপড় খুঁজতে শুরু করলো, তখন ভীষণ আতংকিত হয়ে দেখলো সেগুলো আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। স্বর্গীয় ঐ কাপড়গুলো বাদে তারা স্বর্গেও ফিরে যেতে পারবে না। ভীষণ সমস্যা! ঝি-নু দেখতে পেলো একটু দূরেই এক রাখাল বালক উদাস মনে বসে ঘাসের ডগা চিবুচ্ছে। সে নিউ-লাংকে জিজ্ঞেস করলো, এখানে কোনো কাপড়চোপড় পেয়েছে কিনা সে?
জবাবে নিউ-লাং নিরীহ গলায় জানালো, সে পেয়েছে এবং গোপন এক জায়গায় লুকিয়ে রেখেছে কাপড়গুলো।
দেবী ঝি-নু ভীষণ ক্ষেপে গেলো। তৎক্ষণাৎ সে কাপড়গুলো ফেরত চাইলো। কিন্তু নিউ-লাং নির্বিকার গলায় জানিয়ে দিলো, বাকি সবার কাপড় সে ফেরত দেবে, কিন্তু ঝি-নুর কাপড়টা সে ফেরত দেবে না। বাকি সবার কাপড় ফেরত পেতে চাইলে নিউ-লাংকে তার বিয়ে করতে হবে।

মুখ শুকিয়ে গেলো দেবী ঝি-নুর। রাখাল বালক তার কথা হতে একচুল নড়বে না, সেটা বুঝাই যাচ্ছে। ঐ কাপড় ছাড়া তাদের ঐশ্বরিক ক্ষমতা পুরো অচল। এদিকে এই মরণশীল মানুষের কাছে নিজেদের দেবতা বলেও পরিচয় ফাঁস করে দেয়া যাবে না। তাই সে বোনদের সাথে আলাপ করলো কিছুক্ষণ। তারপরে জানালো, রাখাল বালকের শর্তে সে রাজি।

নিউ-লাং ফিরিয়ে দিলো বাকি সবার কাপড়চোপড়। আর ঝি-নু নাম্নী এক অপরূপা নারীকে বিয়ে করে নিয়ে তুললো তার কুটির ঘরে। প্রথম কিছুদিন ভীষণ ক্ষেপে রইলো ঝি-নু। নিউ-লাং বহুভাবে তার মন জয় করার চেষ্টা করলো। ষাঁড়ের থেকে বুদ্ধি-পরামর্শ নিয়ে পরে ধীরে ধীরে মন গলালো সে তার স্ত্রীর। ঝি-নু ভীষণভাবে পছন্দ করে ফেললো নিউ-লাং নামের এই চালচুলোহীন রাখাল বালকটাকে। তাদের সংসার আলো করে এলো দুই সন্তান। এদিকে ঝি-নু তার কাপড় বোনার দক্ষতা দিয়ে বেশ নামডাক করে ফেললো। পয়সা জমিয়ে নতুন ঘর উঠালো। কাপড় বেচার লাভের পয়সায় নিউ-লাং জমি-জমা কিনে তাতে ফসল ফলালো, গবাদিপশু কিনে বেশ ধনী এক কৃষক হয়ে উঠলো সে। দারুণ সুখে কাটতে লাগলো নিউ-লাং আর ঝি-নুর সংসার।

পুরো সাত বছর কাটলো দু’জনের একসাথে। একদিন ঝি-নু তার কাপড়গুলোর ব্যাপারে শুধালো নিউ-লাংকে। জিজ্ঞেস করলো, কোথায় লুকিয়ে রেখেছে সে ওগুলো? নিউ-লাং সরল মনে কাপড়গুলো গোপন স্থান থেকে বের করে এনে তুলে দিলো ঝি-নুর হাতে। ঝি-নু তৎক্ষণাৎ পরে নিলো কাপড়গুলো। নিউ-লাং আর ছোট দুই সন্তান অবাক হয়ে দেখলো ঝি-নু একটা দেবীতে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। নিউ-লাং বুঝলো, সে এই সাত বছর আসলে স্বর্গের এক দেবীর সাথে সংসার করেছে। ঝি-নু নিউ-লাংয়ের হাতে তার দুই সন্তানের ভালোমতো দেখাশুনার ভার দিয়ে চলে গেলো স্বর্গের পানে।

ঝি-নু স্বর্গে চলে যাওয়ায় আঁধার হয়ে গেলো পুরো সংসার। নিউ-লাংয়ের মুখে হাসি নেই, বাচ্চা দু’টোও মায়ের জন্যে ভীষণ শোকগ্রস্ত। নিউ-লাং তখন উপায়ন্তর না পেয়ে ষাঁড়টার কাছে গিয়ে পরামর্শ চাইলো। ষাঁড় বললো, সে চাইলে নিউ-লাংকে স্বর্গের পানে উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারবে। নিউ-লাং বললো, তবে তাই হোক।

ষাঁড়ের পিঠে চড়ে স্বর্গের পানে রওনা করলো নিউ-লাং আর তার ছোট্ট দুই সন্তান। উড়তে উড়তে বহুদূর পথ পেরুলো তারা। কিন্তু স্বর্গের দরজায় তাদের রুখে দিলো দেবতা ইউ-হুয়াং। জানতে চাইলো, তারা কারা? এতদূর পথ পাড়ি দিয়ে কার খোঁজে এসেছে?
নিউ-লাং জবাব দিলো, সে দেবী ঝি-নুর স্বামী। এরা তাদের দুই সন্তান। সে ঝি-নুর সাথে দেখা করতে চায়।
ইউ-হুয়াং দেবী ঝি-নুকে ডেকে এনে জিজ্ঞেস করলো ব্যাপারটা সত্য কিনা? ঝি-নু সত্য স্বীকার করলো। তখন ইউ-হুয়াং জানালো, নিউ-লাং একজন মরণশীল মানুষ। স্বর্গে দেবতাদের সাথে তার ঠাঁই হতে পারে না।

কিন্তু নিউ-লাং আর সন্তানদের ঝি-নুর প্রতি আকুতি দেখে কী করবে বুঝে উঠতে পারলো না ইউ-হুয়াং। ঝি-নুর দিকে তাকালো। তারও চোখ টলোমলো। তখন ইউ-হুয়াং সিদ্ধান্ত দিলো, দেবী ঝি-নু এবং রাখাল বালক নিউ-লাং আকাশের তারা হয়ে থাকবে। বছরের সপ্তম মাসের সপ্তম দিনে তারা শুধু একদিনের জন্যে একে অপরের সাথে দেখা করতে পারবে। এই বলে দেবতা ইউ হুয়াং দেবী ঝি-নুকে বানিয়ে দিলো ‘ভেগা’ নক্ষত্র (‘Lyra’ কন্সটেলেশনে অবস্থিত), আর রাখাল বালক নিউ-লাংকে বানিয়ে দিলো ‘আলতাইর’ নক্ষত্র (‘Aquila’ কন্সটেলেশনে অবস্থিত)।

প্রতি বছর শরতের সময়ে তারা কাছাকাছি আসে। পুরাণের সেই গল্পটায় বলা হয়েছিলো, ঐ সময়টায় এক ঝাঁক স্বর্গীয় চড়ুই পাখি ব্রিজ তৈরি করে দেয়। তাতেই হেঁটে হেঁটে কাছাকাছি আসে দু’জন দু’জনের। বছরের বাকিটা সময় তারা আলাদা থাকে, খুঁজে ফেরে একে অপরকে।

(বিঃদ্রঃ – বিশ্বখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং ‘কসমস’ নামক বিজ্ঞানভিত্তিক জনপ্রিয় টিভি সিরিজ নির্মাতা ‘কার্ল সেগান’ তাঁর রচিত ‘কন্টাক্ট’ নামক এক কল্পবিজ্ঞান উপন্যাসে চীনদেশীয় এই পুরাণটির রেফারেন্স দিয়েছিলেন এক জায়গায়।)

তথ্যসূত্র:
১। https://en.wikipedia.org/wiki/The_Weaver_Girl_and_the_Cowherd
২। https://journeyingtothegoddess.wordpress.com/2012/03/07/goddess-chihnu/
৩। https://books.google.com.bd/books?id=sEIngqiKOugC&pg=PA126&dq=chin+nu&hl=en&sa=X&ved=0ahUKEwjD8ZeayePTAhUKrY8KHXocDL0Q6AEIJDAA#v=onepage&q=chin%20nu&f=false
৪। http://www.godchecker.com/pantheon/chinese-mythology.php?deity=ZHI-NU

লিখেছেন – রিজওয়ানুর রহমান প্রিন্স

বিভিন্ন পুরাণের প্রেম কাহিনীগুলোঃ নিউ-লাং’ এবং ‘ঝি-নু’ (চীনদেশীয় পুরাণ)TankiBazzমিথলজিchinese mythology
এই গল্পটির উৎপত্তি ২৬০০ বছর আগে, চীন দেশে। অর্থাৎ যিশুখ্রিস্টের জন্মেরও ৬০০ বছর আগে। চীনের প্রধান কয়েকটি পৌরাণিক কাহিনীর মাঝে এটা হচ্ছে একটা। বর্তমানে এই গল্পের অনেক সংস্করণ পাওয়া যায় জাপান, কোরিয়া, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া এবং ভিয়েতনামে। কিন্তু সব সংস্করণের আদি উৎস ঐ ২৬০০ বছর আগের চীনদেশীয় পুঁথিটাই, যাতে কবিতার...