চুপাকাব্রার নাম শোনেননি, এমন পুরাণ প্রেমী মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল! এর কাহিনী গ্রিক, রোমান বা আক্কাদিয় পুরাণের মত হাজার বছরের পুরনো নয়। মাত্র ২২ বছর ধরে এই চুপাকাব্রা নিয়ে মাতামাতি হচ্ছে। তাই একে বলা হয় “আধুনিক পৌরাণিক প্রাণী” বা আরবান লিজেন্ড। আমেরিকার গ্রামীণ অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে চুপাকাব্রার কাহিনী। তাই একে প্রধানত আমেরিকার লৌকিক উপাখ্যানের একটি প্রাণি হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়। চুপাকাব্রা সম্পর্কে প্রথম শোনা যায় ক্যারিবিয় সাগরে অবস্থিত দেশ ‘পুয়ের্তো রিকো’তে। কেউ কেউ দাবী করেছেন, তারা চুপাকাব্রাকে দেখেছেন। তাদের থেকে জানা যায়, এটার আচরণ অনেকটা ভ্যাম্পায়ারের মতো, অর্থাৎ এটি রক্তপায়ী।

চুপাকাব্রা

নামকরণঃ
চুপাকাব্রা নামটি এসেছে প্রাণীটির স্বভাব বৈশিষ্ট্য থেকে। চুপাকাব্রা গৃহপালিত পশুর (বিশেষ করে ছাগলের) উপর হামলা করে এবং সেটার রক্ত চুষে খায়। ‘চুপার (chupar)’ শব্দটির অর্থ ‘চোষণকারী’ আর, ‘কাবরা (cabra)’ শব্দের অর্থ ‘ছাগল’। দুইয়ে মিলে চুপাকাব্রার অর্থ দাঁড়ায় ‘ছাগলের রক্ত চুষে খায় যে’।

শারীরিক গঠনঃ
চুপাকাব্রার শারীরিক গঠনের ব্যাপারে একেকজনের মতামত একেক রকম। কারও মতে, এর শারীরিক গঠন অনেকটা সরীসৃপের মতো। তবে এটার আচরণ ও কাজ দেখে বোঝা যায় যে, কুকুর থেকে এটা একটু ভারী, আকার ছোট ভালুকের মতো আর এর ঘাড় থেকে লেজ পর্যন্ত পিঠে মেরদন্ড ববাবর শিং-এর মতো কাঁটা। গায়ের রঙ সবুজাভ ধূসর। এটা উজ্জ্বল লাল চোখ আর চিকচিক করতে থাকা তীক্ষ্ণ দাঁত নিয়ে এটা জঙ্গলে ওত পেতে থাকে আর পশু শিকার করে। দাঁড়ানো অবস্থায় একে দেখতে অনেকটা ক্যাঙ্গারুর মতো লাগে।
আবার অন্যদের মতে, এটি কুকুরের কোনো এক অদ্ভুত প্রজাতি। এটা অনেকটা লোমহীন। এটা নিচের দিকে মুখ করা ত্রিভুজের শীর্ষবিন্দুর মতো তিনটি ছিদ্র করে, অথবা এক বা দুটি ছিদ্র সাধারণভাবে করে তা দিয়ে রক্ত শুষে নেয়।

ইতিহাস ও ঘটনাবলীঃ
চুপাকাব্রার বিস্ময়কর ঘটনাগুলো ‘ভ্যাম্পায়ার ডি মকা’-এর সাথে যুক্ত। ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে পুয়ের্তো রিকোয় প্রকাশিত হয় এমন ঘটনার কথা, যেখানে বলা হয় ‘মকা’র ‘রোচা ব্যারিও’ উপশহরে ১৫টা গরু, ৩টা ছাগল, ২টা রাজহাঁস আর একটা শুকরকে দেহে ছিদ্র করা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। ময়নাতদন্তে জানা যায়, এগুলোর দেহ হতে সমস্ত রক্ত শুষে নেয়া হয়েছে। এই দুর্ঘটনা অনেক শিরোনামের জন্ম দেয় আর পুলিশ একে পাগলা কুকুরের কাজ বলে দোষারোপ করে। পরে যখন একটা গরুকে পাওয়া যায় মাথায় এরূপ ক্ষতসহ, তখন এক পত্রিকা একে “মকার ভ্যাম্পায়ার” বলে আখ্যায়িত করে। ধীরে ধীরে ঘটনাটি আঞ্চলিক উপাখ্যানে পরিণত হয়। এই ঘটনা প্রথন প্রকাশ হওয়ার পর অন্যান্য দেশ যেমন, ডমিনিকান রিপাবলিক, আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, চিলি, কলম্বিয়া, হান্ডুরাস, নিকারাগুয়া, পানামা, পেরু, ব্রাজিলেও এরূপ ঘটনা ঘটার খবর আসে।

১৯৯৫ সালের চুপাকাব্রার আক্রমণঃ
১৯৯২-১৯৯৫ সালের মধ্যে ‘পুয়ের্তো রিকো’ দ্বীপে একগুচ্ছ বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে। ১৯৯৫ সালের মার্চে একটা চুপাকাব্রার আক্রমণে ৮টা ভেড়া মৃত পাওয়া যায়; এদের দেহ অক্ষত থাকলেও ছিদ্রপথে সব রক্ত বের হয়ে গিয়েছিলো।
৫ মাস পর এমনই আরেকটা ঘটনা ঘটে, তবে আরো রক্তপাতের সাথে। ১৯৯৫ সালের আগস্ট মাসে, পুয়ের্তো রিকোর কাছাকাছি এলাকায় কোনো এক অচেনা শিকারির হাতে খামারের প্রায় ১৫০টি পশু মারা যায়। মার্চের ভেড়া দুর্ঘটনার মতোই, এদের দেহও ছিলো রক্তশুন্য। এভাবে ঘটা সবগুলো ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে ও গবেষণা করে আঞ্চলিক পশুবিদেরা মতামত দেন যে, এসব মৃত্যুর কারণ হলো গলার ডান দিকে ধারালো ছিদ্র, যা দিয়ে রক্ত শুষে নেয়া হয়েছিলো। ক্ষতগুলো ছিলো ৩-৪ ইঞ্চি লম্বা ড্রিংকিং স্ট্রয়ের মতো। ১৯৯৬ সালের মার্চে স্প্যানিশ টিভি শো ‘ক্রিস্টিনা’তে চুপাকাব্রার গল্প প্রচারিত হয়, যা একে পুরো আমেরিকায় রাতারাতি বিখ্যাত করে তোলে।

চুপাকাব্রা

২০০৪ সালের জুলাই আর অক্টোবর মাসে টেক্সাসের সান আন্টোনিওতে লোমহীন কুকুরের মতো এক প্রাণীর আক্রমণের খবর পাওয়া যায়। প্রথমে একে চুপাকাব্রার কাজ বলা হলেও পরবর্তীতে দেখা যায়, এটি আসলে আমেরিকান এক প্রকার নেকড়ের কাজ। এসময় এক খামারি তার খামারে ফাঁদ পাতলে তাতে কুকুর, ইঁদুর আর ক্যাঙ্গারুর সংমিশ্রণে এক প্রাণী ধরা পড়ে। এতে করে লোকজনের এ প্রাণীর ব্যাপারে আগ্রহ বেড়ে যায়।

২০০৬ সালের এপ্রিলে ‘মসলিউজ’ নামের এক পত্রিকা জানায় যে, রাশিয়ায় প্রথমবারের মতো চুপাকব্রা দেখা গেছে। সেখানে একরাতেই ৩০টি টার্কি আর ৩২টি ভেড়া রক্তশুন্য অবস্থায় পাওয়া যায়। মে মাসে এই ঘটনার হোতাকে ধরার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। রাশিয়ান অতি-প্রাকৃত গবেষক ভাদিম চেরনবরভ ও তার দল ইউক্রেন ও এর পাশের এলাকায় খোঁজ চালান, তবে কোনো চুপাকব্রার সন্ধান পাননি। এসময় অন্তত দুটি মানুষের উপর হামলার ঘটনা ঘটে, যাদের উপর কুমিরের মত মাথা আর ক্যাঙ্গারুর মতো দেহের একটি প্রাণী হামলা করেছিল। তবে তারা তেমন গুরুতর আঘাত পাননি। এ বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করে চেরনবরভ দুটি আশ্চর্যজনক বিষয় জানান। যেমন – চুপাকাব্রা যাবার সময় তার পায়ের ছাপের চিহ্ন একটু দূরে গিয়ে শেষ হয়ে যায়। মনে হয় যেন এটি পাখির মতো উড়ে গেছে। আর, চুপাকব্রার এমন প্রবণতা আছে যে, সে শিকারের পর মাঝে মাঝে মৃত দেহগুলোকে রঙ বা আকারের ভিত্তিতে নান্দনিকভাবে সাজায় অথবা পিরামিড তৈরি করে।
২০০৬ সালের আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে মিচেল ও’ডনেল নামে একজন জানান, লেজযুক্ত ইঁদুর বা কাঠবিড়ালির মতো ধারালো নখযুক্ত এক প্রাণীকে রাস্তার পাশে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তবে বিড়ালের নখের আঘাতের কারণে এর পরিচিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে পরে ছবি বিশ্লেষণ করে একে সংকর জাতের কুকুর বলে চিহ্নিত করা হয়।

২০০৭ সালের মে মাসে ‘ন্যাশনাল কলম্বিয়া নিউজ’ জানায় যে, বয়াকা এলাকায় ৩০০টি মৃত ভেড়া পাওয়া গেছে। তবে পরে এই খবরের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

এভাবে ২০০৭ সালের আগস্টে, ২০০৮ সালের ১১ জানুয়ারী আর ৮ আগস্ট, ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে, ২০১০ সালের জুলাই ও ১৮ ডিসেম্বর, ২০১১ সালের ৪ জুলাই, ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ও ২০১৪ সালের এপ্রিলে চুপাকব্রার আক্রমণের খবর পাওয়া গেলেও এর সত্যতা সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সে কারণেই এটি আঞ্চলিক লোককথায় নিজের স্থান গড়ে নিয়েছে।

চুপাকাব্রা নিয়ে সাহিত্য-সংস্কৃতিঃ
চুপাকাব্রা নিয়ে আগেও অনেক মুভি-উপন্যাস-গল্প লেখা হয়েছে, এখনও হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে Chupacabra: Dark Seas , Guns of El Chupacarba অন্যতম। ‘Super Furry Animals’ নামে এক ওয়েলস রক ব্যান্ডের ‘Chupakabras’ নামে একটা গান আছে তাদের ‘Radiator’ অ্যালবামে। এছাড়াও অনেক টিভি সিরিয়ালের অনেক এপিসোডেও একে দেখানো হয়েছে।

চুপাকাব্রা সম্পর্কিত নানা তত্ত্বঃ
চুপাকাব্রার উৎস নিয়ে বেশ কিছু তত্ত্ব প্রচলিত আছে। কিছু অদ্ভুত তত্ত্ব আছে যেগুলো বলে, এটা উন্নত প্রজাতির রক্তপায়ী বাদুর অথবা অ্যালিয়েনদের কোনো পোষা প্রানী (!)। কিছু রিপোর্টার চুপাকাব্রার আক্রমণে হওয়া তিন ছিদ্রবিশিষ্ট ক্ষতের দিকে নির্দেশ করে বলেন, এটা অদ্ভুত এমন এক প্রাণীর জন্য, যেটার সাধারনত দুটো ধারালো দাঁত আছে। আরেকটি তত্ত্ব বলে, চুপাকাব্রা পুয়ের্তো রিকোর ‘এল ইউঙ্ক রেইন ফরেস্টে’ ঘটা কোনো অতি গোপনীয় সরকারি গবেষনার অংশ। কানোনানাস শহর হতে যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র ওই রেইন ফরেস্টের দূরত্ব মাত্র কয়েক মেইল। আর চুপাকাব্রা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে এই এলাকাতেই।
চুপাকাব্রা কি অতি-প্রাকৃত কল্পনা ?

চুপাকব্রার রহস্য সময়ের সাথে কেমন যেন হারিয়ে যাচ্ছে। ‘আসল’ চুপাকাব্রা দেখার ঘটনাগুলো স্পষ্ট হয় সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে (ফিলিপাইন, রাশিয়া) এই অদ্ভুত প্রাণীর দেখা পাওয়ায়। যাই হোক, পুয়ের্তো রিকোতে যা হয়েছিলো তাতে বোঝা যায়, চুপাকাব্রার পুয়ের্তো রিকোর সাথে কোনো না কোনো সম্পর্ক আছেই। পুয়ের্তো রিকো একটা বিস্ময় তৈরি করেছে যার কিছুই এখনও স্পষ্টভাবে জানা যায়নি। এর কতটুকু ছিলো অতিপ্রাকৃত আর কতটুকু ছিলো মানুষের কল্পনা, সেটাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

চুপাকাব্রা সম্পর্কে অস্পষ্টতাঃ
চুপাকাব্রার কোনো নিশ্চিত ছবি এখনও পাওয়া যায়নি। অনেকে চুপাকাব্রার অনেক ছবি তোলার দাবি করলেও এগুলো আমেরিকান নেকড়ে ছাড়া আর কিছুই নয়। এ কারণে, এটার আকার-আকৃতি সম্পূর্ণ অজানা। বাস্তবে এ অদ্ভুত প্রাণীটা দেখতে কেমন (যদি এর বাস্তব অস্তিত্ত্ব থেকে থাকে আর কি), সেটা এখনো জানা বাকি। বেশ কয়েকজন একে চাক্ষুষ দেখলেও তাদের বর্ণণায় ভিন্নতা আছে। অনেকেই একে দু’পায়ে দাঁড়াতে দেখেছেন বলে বর্ণণা করেছেন। দুর্ঘটনা ঘটার পর প্রকাশিত পত্রিকার রিপোর্টে একে “এক প্রকার গরিলা জাতীয় প্রাণী’ , “অদ্ভুত প্রকারের বানর যা দু’পায়ে দৌড়াতে পারে, ছাগল হত্যা করে ও তার দেহের রক্ত পান করে’ এমন কথা বলা হয়েছে। এক সাক্ষীর সাক্ষাৎকারে শোনা যায়, “সেখানে দুটো বড় প্রাণী ছিল, মানুষের মতো বড়। আমি তাদেরকে দূর থেকে দেখেছি। তারা বড় গরিলার মতো দেখতে, ঠিক বড় বেবুনের মতো। কিন্তু আমি তাদের মুখ দেখিনি’।

যেহেতু চুপাকাব্রার নানা গল্প প্রচলিত থাকলেও তার কোন বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তাই এটি এখন অনেকটা রূপকথারই অংশ।

সূত্রঃ
১। https://en.wikipedia.org/wiki/Chupacabra
২। http://www.amnh.org/exhibitions/mythic-creatures/land-creatures-of-the-earth/modern-myths/
৩। http://www.ancient-origins.net/myths-legends-americas/legend-fearsome-chupacabra-puerto-rico-003706

লিখেছেনঃ আজমাইন তৌসিক ওয়াসি

চুপাকাব্রা (Chupacabra): লাতিন আমেরিকার বিস্ময় পৌরাণিক প্রাণীTankiBazzমিথলজিচুপাকাব্রা
চুপাকাব্রার নাম শোনেননি, এমন পুরাণ প্রেমী মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল! এর কাহিনী গ্রিক, রোমান বা আক্কাদিয় পুরাণের মত হাজার বছরের পুরনো নয়। মাত্র ২২ বছর ধরে এই চুপাকাব্রা নিয়ে মাতামাতি হচ্ছে। তাই একে বলা হয় 'আধুনিক পৌরাণিক প্রাণী' বা আরবান লিজেন্ড। আমেরিকার গ্রামীণ অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে চুপাকাব্রার কাহিনী। তাই...