দাইদালুস শব্দটি প্রাচীন গ্রীক ভাষা থেকে আগত। খুব সম্ভবত শব্দটি শিল্পসম্মতভাবে কাজ করার সাথে সম্পর্কযুক্ত। গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী দাইদালুস ছিলেন একজন দক্ষ কারিগর এবং শিল্পী।

Daedalus

পরিবারঃ
মিথোস-এর নব্য সংকলনগুলোতে দাইদালুসের পিতা মাতার বর্ণনা আছে। বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর পিতার নাম মেশিওন, ইউপ্যালামুস এবং প্যালামাওন হিসেবে বর্ণনা করা আছে। তাঁর মাতার নাম হয় অ্যালসিপ্পে, ইফিনয়, অথবা ফ্রাসমিড ছিলো। ইকারুস এবং ল্যাপিক্স নামে দুই সন্তানের জনক ছিলেন দাইদালুস। পের্ডিক্স নামে তাঁর একটি ভাগনে ছিলো। আগের পুরাণগুলোতে তাঁর জন্মস্থান হিসেবে ক্রিটকে চিহ্নিত করা হলেও এথেনিয়ানরা তাঁর জন্মস্থান পরিবর্তন করে তাঁকে এথেন্সবাসী বানিয়ে ফেলে। এথেনিয়ানদের মতে, তিনি ছিলেন প্রাচীন রাজা ইরেকথিয়াসের নাতি, যিনি কিনা নিজের ভাগনেকে খুন করেছেন।

Daedalus

গোলকধাঁধাঃ
দাইদালুসের কথা প্রথম লেখেন হোমার। হোমারের ভাষায় “দাইদালা (daidala)” মানে কারুকাজ খচিত বস্তু যা সাধারণত ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। দাইদালুস বিখ্যাত ছিলেন ক্রিটের রাজা মিনোসের কন্যা আরিয়াড্‌নের জন্য নির্মিত বিশাল চওড়া এক প্রমোদ উদ্যানের জন্য। তবে তিনি বেশি বিখ্যাত ক্রিট দ্বীপে অবস্থিত গোলকধাঁধাঁর স্থপতি হিসেবে। এই গোলকধাঁধাঁতেই ছিলো মিনোটরের (অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক ষাঁড়) বাস।

হোমারের গোলকধাঁধাঁ ছিলো একটা মাত্র পথ বিশিষ্ট জায়গা, যে পথ দিয়ে গোলকের কেন্দ্রে যাওয়া যেত এবং কেন্দ্র থেকে বাইরে বের হওয়া যেত। ওভিদ তাঁর মেটামরফসিস গ্রন্থে বলেন, গোলকধাঁধাঁটা থেকে বের হওয়া এতটাই কঠিন ছিলো যে, সেটা বানাবার পর স্বয়ং দাইদালুসকেই বের হতে বেগ পেতে হয়েছিলো। কিন্তু পরবর্তী লেখকেরা হোমারের বর্ণনা উপেক্ষা করে গোলকধাঁধাঁটিকে জটিল পথ নয় বরং একটি অট্টালিকা হিসেবে বর্ণনা করেন। অট্টালিকার ভেতরে তারা জুড়ে দেন অসংখ্য গলি, তস্য গলি যেগুলো একটা আরেকটার সাথে যুক্ত। ফলে পুরো ব্যাপারটা এমন মনে হয়, যেন পথের কোনো শেষ বা শুরু নেই।

হোমারের গোলকধাঁধাঁ তৈরি করা হয় রাজা মিনোসের স্ত্রী প্যাসিফির পুত্র মিনোটরের জন্য, যাকে মিনোস এখানে বন্দী করে রাখতেন। গল্পটা এরকম – মিনোস সিংহাসনে বসার জন্য নিজের ভাইয়ের সাথে লড়েন এবং লড়াইয়ে জেতার জন্য সমুদ্রের দেবতা পোসাইডনের কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। পোসাইডন মিনোসকে একটা সাদা ষাঁড় পাঠিয়ে বলেন, এটাকে উৎসর্গের মাধ্যমেই মিনোস পোসাইডনের আশীর্বাদ পাবেন। কিন্তু ষাঁড়টির সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ মিনোস ষাঁড়টিকে বধ না করে নিজের জন্য রেখে দেন। পোসাইডন ব্যাপারটা মোটেই পছন্দ করেননি। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তিনি আফ্রোদিতির সাহায্য নিয়ে রাণী প্যাসিফির মনে ষাঁড়টির প্রতি গভীর ভালোবাসার সৃষ্টি করেন। দাইদালুস তখন রাণীর জন্য একটি ফাঁপা কাঠের গরু তৈরি করেন। এর মধ্যে প্রবেশ করে রাণী ষাঁড়টির সাথে মিলিত হন।

Daedalus

ষাঁড়টির ঔরসে রাণীর গর্ভে আসে মিনোটর। এই দানবকে আটকে রাখার জন্য গোলকধাঁধাঁ তৈরির আদেশ দেন মিনোস। এই দানবের খাদ্য হিসেবে প্রতি নয় বছর পর পর সাত জন যুবতী মেয়ে এবং সাত জন যুবক ছেলেকে পাঠানো হতো। বার তিনেক এরকম হবার পর গ্রিক বীর থিসিউস মিনোটরকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। এক যুবকের পরিবর্তে তিনি নিজেই যান মিনোটরের খোরাক হিসেবে। গোলকধাঁধাঁয় ঢুকার আগে তাঁর কাছ থেকে সমস্ত অস্ত্র কেড়ে নেয়া হয়। তবে রাজকন্যা

আরিয়াড্‌নে থিসিউসের প্রতি ভালোবাসা অনুভব করেন। থিসিউস রাজকন্যার কাছে প্রতিজ্ঞা করেন যে, ফেরত এসেই তিনি রাজকন্যার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবেন। এরপর রাজকন্যা এবং দাইদালুসের উপদেশ অনুসারে থিসিউস একটা লম্বা সুতার একপ্রান্ত নিজের সাথে বেঁধে ফেলেন এবং অপর অংশ গোলকধাঁধাঁর দরজার সাথে বাঁধেন। অত:পর দাইদালুসের উপদেশ স্মরণ করে থিসিউস গেলেন গোলকধাঁধাঁর মাঝখানে, মিনোটরকে হত্যা করার জন্যে। থিসিউসের উপস্থিতি টের পেয়ে জেগে উঠলেন মিনোটর। এরপর এক ভয়াবহ যুদ্ধের মাধ্যমে মিনোটরকে হত্যা করতে সমর্থ হন থিসিউস।

কাহিনীটির উপদেশ হিসেবে বলা হয়, সবসময় একজন মানুষের উচিত নিজের কাজের দীর্ঘমেয়াদী ফল চিন্তা করে কাজ করা। উদাহরণস্বরূপ, দাইদালুস গোলকধাঁধটিকে না বানালে থিসিউস আরো সহজে মিনোটরকে হত্যা করতে পারতেন।

ইকারুস এবং দাইদালুসঃ
সম্ভবত দাইদালুসের সবচেয়ে জনপ্রিয় সাহিত্যিক উপস্থিতি হয়েছিলো রোমান কবি ওভিদের “মেটামরফসিস” কাব্যে। এই কাব্য অনুযায়ী, দাইদালুস এবং তাঁর যোগ্য উত্তরসূরী ইকারুসকে ক্রিটের একটা দূর্গে বন্দী করে রাখা হয় যাতে গোলকধাঁধাঁর রহস্য জনসমক্ষে প্রচারিত না হয়। রাজা মিনোস স্থল এবং জলপথকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন। প্রতিটি স্থল ও জলপথগামী যানবাহনের প্রতি ছিলো তাঁর কঠোর নজরদারী। তাই এই দুই পথে পালানো দাইদালুসের পক্ষে ছিলো প্রায় অসম্ভব। তাই দাইদালুস আকাশপথে পালনোর জন্য পাখা তৈরি করতে শুরু করলেন। এ কাজে পুত্র ইকার‌্যসের কাছ থেকে তিনি অনেক সাহায্য পেতেন। তাঁরা একটি ক্রমবর্ধমান তল তৈরির জন্য পাখির পালককে ছোট থেকে বড় আকারে সাজালেন এবং পুরো কাঠামোটাকে ধরে রাখার জন্য মূল উপাদান হিসেবে মোম ব্যবহার করলেন। পালানোর উদ্দেশ্যে দাইদালুস নিজের এবং পুত্র ইকারুসের জন্য মোট চারটি পাখা তৈরি করেন। দুইটি পাখা তিনি নিজের জন্য রাখেন এবং বাকী দুটি দেন ইকারুসকে। নিজের বানানো পাখা দিয়ে তিনি ভেসে থাকতে সমর্থ হলেন এবং নিজের ছেলেকেও শেখালেন কীভাবে উড়তে হবে। ইকারুসকে দাইদালুস সাবধান করেন যে, সূর্যের কাছাকাছি পৌঁছে গেলে মোম গলে বিপদ হতে পারে।

Daedalus

অত:পর একদিন পরিকল্পনা মাফিক দাইদালুস এবং ইকারুস উড়ার প্রস্তুতি নিলেন। দাইদালুস ঊড়তে সমর্থ হলেও বাবার উপদেশ অমান্য করে উত্তেজিত ইকারুস উড়তে উড়তে সূর্যের এত কাছে পৌঁছে গেলেন যে, তাঁর পাখার মোম গলে গেলো এবং তিনি সাগরে পরে গিয়ে মারা গেলেন। তাঁর নামানুসারে কাছাকাছি একটা দ্বীপের নাম দেয়া হয় ইকারিয়া। এই গল্পকে কেন্দ্র করে দাইদালুসকে বিশুদ্ধ প্রকৌশলের এবং ইকারুসকে বিদ্রোহী শিল্পের প্রতীক হিসেবে মান্য করা হয়।

সিসিলিঃ
ইকারুস মারা গেলেও দাইদালুস তার পাখার মাধ্যমে নিরাপদে উড়তে সক্ষম হন। তিনি পশ্চিমে যাত্রা করে সিসিলিতে পৌঁছান। পথে কামিকোসের রাজা কোকোলাস তাকে বেশ সাহায্য করেন। সে গল্পে একটু পরেই আসছি।

সিসিলিতে এসে দাইদালুস দেবতা অ্যাপোলোর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। পুত্রশোকে আক্রান্ত প্রকৌশলী পুত্রের আত্মার সদগতির উদ্দেশ্যে নিজের পাখা দুটিকে মন্দিরের দেবতার কাছে উৎসর্গ করেন। অবশ্য ভার্জিলের এক গল্পে দেখা যায় ভিন্ন কাহিনী। ভার্জিল বলেন, দাইদালুস সিসিলিতে নয় বরং কুমি (Cumae) নামক জায়গায় অ্যাপোলোর মন্দির স্থাপন করেন।

এদিকে দাইদালুস পালিয়েছেন বুঝতে পেরে মিনোস বেরিয়ে পড়েন তাঁর খোঁজে। শহরে শহরে গিয়ে তিনি সেই শহরের বাসিন্দাদের একটা ধাঁধাঁ ধরেন। ধাঁধাঁটি এমন – একটি সর্পিলাকার ঝিনুকের এক পাশ দিয়ে একটা সুতা ঢুকিয়ে অপর পাশ দিয়ে বের করতে হবে। মিনোস জানতেন এই ধাঁধাঁর সমাধান কেবলমাত্র দাইদালুসের পক্ষেই করা সম্ভব।

কামিকোসে পৌঁছে মিনোস ধাঁধাঁটি উপস্থাপন করলে উৎসুক রাজা কোকালাস দাইদালুসকে ডেকে পাঠিয়ে ধাঁধাঁটির সমাধান করতে অনুরোধ করেন। তখন দাইদালুস একটা পিঁপড়ার গায়ে সুতা পরিয়ে একদিক দিয়ে ঝিনুকে ঢুকিয়ে মধুর লোভ দেখিয়ে অন্য দিক দিয়ে বের করে নিয়ে আসেন। মিনোস বুঝতে পারেন রাজার মন্ত্রী পরিষদে দাইদালুস লুকিয়ে আছেন। সাথে সাথে তিনি দাইদালুসকে ফিরিয়ে দিতে কোকোলাসের কাছে দাবী জানান। কোকোলাস দাইদালুসকে ফিরিয়ে দিতে রাজি হন। কিন্তু ক্লান্ত মিনোসকে স্নান করতে অনুরোধ জানান কোকোলাস। মিনোস স্নানঘরে গেলে গরম পানি ঢেলে মিনোসকে হত্যা করেন কোকোলাসকন্যা (মতান্তরে দাইদালুস)।

দাইদালুস এবং পের্ডিক্সঃ
নিজ প্রতিভায় গর্বিত দাইদালুস কোনো প্রতিদ্বন্দীকে সহ্য করতে পারতেন না। তাঁর বোন নিজের ছেলে পের্ডিক্সকে দাইদালুসের কাছে পাঠান কারুকার্য ও স্থাপত্যকর্ম শেখার জন্য। পের্ডিক্স ছিলেন একজন বিজ্ঞ শিল্পী এবং প্রতিভাধর প্রকৌশলী। সাগরের পাড়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা মাছের মেরুদণ্ড দিয়ে একটা লোহাকে ঘষতে ঘষতে তিনি করাতের ধারণা আবিষ্কার করেন। আরো বহু ক্ষেত্রে পের্ডিক্স নিজের প্রতিভার পরিচয় দেন। ঈর্ষান্বিত দাইদালুস তাঁকে পাহাড় থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যা করেন। এতে দেবী এথেনা দাইদালুসের উপর ক্ষিপ্ত হন এবং পের্ডিক্সকে একটি তিতির পাখিতে রুপান্তরিত করেন। দাইদালুসের শরীরে একটি তিতির পাখির মতো ক্ষত তৈরি করেন। অপরাধবোধে ভুগতে থাকা দাইদালুস এথেন্স ত্যাগ করেন।

উদ্ভাবনঃ
দাইদালুসের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ছিলো অকল্পনীয়। বলা হয়ে থাকে তিনি ছুতোরের কাজ আবিষ্কার করেন। তিনি মিনোসের নৌবাহিনীর জন্য মাস্তুল ও পালযুক্ত নৌকা তৈরি করেন। তাঁর তৈরি ভাষ্কর্য্যগুলো দেখতে এতটাই জীবন্ত মনে হতো যে, দেখে মনে হতো সেগুলো বুঝি এখুনি নড়ে উঠবে। দক্ষ গ্রীক স্থাপত্যশিল্পীদেরকে নিজের নাম দিয়ে সম্মান জানাতেন দাইদালুস। প্লেটেয়াতে এক ধরণের উৎসব আছে যেখানে একটা অস্থায়ী পাথুরে বেদী তৈরি করা হয় এবং বধূ সাজে ওক গাছের তৈরি একটা প্রতিকৃতিকে এক ধরণের যানবাহনে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। উৎসবটি দাইদালুসের অসামান্য স্থাপত্যদক্ষতার প্রতি সম্মান দেখিয়ে পালন করা হয়।

তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া, গ্রীক মিথোলজি ডট কম।

লিখেছেন: সুমিত রায়

দাইদালুসঃ গ্রিক পুরাণে বর্ণিত একজন দক্ষ কারিগর এবং শিল্পীTankiBazzমিথলজিDaedalus
দাইদালুস শব্দটি প্রাচীন গ্রীক ভাষা থেকে আগত। খুব সম্ভবত শব্দটি শিল্পসম্মতভাবে কাজ করার সাথে সম্পর্কযুক্ত। গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী দাইদালুস ছিলেন একজন দক্ষ কারিগর এবং শিল্পী। পরিবারঃ মিথোস-এর নব্য সংকলনগুলোতে দাইদালুসের পিতা মাতার বর্ণনা আছে। বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর পিতার নাম মেশিওন, ইউপ্যালামুস এবং প্যালামাওন হিসেবে বর্ণনা করা আছে। তাঁর মাতার নাম হয়...