ডিয়ারড্রে আইরিশ পুরাণের অন্যতম প্রধান ও সবচেয়ে পরিচিত চরিত্র। যীশুখ্রিস্ট পৃথিবীতে আসার আগে আয়ারল্যান্ডে প্রচলিত কাহিনীগুলোর মধ্যে ডিয়ারড্রের কাহিনীই বেশি শোনা যায়। তার করুণ কাহিনীর জন্য তাকে লোকে “Deirdre of the Sorrows” বলে ডাকে।

a

ডিয়ারড্রে ছিল “ফেডলিমিড ম্যাক’ডিল’-এর মেয়ে। এক পূর্ণিমার রাতে ফেডলিমিডের ঘরে ডিয়ারড্রের জন্ম হয়। কিন্তু সে বড় হয় তার পরিবারের বাইরে এক গহীন বনে। ডিয়ারড্রের জন্মের পরপরই বাবা ফেডলিমিড তাকে আলস্টারের রাজা কনকোবার ম্যাক নেসা-এর দরবারের প্রধান পুরোহিতর কাছে নিয়ে যান ও তার সদ্য জন্মানো মেয়ের ভবিষ্যৎ জানতে চান। গণনা করে পুরোহিতপ্রধান ‘কাথবাড’ ভবিষ্যতবাণী করেন যে, ফেডলিমিডের মেয়ে বড় হয়ে বেশ সুন্দরীই হবে, কিন্তু তার এ সৌন্দর্যের জন্য রাজাকে অনেক যুদ্ধ করতে হবে, অনেক রক্ত দিতে হবে। ডিয়ারড্রের জন্য আলস্টারের তিন সর্বশ্রেষ্ঠ যোদ্ধাকে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হবে!
এ ভবিষ্যতবাণী শুনে অনেকেই ফেডলিমিডকে বলল তার মেয়েকে মেরে ফেলতে । কিন্তু রাজা কনকোবার কনকোবারমেয়েটির ভবিষ্যৎ রূপের কথা শুনে ঘোষণা দিলেন যে, ডিয়ারড্রেকে এখান থেকে দূরেই বড় করা হবে। ও প্রাপ্তবয়স্ক হলে কনকোবার ওকে বিয়ে করবেন।

রাজা তার লোকদের মেয়েটির জন্য একজন ভালো অভিভাবক খোঁজার নির্দেশ দিলেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর ডিয়ারড্রেকে লেভারচাম নামে এক জ্ঞানী বৃদ্ধার কাছে পাঠানো হলো, যিনি ছিলেন একজন কবি আর বাস করতেন গভীর জঙ্গলে। বৃদ্ধার উপর দায়িত্ব পড়লো মেয়েটির ভালো যত্ন নেওয়ার ও তাকে সব ধরণের শিক্ষায় শিক্ষিত করার।

পুরোহিতের করা বাণী অনুযায়ী ডিয়ারড্রে বড় হয়ে বেশ সুন্দরী হলো। এক রাত্রে লেভারচাম দেখলো যে, ডিয়ারড্রে ঘুমের মধ্যেই হাঁটছে! এটা দেখে সে সারারাত নজর রাখলো তার উপর। সকালে উঠার পর ডিয়ারড্রেই তাকে বললো যে, এক যোদ্ধাকে সে স্বপ্নে দেখেছে।যোদ্ধাটা লম্বা, সুদর্শন, চুলের রঙ কুচকুচে কালো। তার চামড়া বরফের মতো সাদা এবং সে যুদ্ধে নির্ভীক।’ বর্ণনা শুনে লেভারচাম তাকে চিনতে পারলো। ‘নইসে’, উইস্নিচ-এর ছেলে, উস্টারেরই এক নামী যোদ্ধা, গায়ক ও শিকারী। কিন্তু তার মন কেঁপে উঠল। ডিয়ারড্রেকে সাবধান করে দিয়ে সে বলল, “তুমি যাকে স্বপ্নে দেখছ, সে উস্টারেরই এক নামী যোদ্ধা। তার নাম ‘নইসে’। কিন্তু তোমার স্বপ্নের কথা কোনো মানুষের কাছে বোলো না। কারণ খুব শিগগিরই তোমার সাথে রাজা কনকোবারের বিয়ে হতে যাচ্ছে।”

কিন্তু ডিয়ারড্রে লেভারচামের কাছে করজোড় করলো তাকে ‘নইসে’-এর কাছে পাঠাতে, যেন সে তার স্বপ্নের পুরুষের সাথে একবার হলেও দেখা করতে পারে। লেভারচাম প্রথমে না করেছিল, কিন্তু পরে ডিয়ারড্রের মন খারাপ দেখে যেতে অনুমতি দিল। অতঃপর ডিয়ারড্রে ও নইসে দেখা করলো, আর প্রথম দেখাতেই পরস্পরকে ভালোবেসে ফেললো। ডিয়ারড্রে জানালো যে, সে কনকোবারকনকোবারকে বিয়ে করতে পারবে না। তারপর তাদের আসন্ন বিপদ বুঝতে পেরে ডিয়ারড্রে ও নইসে দেশ থেকে পালানোর সিদ্ধান্ত নিল। নইসের দুই ভাই ‘আরডান’ ও ‘অ্যানেল’ও তাদের সঙ্গ দিলো। তারা সমগ্র আয়ারল্যান্ডে আশ্রয়ের জন্য ঘুরলো, কিন্তু রাজা কনকোবারের ভয়ে কেউই তাদের আশ্রয় দিলো না। উপায় না পেয়ে তারা চারজন সমুদ্র পাড়ি দিলো ও স্কটল্যান্ডের কাছে “লোচ এটিভ” নামক একটা দ্বীপে আশ্রয় নিলো।

a

চারজন পলাতকের দল ওই দ্বীপে সুখে-শান্তিতে সময় কাটাতে লাগলো। তারা শিকার করতো, মাছ ধরতো। এভাবে কেটে গেলো পাঁচ পাঁচটি বছর। অবশ্য কোনো কোনো বর্ণনায়, ডিয়ারড্রে ও নইসের এক ছেলে “গায়ার” ও এক মেয়ে ‘এবগ্রিন’-এর কথাও বলা হয়েছে।
কিন্তু এত বছরেও রাজা কনকোবারের রাগ কমলো না। তিনি চারদিকে লোক পাঠিয়ে তাদের ঠিকানা খুঁজে বের করলেন এবং তাদের কাছে ‘ফার্গাস ম্যাক রোচ’ নামে এক দূতকে পাঠালেন। সেই সাথে নিজেও এক পরিকল্পনা করলেন তাদেরকে শাস্তি দেবার।

একদিন বিকালে ডিয়ারড্রে ও নইসের কাছে রাজার ওই বার্তাবাহক পৌঁছল। সে জানাল যে, স্বয়ং রাজা তাকে পাঠিয়েছেন এবং তিনি তাদেরকে মাফ করে দিয়েছেন, বলেছেন দেশে ফিরে যেতে। ফার্গাস নিজেই তাদের যাওার পথের সুরক্ষা দিবে বলল।
ডিয়ারড্রে তার কথা বিশ্বাস করলো না এবং যেভাবে আছে সেভাবেই থাকতে চাইল। কিন্তু নইসে বার্তাবাহকের কথা বিশ্বাস করলো আর সাথে সাথেই দেশে ফেরার জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগলো। তারা দ্রুতই সব গুছিয়ে নিয়ে নৌকায় উঠলো। ডিয়ারড্রের ভবিষ্যৎ অনুমানের জ্ঞান ছিলো, তাই সে নইসের কাছে করজোড় করলো না যেতে। কিন্তু, নইসে তাকে সান্তনা দিলো যে, সবকিছু ঠিকঠাক-ই হবে।

তারা তীরে পৌছার পর ফার্গাস তাদের নিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু রাজা কনকোবার তাকে রাস্তা থেকে সরানোর জন্য নিজে এক পত্র পাঠালেন ফার্গাসকে একটা ভোজে অংশ নেবার নির্দেশ দিয়ে। উপায় না পেয়ে ফার্গাস তার ছেলেকে দিয়ে তাদেরকে রাজপ্রাসাদে পাঠালো ও নিজে ভোজসভায় গেলো।

তারা রাজপ্রাসাদে পৌঁছালে রাজা জানতে চাইল যে, ডিয়ারড্রে আগের মতোই সুন্দরী আছে কিনা। তাই সে প্রথমে লেভারচামকে পাঠালো। লেভারচাম ভাবলো যে, ডিয়ারড্রে আগের মতো সুন্দরী নেই শুনলে হয়তো রাজা ওর প্রতি আগ্রহ হারাবে ও তাদের ছেড়ে দিবে। তাই সে রাজার কাছে গিয়ে মিথ্যে বলল যে, সে তার আগের মতো নেই, সে অনেক কুৎসিত হয়ে গেছে। তবে রাজা কনকোবারও কম না, সে আরেক গুপ্তচর পাঠালো। ২য় গুপ্তচর এসে বললো যে, ডিয়ারড্রে এখন আগের চেয়েও সুন্দর হয়ে গেছে। তার কথা শুনে রাজা তার ‘রেড ব্রাঞ্চ নাইটস’-কে নির্দেশ দিলো তাদের ধরতে।

নইসে ও তার ভাইয়েরা বীরত্বের সাথেই যুদ্ধ করলো, কিন্তু তারা ছিল সংখ্যায় অনেক কম। তাই সেনারা তাদের সহজেই ধরে ফেললো ও রাজার সামনে নিয়ে আসলো। আনা হলে রাজা সভাসদকে জিজ্ঞেস করলো, “কে এই বিশ্বাসঘাতকদের হত্যা করবে?”। তবে ‘রেড ব্রাঞ্চ নাইটস’-এর নীতি হলো, কেউই তাদের অন্য এক যোদ্ধাকে মারে না, সে যতই অপরাধ করুক না কেন। তাই, কেউই সামনে এগুলো না। কিন্তু হঠাৎ ‘এগান’ নামে এক অজানা যোদ্ধা এগিয়ে এলো এবং ‘নইসে’ ও তার ভাইদের গলা এক কোপে কেটে ফেললো! শোকে-দুঃখে ডিয়ারড্রের বুক ভেঙ্গে এলো। সেও তার প্রেমিক নইসের সাথে মৃত্যুপথযাত্রী হলো।
তাদের মৃত্যুর কথা শুনে ফার্গাস তার দলবল নিয়ে পৌঁছল। তার দেয়া প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ হওয়ায় সে রাগে দেশত্যাগ করলো।
এ ঘটনার পরপর ডিয়ারড্রের বাবাও উস্টার ত্যাগ করলো এনং পাশের রাজ্যের রানী মায়েভের সাথে যোগ দিলো। তারা মিলে উস্টার ও ‘রেড ব্রাঞ্চ নাইটস’-এর বিরুদ্ধে অনেক যুদ্ধে অংশ নেয় ও উস্টারের অনেক ক্ষতি করে। আর, এভাবেই গণকদের কথা সত্য প্রমাণিত হয়।

বিকল্প কাহিনী

আরেকটি বর্ণনায় আছে যে, ডিয়ারড্রে ঐদিন মরেনি। নইসের মৃত্যুর পর রাজা কনকোবার তাকে বিয়ে করে। কিন্তু, ডিয়ারড্রের ক্রমাগত ঠান্ডা ব্যবহারে রেগে রাজা কনকোবার একদিন তাকে জিজ্ঞেস করে যে, কনরের পর সে কাকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে? ডিয়ারড্রে জবাব দেয়, ‘এগান’, যে তার স্বামীকে হত্যা করেছিল। শুনে রাজা বলে, “ঠিক আছে, তোমাকে আমি এখন তার কাছেই পাঠাবো!” যখন তাকে এগানের কাছে নেয়া হচ্ছিল, তখন রাজা তাকে বিদ্রুপ করে যে, সেখানে পৌঁছালে তাকে দুই ভেড়ার মাঝে এক ভেড়ির মতো দেখাবে। তার এ নোংরা ও বিকৃত মানসিকতার কথা শুনে ডিয়ারড্রে চলমান ঘোড়ার গাড়ি থেকে লাফ দেয় ও রাস্তায় থাকা এক পাথরখন্ডে পড়ে তার মাথা গুড়িয়ে যায়। এভাবে তার দুঃখের কাহিনীর সমাপ্তি ঘটে।

a

ডিয়ারড্রেকে নিয়ে সাহিত্য-সংস্কৃতি

ডিয়ারড্রের কাহিনী নিয়ে অনেক নাটক আছে। যেমন, ‘জর্জ উইলিয়াম রাসেলে’র ‘ডিয়ারড্রে” (১৯০২), ‘উইলিয়াম বাটলার ইয়েটে’র ‘ডিয়ারড্রে’ (১৯০৭), ‘জে. এম. সিঞ্জে’র ‘ডিয়ারড্রে অব দ্য সরো’ (১৯১০), ‘জন কালটারে’র ” Deirdre of the Sorrows: An Ancient and Noble Tale Retold by John Coulter for Music by Healey Willian” (১৯৪৪) এবং ‘ভিনসেন্ট ঊডে’র “A Cry From Heaven” (২০০৫)। কিছু উপন্যাসও আছে ডিয়ারড্রেকে নিয়ে। যেমনঃ ‘জেমস স্টিফেনে’র ‘ডিয়ারড্রে’ (১৯২৩), ‘এলোনা মাল্ট্রে’র ‘The Celts’ (১৯৮৮) এবং ‘জুলস ওয়াটসনে’র ‘The Swan Maiden’। আইরিশ নেভাল সার্ভিসের একটা জাহাজের নাম রাখা হয় “LE Deirdre”, যেটা ১৯৭২ থেকে ২০০১ পর্যন্ত সেবা দিয়েছিল।

তথ্যসূত্র
১। http://­allaboutdeirdre.c­om/­deirdre-legend
২। https://­en.wikipedia.org/­wiki/Deirdre

মিথলজি লিখেছেনঃ আজমাইন তৌসিক ওয়াসি

ডিয়ারড্রে অফ দ্য সরোঃ আইরিশ পুরাণের সবচেয়ে প্রধান ও পরিচিত চরিত্রTankiBazzমিথলজিDeirdre,Irish mythological heroine
ডিয়ারড্রে আইরিশ পুরাণের অন্যতম প্রধান ও সবচেয়ে পরিচিত চরিত্র। যীশুখ্রিস্ট পৃথিবীতে আসার আগে আয়ারল্যান্ডে প্রচলিত কাহিনীগুলোর মধ্যে ডিয়ারড্রের কাহিনীই বেশি শোনা যায়। তার করুণ কাহিনীর জন্য তাকে লোকে 'Deirdre of the Sorrows' বলে ডাকে। ডিয়ারড্রে ছিল 'ফেডলিমিড ম্যাক'ডিল'-এর মেয়ে। এক পূর্ণিমার রাতে ফেডলিমিডের ঘরে ডিয়ারড্রের জন্ম হয়। কিন্তু সে বড়...