সোনার প্রতি লোভ মানুষের অতি পুরনো। প্রায় সব যুগে, সব জাতি- সম্প্রদায়ের মধ্যেই সোনার প্রতি আলাদা লোভ বা টান দেখা যায়। পরিমাণ যাই হোক, সোনা সংগ্রহের জন্য মানুষ সবসময়ই সচেষ্ট থেকেছে ও তার সংগ্রহের পরিমাণ প্রতিনিয়ত বাড়ানোর সব চেষ্টাও তারা করেছে।

el dorado

এল ডোরাডোঃ সোনার শহরে আপনাকে স্বাগতম!

এল ডোরাডো:
মানবযুগে শত শত বছর জুড়ে থাকা সোনার প্রতি এই আগ্রহ জন্ম দিয়েছে অনেক রূপকথা বা লৌকিক উপাখ্যানের। তন্মধ্যে একটি হলো সোনার শহর। ১৬শ’ ও ১৭শ’ শতাব্দীতে ইউরোপিয়ানরা বিশ্বাস করতো যে, এই পৃথিবীর কোথাও না কোথাও একটা জায়গা আছে, যেখানে অঢেল সম্পত্তি আছে, জায়গাটার নাম ‘এল ডোরাডো’। এর মালিক হবার জন্যে মানুষ অতীতে অনেক অভিযান চালিয়েছে ও এখনও চালাচ্ছে। সোনার সন্ধানে এসব অভিযান প্রাণ নিয়েছে অগণিত মানুষের, অনেক মানুষকে করেছে নিঃস্ব আর অনেককে খনিতে নিজের স্থায়ী জায়গা করে দিয়েছে। তবুও এই জায়গার সন্ধান এখনও কেউ পায়নি।

নামকরণ ও অর্থ:
‘এল ডোরাডো’ শব্দটি স্প্যানিশ, যার অর্থ ‘স্বর্ণের তৈরি’ । মূলত, স্প্যানিশরা ‘এল হমব্রে ডোরাডো’ (সোনায় খচিত মানুষ) বা ‘এল রেই ডোরাডো’ (সোনায় খচিত রাজা) এই শব্দগুলো ব্যবহার করে একটা প্রাচীন উপজাতি, কলম্বিয়ার ‘মুইসকা’ জাতির প্রধান ‘জিপা’-কে নির্দেশ করতে। লিজেন্ড অনুসারে, ‘মুইসকা’-রা তাদের নতুন নির্বাচিত রাজাকে সোনা ও অন্যান্য সজ্জায় সজ্জিত করে এক ধরণের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মতো পালন করতো ।
‘এল ডোরাডো’-কে নিয়ে লোককথা সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়; এটা শুরু হয় একটা সোনায় মোড়ানো মানুষ দিয়ে, তারপর সোনার শহর , সোনার রাজ্য হয়ে পরবর্তীতে এটা সোনার সাম্রাজ্যের লোককথায় পরিণত হয়।

‘মুইসকা’ সম্প্রদায়:
‘মুইসকা’ জাতির মানুষরা নিচু এলাকা থেকে বসবাসের জন্য দুইবার স্থানান্তরিত হয়ে কলম্বিয়ার চুন্দিনামার্কা ও বয়াকা অঞ্চলের উঁচুভূমিতে আসে যথাক্রমে খ্রিষ্টপূর্ব ১২৭০ ও খ্রিষ্টপূর্ব ৮০০-৫০০ সালের মধ্যে। এসময়ে পৃথিবীতে থাকা অন্য জাতির মানুষেরাও উঁচুভূমিতে স্থায়ী হয়েছিল। মুইসকা জাতি অ্যাজটেক , মায়া ও ইনকা সভ্যতার মতোই সমৃদ্ধ ছিলো।

যখন তাদের নতুন নেতা নিযুক্ত হতো, তখন তার দায়িত্ব গ্রহণের আগে অনেক প্রথাগত আচার-অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো। এরকমই একটা প্রথা ছিলো যেটায় নতুন রাজাকে লেক গুয়াতাভিতার কাছে আনা হতো, তারপর তাকে নগ্ন করে সোনার গুড়ায় সারা দেহ ঢাকা হতো। তারপর তাকে ভালোভাবে সজ্জিত একটা ভেলায় অনেক সোনা ও দামী পাথরের সাথে তাকে ও তার সাথীদেরকে রাখা হতো। তারপর ভেলাটাকে লেকের কেন্দ্রে পাঠানো হতো, যেখানে হবু রাজা তার দেহ হতে সোনার গুড়াগুলো ধুয়ে ফেলবেন, যেসময়ে রাজার সাথীরা সোনা ও মূল্যবান পাথরগুলো লেকে নিক্ষেপ করবে। এই প্রথাটাকে মুইসকার দেবতার প্রতি তাদের ত্যাগ বলে বিবেচনা করা হতো। মুইসকায়, ‘এল ডোরাডো’ কোনো শহর ছিলো না, বরং ঐ প্রথার মধ্যমণি রাজাকেই ‘এল ডোরাডো’ (স্বর্ণে খচিত) বলা হতো। যদিও ‘এল ডোরাডো’ একমাত্র রাজাকেই বলা হতো, তবে পরবর্তীতে ‘সোনার হারানো শহর’ বা দ্রুত সম্পদ আহরণ করা যায়, এমন কোন জায়গাকে নির্দেশ করতেও এ শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়।

el dorado

‘এল ডোরাডো’র উৎপত্তি সম্পর্কে একটি বর্ণনা:
এ প্রথার বিষয়ে আসল বর্ণনা পাওয়া যায় ‘জুয়ান রদ্রিগেজ ফ্রেয়েলে’র লেখা ঘটনার বিবরণে। ফ্রেয়েলের মতে, মুইসকার প্রধান ‘জিপা’ লেক গুয়াতাভিতায় একটা প্রথা পালন করেছিলো যেটায় সে ভেলায় করে লেকের মাঝখানে গিয়ে নিজের সোনার গুড়ায় মোড়ানো দেহ পরিষ্কার করছিলো আর তার সাথীরা সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিস লেকে ফেলছিলো।

১৬৩৮ সালে ফ্রেয়েলে গুয়াতাভিতার গভর্নরের বরাত দিয়ে এ প্রথা সম্পর্কে লিখেন,

“এই অনুষ্ঠানটা নতুন শাসকের দায়িত্ব গ্রহণের সময় হয়। দায়িত্ব গ্রহণের আগে তাকে একটা গুহায় কিছু নির্ধারিত সময় অবস্থান করতে হয়, নারীসঙ্গ ছাড়া, যেখানে তার লবণ খাওয়া মানা বা দিনের আলোতে বাইরে যাওয়াও মানা। প্রথম যাত্রায় তাকে গুয়াতাভিতার বিখ্যাত উপহ্রদে যেতে হয়, যেখানে তাকে দৈত্যকে কিছু মূল্যবান জিনিস উপহার দিতে বা ত্যাগ করতে হয় যাকে তারা তাদের দেবতা হিসেবে মানে। এই অনুষ্ঠানে তারা সরু কাণ্ডবিশিষ্ট পাতাহীন একপ্রকার উদ্ভিদের তৈরি ভেলা প্রস্তুত করে, যেটাকে তারা তাদের কাছে থাকা সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসগুলো দিয়ে সাজায়। তারপর তারা ভেলাটিকে চারটি প্রজ্বলিত কয়লা রাখার পাত্রের উপর স্থাপন করে, যে পাত্রগুলোতে তারা নানা রকম সুগন্ধি ও ধুপ-ধুনা জ্বালানো থাকে। উপহ্রদটি এতই বড় ও গভীর ছিলো যে, ভালোভাবে সজ্জিত নারী-পুরুষে পূর্ণ একটা উঁচু ডেকের জাহাজও এতে চলতে পারতো। এভাবে ভেলাটিকে সাজানোর পর ভেলা চলতে শুরু করলে ভেলা থেকে ধুপের ধোয়া বের হতো, সেটা দেখে তারাও সৈকতে ধুপ জ্বালাতো, যাতে ধোয়ায় দিনের আলো ম্লান হয়ে চারদিক অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়।

এ অনুষ্ঠানে তারা হবু রাজার দেহত্বক হতে লোম তুলে নেয় ও তার দেহ স্বর্ণের গুড়াযুক্ত আঠালো মাটি দিয়ে লেপে দেয়। ফলে তার দেহ সোনা দিয়ে পুরোপুরি আবৃত হয়ে পড়ে। তারপর তাকে ভেলায় রেখে আসা হয় এবং তার পায়ে এক স্তূপ সোনা ও দামি পাথর রাখা হয়, যাতে সে তা ঈশ্বরকে উপহার দিতে পারে। ভেলায়, তার সাথে আরো ৪ জন গোত্রীয় প্রধান নেতা যায়; যাদের মুকুট – ব্রেসলেট – গয়না – কানের দুল সবই সোনার তৈরি। তারা সবাইও থাকে নগ্ন, আর সবাই নিজ নিজ উপহার বহন করে। ভেলাটি হ্রদের কেন্দ্রে পৌঁছলে তারা একটা ব্যানার উঠায়, যা পাড়ের সবাইকে নীরব থাকার নির্দেশস্বরূপ।

তারপর মূল নেতাটি সোনার স্তূপ থেকে সব সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী পানিতে ছুড়ে ফেলে দেয়, তার দেখাদেখি বাকি ৪ সাথী নেতাও তাদের সাথে থাকা সব সোনা ও মূল্যবান পাথর পানিতে ছুড়ে ফেলে দেয় । তারপর, তারা ব্যানারটা নামায়, যেটা এতক্ষণ ত্যাগের সময়ে উড়ছিল। তারপর ভেলাটা সৈকতের দিকে রওনা হয়। সৈকতে থাকা মানুষদের মধ্যে চিৎকার-চেঁচামেচি, বাঁশির শব্দের পরিমাণ ক্রমে বাড়তে থাকে। বড় বড় দলে তারা গান গাইতে আর নাচতে থাকে। তারপর, ভেলাটি তীরে পৌঁছালে এ অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে ও রাজাকে রাজা ও শাসক হিসেবে মেনে নেয়া হয়।

এটাই সেই অনুষ্ঠান যেটা পরবর্তীতে বিখ্যাত ‘এল ডোরাডো’ আখ্যানে পরিণত হয়, যা অনেক জীবন ও ভাগ্য নিয়ে খেলা করেছে।”

el dorado

এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে মুইসকাদের ভেলার একটা সোনার রেপ্লিকা, যেটি কলাম্বিয়ার পাসকায় একটা গুহায় পাওয়া যায় ১৮৫৬ সালে, সোনার তৈরি আরো অনেক জিনিসের সাথে। এটাই সেই মুইসকাদের ভেলা, যাতে চড়ে সোনার গুঁড়োয় আবৃত রাজা ‘জিপা’ গুয়াতাভিতা লেকের মাঝে গিয়ে দেবতার উদ্দেশ্যে মহামূল্যবান ধনরত্ন উৎসর্গ করতো।

প্রথাগত অনুষ্ঠান থেকে রূপকথা:
এল ডোরাডোকে একটা পৌরাণিক গল্পের সাথে তুলনা করা হয় যেখানে অনেক দামী পাথর আর সোনা পাওয়া গিয়েছিল। এল ডোরাডো আখ্যানের মূল ভিত্তি অনেক যোজন-বিয়োজনের মধ্য দিয়ে গেছে; মাঝে মাঝে অনেক পুরনো কাহিনীকেও এ রূপকথার হারানো শহরের সাথে যুক্ত করা হয়। ইউরোপীয় অনেক গবেষকও এ কাহিনীর টানে প্রায় দুই শতক খোঁজাখুঁজি করেছেন। এসব পর্যটক-গবেষকের মধ্যে, হুয়ান মার্তিনেজ নামে একজন নিজে ‘মানোয়া’ শহর ভ্রমণের দাবী করেন। মার্টিনেজের জাহাজে থাকা গোলাবারুদের সংরক্ষণাগারে আগুন লাগায়, তাই তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলেও, তার বন্ধুরা তাকে ডিঙি নৌকায় করে পালাতে দেয়। পরবর্তীতে, ঘটনাক্রমে, সে কিছু মানুষের সাথে মিলিত হয়, যারা তাকে ঐ শহরে নিয়ে যায়। তার বর্ণনায়,

“ডিঙি নৌকাটি একটি নদী ধরে নেমে যায়, এবং ঐ সন্ধ্যায়ই তার কিছু গুয়ানিয়ানের সাথে দেখা হয়, যারা আগে কখনও খ্রিষ্টান বা সাদা চামড়ার কাউকে দেখেনি, তারা অবাক হয় ও মার্টিনেজকে ঐ শহরে নিয়ে যায়। তারা তাকে নিয়ে শহরের পর শহর চলতে থাকে, যতক্ষণ না তারা ‘ইঙ্গা’ সম্রাটের আবাসস্থল বিখ্যাত শহর ‘মানোয়া’য় না পৌঁছায়। সম্রাট তাকে দেখার ও সে খ্রিষ্টান – এ তথ্য জানার পর তাকে তার প্রাসাদে থাকার ভালোভাবে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। ইন্ডিয়ানদের নেতৃত্বে তাকে পুরোটা রাস্তা চোখ বেঁধে নেয়া হয়েছিল, ‘মানোয়া’র প্রবেশপথে পৌঁছার আগ পর্যন্ত। আর, রাস্তা ছিলো প্রায় ১৪-১৫ দিনের। সে দুপুরে শহরে প্রবেশ করে, এবং তারপরই তার মুখ খোলা হয়। তারপর, সে সারাদিন শহরের মধ্য দিয়ে রাত পর্যন্ত চলে ও পরেরদিন সারাদিন চলার পর সূর্যাস্তের আগে সে ইঙ্গার প্রাসাদে পৌঁছায়। তারপর, মার্টিনেজ ৭ মাস ঐ শহরে থেকে ঐ ভাষা শিখার চেষ্টা করে। ভাষা বুঝতে শুরু করার পর ইঙ্গা তার কাছে জানতে চান যে, সে কি এখানে (‘মানোয়া’ শহরে) থাকতে চায়, নাকি নিজের দেশে ফিরে যেতে চায়। কিন্তু, মার্টিনেজের নিজের দেশে ফিরারই ইচ্ছা ছিল, তাই সে রাজার দেয়া সুযোগটি নেয় নিজের দেশে ফিরতে।

el dorado

উপরের ছবিটা হলো কলাম্বিয়ার চুন্দিনামারকায় অবস্থিত গুয়াতাভিতা লেকের। শত শত বছর এখানে স্বর্ণের তৈজসপত্রের লোভে খোঁড়াখুঁড়ি হয়েছে, লেকের পানি বালতি ভরে ভরে পাহাড়ের নিচে ফেলে লেকটা শুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু আদতে কোনো লাভ হয়নি। কোনো স্বর্ণের সন্ধান পাওয়া যায়নি। ১৯৬৫ সাল নাগাদ ঐতিহ্যবাহী এই লেকটি রক্ষার্থে কলাম্বিয়া সরকার আইন করে এখানে সকল প্রকার স্বর্ণ অনুসন্ধানী কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।

সূত্র:
১। ancient-origins.net/ancient-places-americas/search-el-dorado-lost-city-gold-002535
২। ationalgeographic.com/archaeology-and-history/archaeology/el-dorado/
৩। en.wikipedia.org/wiki/El_Dorado

লিখেছেন: আজমাইন তৌসিক ওয়াসি

এল ডোরাডোঃ সোনার শহরে আপনাকে স্বাগতম!TankiBazzমিথলজিএল ডোরাডো
সোনার প্রতি লোভ মানুষের অতি পুরনো। প্রায় সব যুগে, সব জাতি- সম্প্রদায়ের মধ্যেই সোনার প্রতি আলাদা লোভ বা টান দেখা যায়। পরিমাণ যাই হোক, সোনা সংগ্রহের জন্য মানুষ সবসময়ই সচেষ্ট থেকেছে ও তার সংগ্রহের পরিমাণ প্রতিনিয়ত বাড়ানোর সব চেষ্টাও তারা করেছে। এল ডোরাডোঃ সোনার শহরে আপনাকে স্বাগতম! এল ডোরাডো: মানবযুগে শত শত...