মুসলিমদের কাছে আল-কুদস, খ্রিস্টানদের কাছে জেরুজালেম, ইহুদিদের ভাষায় ‘ইরুশালাইম’। যে নামেই ডাকা হোক- হাজার বছর ধরে পৃথিবীর অন্যতম পবিত্র নগরীর মর্যাদা জেরুজালেমের।ছোট্ট একটি শহরকে ঘিরে, তিন ধর্মের মানুষের এমন আবেগ,স্মৃতি বা ঐতিহ্য নেই পৃথিবীর আর কোথাও। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর শহর জেরুজালেম। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় থাকা, ‘ওল্ড সিটি’খ্যাত শহরটি বিভক্ত মুসলিম, ইহুদি,
খ্রিস্টান ও আর্মেনীয় বসতিতে; যেখানে আছে বিভিন্ন ধর্মের অনেক পবিত্র স্থাপনা। তাই নগরীর পবিত্রতা নিয়ে মতভেদ না থাকলেও নিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়ে আছে নানা বিতর্ক; আছে দফায় দফায় দখল, পুনর্দখল, ধ্বংস আর পুনর্নির্মাণের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস। সবচেয়ে বেশি টানাপড়েন, পবিত্র ভূমি ‘হারাম আল শরিফ’-কে ঘিরে। ইহুদী নিয়ে আলোচনা করছি আর জেরুজালেম শহর আসবে না তা হয় না।

ইহুদী জাতি

“জেরুজালেম” নিয়ে পরবর্তীতে বিষদ লিখবো। ফিরে আসা যাক মূল কাহিনীতে, ইউসুফ (আ) চালাকি করে বেঞ্জামিনকে তার কাছে রেখে দিলেন অতঃপর কী উত্তর দেবে ছেলেরা বাবা ইয়াকুবকে (আ)? তারা কাকুতি মিনতি করতে লাগল… অনেক অনুরোধ করল…ইউসুফ (আ) আর সইতে পারলেন না। আর আটকাতে পারলেন না অশ্রু। হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন, বললেন আমিই তোমাদের সেই ভাই ইউসুফ… সব ভাই পুরো অবাক হয়ে যায়… বিশ্বাস করতে পারছিল না নিজেদের চোখ কানকে। তারা বুঝল ইউসুফ তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। এরপর ইউসুফ (আ) তাদের বললেন, তাঁর সমস্ত আত্মীয় স্বজনসহ কেনান দেশ(বর্তমান ফিলিস্তিন) হতে মিসরে চলে আসতে। এখানেই তারা যেন বাস করে।ইউসুফ তাদের জন্য গোশেন প্রদেশে জায়গা দিলেন। সুদীর্ঘ ২২ বছর পর ইয়াকুব তাঁর ছেলেকে পেলেন। কান্নায় ভেঙে পড়লেন তারা। ফিরাউন ইউসুফকে প্রায় তাঁর সমান মর্যাদা দিতেন। ফিরাউন নিজেও নিজেকে ভাগ্যবান মনে করলেন ইসরাইল (আ) এর দেখা পেয়ে। ইউসুফের প্রতি তাঁর এতই আস্থা ছিল… ধীরে ধীরে ইসরাইলীদের সংখ্যা বাড়তে লাগল মিসরে… এক পর্যায়ে মারা গেলেন ইয়াকুব (আ)। তাঁর লাশ নিয়ে যাওয়া হল কেনান দেশে (পবিত্র ভূমি)। ইউসুফ (আ) ১১০ বছরে মারা যান। বলা হয়, তিনি ইসরাইলীদের কাছে ওয়াদা নেন, তাঁর লাশ যেন ভবিষ্যতে পবিত্র ভূমিতে নিয়ে দাফন করা হয়, যখন তারা মিসর থেকে চলে যাবে। তাই তাঁর লাশ কফিনে রাখা হয়।

সুদীর্ঘ ৪০০ বছর পার হয়ে গেল এভাবে। মিসরে ইসরাইলী বেড়ে গেল অনেক! অতিষ্ঠ হয়ে উঠে মিসরিরা… এক পর্যায়ে দেখা যায়, মিসরিরা ইসরাইলীদের দাস হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা ইসরাইলীদের ডাকত “হিব্রু” । এর অর্থ যারা “পার হয়ে এসেছে” … কারণ, তারা ফোরাত নদী পার হয়ে মিসরে এসেছিলো। এখন থেকে আসা করি হিব্রু অর্থ আপনার জানা থাকবে যদি আগে না জানতেন। মিসরের হিব্রুদের উপর (ইহুদীদের উপর) নেমে আসল ভয়াবহ অত্যাচার। আর সে সময় মিসরের ফেরাউন ছিল খুব অত্যাচারী। তিনি স্বপ্নে দেখলেন, নতুন জন্ম নেয়া এক হিব্রু ছেলে তাঁকে ওভারথ্রো করবে। তিনি আদেশ করলেন ইসরাইলিদের নতুন জন্ম নেয়া ছেলেদের মেরে ফেলতে। কিন্তু, সভাসদরা বলল, তাহলে সমস্যা হয়ে যাবে, দাসের অভাব পড়বে। তাই, আদেশ দেয়া হল, এক বছর মারা হবে, পরের বছর মারা হবে না। এমন সময় এক হিব্রু পরিবারে, ইমরানের এক ছেলে হল… কিন্তু, তাঁকে বাঁচিয়ে তো রাখা যাবে না। তাই সেই ছেলের মা তাঁকে ভাসিয়ে দিলেন নীলনদে একটা ঝুড়িতে। আর সেটাকে ফলো করল ঐ ছেলেটিরই বড় বোন, যার নাম ছিল মরিয়ম [যীশু খ্রিস্টের মা মেরির সাথে কোন সম্পর্ক নেই, কমন হিব্রু নাম এটা]। সেই ঝুড়ি গিয়ে ঠেকল রাজপ্রাসাদের ঘাটে। যেখানে ফিরাউনের স্ত্রী [বাইবেল বলে, ফিরাউনের মেয়ে] কুড়িয়ে নিলেন সেই শিশুকে। তিনি লালন করার সিদ্ধান্ত নিলেন শিশুটিকে। নাম দিলেন “মুসা” , যার অর্থ রেফার করত “যাকে পানি থেকে তুললাম”। মরিয়ম সেটা দেখলেন আর গিয়ে মাকে খবর দিলেন। ভাগ্যের খেলে, মুসার দুগ্ধমাতা হিসেবে নিয়োগ পেলেন মুসার আসল মা!! প্রশ্ন আসতে পারে, মুসার ভাই হারুন কীভাবে বেঁচে গেলেন? কারণ, তাঁর জন্ম হয়েছিল সেই বছরে যে বছর শিশুহত্যা করার কথা না।

এখানে অনেক কাহিনী আছে, সেগুলো স্কিপ করে যাই [মিশর নিয়ে লিখা নোটে বিস্তারিত লিখবো]। বড় হবার পর একবার মুসা দেখলেন এক ইসরাইলির সাথে এক মিসরি মারামারি করছে। তখন মুসা মিসরিকে থাপ্পর মারলেন, কিন্তু ঐ এক থাপ্পরেই মারা গেল ঐ মিসরি। ভয়ে মুসা পালিয়ে গেলেন মিসর থেকে মাদায়েনে। সেখানে কুয়ার পানি তোলা সংক্রান্ত এক ঘটনায় তিনি পরিচিত হন দুই মেয়ের সাথে। ঐ মেয়েরা ছিল শুয়ায়িব (আ) এর কন্যা। তিনি কাজ করা শুরু
করলেন শুয়ায়িব (আ) এর আন্ডারে ৮/১০ বছর এ শর্তে যে, কাজ শেষ করলে মুসা তাঁর মেয়েকে বিবাহ করতে পারবেন। শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর মেয়ে সফুরাকে বিবাহ করলেন। মাদায়েন থেকে সপরিবারে ফেরার পথে মুসা (আ) তূর পাহাড়ে আগুন দেখেন এবং এরপরের ঘটনা সবার জানা। তিনি নবুয়ত পেলেন। আল্লাহ তাঁর সাথে একটি জ্বলন্ত ঝোপের মধ্য দিয়ে সরাসরি কথা বললেন। তাঁকে ২টি মুজেজা দিলেন। আল্লাহ আদেশ দিলেন বর্তমান ফিরাউনকে ইসলামের দাওয়াত দিতে।
এখানে একটা কথা বলা হয়, সম্ভবত সেই আগের ফিরাউন আর এই ফিরাউন সেম না। হিস্টোরি বলছে, মুসার জন্মের সময় ফিরাউন ছিলেন SETI the 1st কিন্তু মিসরে রিটার্ন করার সময় ছিলেন RAMESES (II) the GREAT, তাওরাতও আমাদের বলছে, আগের ফিরাউন মারা যায়। রামেসিস ফারাও হন। তবে, কুরআন এ নিয়ে কিছু বলেনি, ঐ দুই ফারাও এক নাকি ভিন্ন। এই ফারাও নিজেকে প্রভু দাবি করে বসে। মুসা (আ) তাঁর মুজেজা দেখালেন ফিরাউনকে। কিন্তু তাঁকে জাদুকর আখ্যা দেয়া হল। তারপর মিসরের গর্ব বিখ্যাত জাদুকরদের সামনে মুসা (আ) দেখালেন তাঁর মুজেজা। জাদুকররা মানল, কিন্তু ফিরাউন মানলেন না। ফিরাউন যেতে দিলেন না হিব্রুদেরকে মিসর থেকে। তাই আল্লাহ মিসরের উপর গজব দিলেন। ক্রমান্বয়ে ১০টি গজব; কী
কী?

ইহুদী মতে গজবগুলো হল—>
১)পানি রক্তে পরিণত হল
২)ব্যাঙ
৩)উঁকুন
৪)মাছি
৫)গবাদি পশুর রোগ
৬)মিসরিদের চামড়ায় ফোস্কা
৭)শিলা আর বজ্র
৮)পঙ্গপাল
৯)টানা অন্ধকার
১০)সকল পরিবার এবং গবাদি পশুর প্রথম বাচ্চার মৃত্যু (এ গজব তাওরাতে/বাইবেলে আছে, কুরআনে নাই)

এত গজব সইতে না পেরে মিশরিরাই বরং অর্ডার করল
হিব্রুদেরকে মিসর থেকে বের হয়ে যেতে… আল্লাহও বললেন, “আমি মূসার প্রতি এ মর্মে ওহী করলাম যে,
আমার বান্দাদেরকে নিয়ে রাত্রিযোগে বের হয়ে যাও।” (কুরআন ২০:৭৭) তাই অবশেষে, মুসা (আ) তাঁর অনুসারী বিশাল ইসরাইল জাতিকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন, যা বিখ্যাত EXODUS নামে পরিচিত। অবশ্য, বের হয়ে যাবার সময় তিনি ইউসুফ (আ) এর কফিন নিয়ে নিলেন যেমনটা ইউসুফ ওয়াদা নিয়েছিলেন। সবাই ধীরে ধীরে আগাচ্ছিল। কিন্তু, পরে ফেরাউনের মত পরিবর্তন হল। তিনি তাদের যেতে দিতে চাইলেন না। এত জনবল ছাড়া যাবে না! তাই তিনি তাড়া করলেন ইসরাইলকে। “অতঃপর ফেরাউন তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল।” এরপর যখন হিব্রুরা লোহিত সাগরে (Red Sea) আসল, তখন তাদের প্রায় ধরে ফেলল ফেরাউন বাহিনী। তখন আল্লাহর আদেশে মুসা (আ) তাঁর লাঠি সমুদ্রে আঘাত করতেই সমুদ্র ২ ভাগে ভাগ হয়ে আলাদা হয়ে গেল (অনেকে ভাবে, নীল নদ ভাগ হয়েছিল, এটা ভুল ধারণা) … আর, মাঝখান দিয়ে শুকনো রাস্তা হয়ে গেল… ইসরাইলীরা সমুদ্র পার হবার পর যখন ফেরাউনের বাহিনী মাঝসাগরে আসল, তখন সমুদ্র আবার এক হয়ে গেল… ফলস্বরূপ ফেরাউনসহ পুরো বাহিনী ডুবে গেল। [অনেকে বলে, অনেকগুলো ভাগ হয়েছিল সাগরে, কেউ বলে সাত কেউ বলে ১২, এগুলো ভিত্তিহীন।] ইসরাইলিরা সাগরের ওপারে পৌঁছে আনন্দে মেতে উঠল। কিন্তু, এরপর থেকে ইসরায়েলের অবাধ্যতা শুরু হল… আল্লাহ তাদেরকে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতির মর্যাদা দিয়েছিলেন… “(মুসা বললেন) তিনি [আল্লাহ] তোমাদেরকে (বনী ইসরাইল) সারা বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।” কিন্তু এ মর্যাদা পাওয়ার পরেই তারা অকৃতজ্ঞতা, স্রষ্টাবিমুখতা আর অন্যান্য খারাপ কাজ শুরু করল। শুরু হল তাদের পতন।

কীভাবে সেসব জানতে চোখ রাখুন পরের পর্বে।
মুসার পর ইউশা, দাউদ, সুলাইমান, শামুয়েল, দানিয়েল,
জাকারিয়া থেকে ঈসা (আ), মুহাম্মাদ (স) পর্যন্ত cover করার ইচ্ছা আছে আমার… কাভার করতে গিয়ে জেরুজালেম, পবিত্র ভূমি, Ark Of Covenant, Solomon’s Treasure, The Secret Societies
এগুলোও চলে আসবে, সঙ্গেই থাকুন।

লিখেছেনঃ তানবীর ইসলাম

TankiBazzইতিহাসEXODUS,ইহুদী,জাতির ইতিহাস
মুসলিমদের কাছে আল-কুদস, খ্রিস্টানদের কাছে জেরুজালেম, ইহুদিদের ভাষায় ‘ইরুশালাইম’। যে নামেই ডাকা হোক- হাজার বছর ধরে পৃথিবীর অন্যতম পবিত্র নগরীর মর্যাদা জেরুজালেমের।ছোট্ট একটি শহরকে ঘিরে, তিন ধর্মের মানুষের এমন আবেগ,স্মৃতি বা ঐতিহ্য নেই পৃথিবীর আর কোথাও। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর শহর জেরুজালেম। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের...