হারকিউলিসের দুঃসাহসিক বারো অভিযানের একাদশ অভিযানঃ হেস্পেরাইদেসদের সোনার আপেল চুরি (পর্ব ২)

a

স্বর্ণের আপেল চুরি করাটা হেরাক্লেসের প্রতি ইউরেস্থিউসের আক্রোশ মেটানোর জন্য একদম খাপে খাপ একটা কাজ ছিল। অন্য কাজের মাধ্যমে হেরার বিরাগভাজন না হলেও এই কাজের মাধ্যমে হেরার ক্রোধ একদম নিজের ঘাড়ে এনে ফেলবেন হেরাক্লেস। যাকে বলে, নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা। তো, বীরের কি আর এসব দিকে নজর দেওয়ার সময় ছিল, বলেন? তিনি বাগান খুঁজতে খুঁজতে লিবিয়া, মিশর, আরব আর এশিয়াও ভ্রমণ করে ফেললেন। এসব দেশ পাড়ি দেওয়ার সময় তিনি বিভিন্ন অভিযানেও জড়িয়ে পড়েছিলেন। তবে এসব অভিযান যে সুখকর ছিল না, তা আর বলতে! হিরো হওয়ার হ্যাপা আছে। সবাই শুধু পাংগা নিতে চায়। যেমন, ঘুরতে ঘুরতে যখন তার সাথে দেখা হল সমুদ্র দেবতা পসেইডনের এক ছেলে এন্টেউসের, তখন এন্টেউস হেরাক্লেসকে থামিয়ে বলল, “কী ভাই, বিষয় আশয় ভালো তো? চলো, হয়ে যাক এক দফা পাংগা।” হেরাক্লেস মনে মনে প্রমাদ গুনলেন। এভাবে সব বীরের সাথে পাংগা নিতে থাকলে বাগান খুঁজে পেতে তার সারাজীবন লেগে যাবে। কিন্তু চ্যালেঞ্জ তো ফিরিয়েও দেওয়া যায় না। বীরত্ব নিয়ে কথা রটে যাবে যে!

হেরাক্লেস তাই রাজী হলেন কুস্তি লড়তে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার! এন্টেউসকে যতবারই তিনি মাটিতে আছড়ে ফেলছেন, ততবারই সে দ্বিগুণ শক্তিশালী হয়ে হেরাক্লেসের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। কারণ এন্টেউস হল গায়ার সন্তান, আর গায়া হলেন স্বয়ং ভূমি। তাই এন্টেউস যতক্ষণ মাকে স্পর্শ করে আছে, সে অমর। তাকে মারা সম্ভব নয়। বীর মশাই বুঝলেন, একে হারাতে হবে অন্য স্টাইলে। চিন্তা মত, এন্টেউসকে মাটির উপরে উঠিয়ে, দুই হাতে চাপ দিয়ে একদম গুঁড়ো গুঁড়ো করে ফেললেন। ঠিক যেমন গেম অফ থ্রোন্স টিভি সিরিজে (স্পয়লার এলারট!) আমাদের প্রিয় ওবেরিন মার্টেলকে ‘দা মাউন্টেন’ গুঁড়ো গুঁড়ো করে করেছিল।

এরপর হেরাক্লেস যখন মিশর দেশে পা দিলেন, তখন পসেইডনের আরেক ছেলে, মিশরের রাজা বুসিরিস তাকে আটক করে শিকল দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধলো। বেঁধে নিয়ে এলো এক বেদীর সামনে। তার পরিকল্পনা হল, হেরাক্লেসকে দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলি দেওয়া। কিন্তু বীরকে কি আর লোহার শেকলে বেঁধে রাখা যায়? জাদুর শেকল হলেও আমরা কিছুটা আশা করতে পারতাম। ফলে হেরাক্লেস যখন ভীষণ শক্তি দিয়ে দুমড়ে মুচড়ে ফেললেন শেকলটাকে, আর হত্যা করলেন বুসিরিসকে, আমরা খুব একটা অবাক হই না।

মিশর থেকে বেরিয়ে হেরাক্লেস পথ চলতে চলতে এলেন ককেশাস পর্বতে, যেখানে দেবতাদের রাজা যিউস শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে প্রমিথিউসকে। প্রমিথিউস কে এবং কেন তাকে আটকে রাখা হয়েছে, সেটা জানার জন্য ঢুঁ মারতে পারেন পেইজের নোট সেকশনে। তবে এখানে কাহিনীর খাতিরে কিছু বলে নিই। প্রমিথিউস হল একজন দেবতা, যে নিজে একজন টাইটান এবং আরেক টাইটান ‘এটলাসের’ ভাই। দেবতাদের নিজস্ব জিনিস হিসেবে গণ্য “আগুনকে” চুরি করে প্রমিথিউস মানুষের ব্যবহারের জন্য পৃথিবীতে নিয়ে এসেছিলো। এই আস্পর্ধা দেখে যিউস তাকে শাস্তি দিলো। শাস্তির রূপ ভয়াবহ। প্রতিদিন একটা ঈগল এসে প্রমিথিউসের কলিজা ঠুকরে ঠুকরে খাবে, কিন্তু এতে করে প্রমিথিউস মারা পড়বে না অথচ মৃত্যুর কাছাকাছি চলে যাবে। ঈগল চলে যাওয়ার পর রাতের বেলা কলিজা আবার আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। পরদিন ঈগল এসে সেই নতুন কলিজা ঠুকরে ঠুকরে খাওয়া শুরু করবে। কলিজায় ঠোকর খাওয়ার যে ব্যথা, সেটাই প্রমিথিউসের শাস্তি। এই শাস্তি প্রতিদিন চলবে, চলবে অনন্তকাল ধরে। চিন্তা করে দেখুন মানুষের কল্পনাশক্তির অবস্থা! এই শাস্তির কথা কীভাবে ভেবেছিলো সে আমলের মানুষ?

যা হোক, মানুষের আচার আচরণ জানার জন্য নৃতত্ত্ববিদরা আছেন। আমরা বরং চলে যাই মূল গল্পে। প্রমিথিউসের শাস্তির যখন ৩০ বছর চলছে, তখন হেরাক্লেস ককেশাস পর্বতে এসে প্রমিথিউসের এই হাল দেখলেন। দেখে খুব দুঃখ পেলেন। প্রমিথিউসের কষ্ট শেষ করার জন্য তিনি ঈগলটাকে মেরে ফেললেন। কৃতজ্ঞতায় প্রমিথিউস একটা উপকার করতে চাইলো। আর এই মুহূর্তে বাগানের ঠিকানা জানানোর চেয়ে বড় উপকার কী হতে পারে? কিন্তু বিধি বাম, প্রমিথিউস সেটা জানতো না। কিন্তু সে হেরাক্লেসকে একটা বুদ্ধি দিলো। বলল, তার ভাই এটলাস জানে এই বাগান কোথায়। হেরাক্লেস যদি এটলাসের কাছে ধর্না দেয়, আর আপেল এনে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে, কাজ হলেও হতে পারে। এটলাস সম্পর্কে আরও জানতে ঢুঁ মারুন নোট সেকশনে।

হেরাক্লেস এটলাসের কাছে চললেন। দেবতা এটলাসের কাজ হল, স্বর্গ আর পৃথিবীকে নিজের কাঁধে বহন করা। এই কাজ করতে করতে বেচারা ক্লাস্ত হয়ে পড়েছিলো। তাই হেরাক্লেস যখন তাকে বললেন, “ভাই, আমার একটা কাজ করে দাও না! হেস্পেরাইদেসদের পাহারা থেকে আমাকে কিছু স্বর্ণের আপেল এনে দাও না! বিনিময়ে স্বর্গ আর পৃথিবীর ভার কিছুক্ষণের জন্য আমার কাঁধে নিচ্ছি”, এটলাস খুবই খুশি হল। রাজী হল আপেল এনে দিতে। যেহেতু হেস্পেরাইদেসরা ছিল এটলাসেরই কন্যা, তাই তাদের কাছ থেকে আপেল নিয়ে আসতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না তাকে। বিনিময়ে যদি একটুক্ষণের জন্যে হলেও ফালতু এই বিরক্তিকর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায়, মন্দ কী?

চলবে…

মিথলজি লিখেছেনঃ নির্ঝর রুথ ঘোষ

হারকিউলিসের একাদশ অভিযানঃ হেস্পেরাইদেসদের সোনার আপেল চুরি (পর্ব ২)TankiBazzমিথলজিhercules,Mythology
হারকিউলিসের দুঃসাহসিক বারো অভিযানের একাদশ অভিযানঃ হেস্পেরাইদেসদের সোনার আপেল চুরি (পর্ব ২) স্বর্ণের আপেল চুরি করাটা হেরাক্লেসের প্রতি ইউরেস্থিউসের আক্রোশ মেটানোর জন্য একদম খাপে খাপ একটা কাজ ছিল। অন্য কাজের মাধ্যমে হেরার বিরাগভাজন না হলেও এই কাজের মাধ্যমে হেরার ক্রোধ একদম নিজের ঘাড়ে এনে ফেলবেন হেরাক্লেস। যাকে বলে, নিজের পায়ে...