হারকিউলিসের দুঃসাহসিক বারো অভিযানের একাদশ অভিযানঃ হেস্পেরাইদেসদের সোনার আপেল চুরি (পর্ব ১)

a

হেরাক্লেসের উপর দশটা কাজের বোঝা চাপানোর কথা ছিল রাজা ইউরেস্থিউসের। কিন্তু সে কল্পনা করেনি, আট বছর এক মাস ধরে এই দশটা কাজ ঠিকঠাক মত করে হেরাক্লেস তাকে তাক লাগিয়ে দেবে। সে ভেবেছিলো, এগুলো করতে গিয়ে বীরসাহেব পটল তুলবেন, অন্ততপক্ষে চিৎপটাং হবেন। কিন্তু কীসের কী? আমাদের জন্য অসম্ভব, কিন্তু হেরাক্লেসের জন্য সম্ভব দশটা কাজ শেষে তেনাকে জ্যান্ত দেখে ইউরেস্থিউসের মাথার তার ছিঁড়ে গেলো। সে বীরকে অপদস্থ করার সুযোগ খুঁজতে লাগলো, আর পেয়েও গেলো।

সে ঘোষণা দিলো, হাইড্রা নাম্নী যে সাপকে হেরাক্লেস মেরেছেন, সেটা তার একার কাজ ছিল না। সেখানে তাকে সাহায্য করেছিলো লোলাউস নামের আরেক বীর। আবার রাজা অজিয়ানের আস্তাবল পরিষ্কার করার কাজও হেরাক্লেস একা একা করেনি। সেখানে সে নদীর সাহায্য নিয়েছিলো, আবার কাজ শেষে অজিয়ানের কাছ থেকে টেকাটুকাও কামিয়েছিলো। ইউরেস্থিউসের দেওয়া শর্তে এইসব ছিল না। ফলে সে একটা সুযোগ পেয়ে গেলো হেরাক্লেসকে বিপদে ফেলার। সে অনুযায়ী, আরও দুটো কাজের ভার চাপানো হল বীরের মাথায়। আজ আমরা পড়বো বীরের এগারো নাম্বার অভিযানের কথা, যেটা ছিল অন্য সব অভিযানের তুলনায় অনেক কঠিন! কিন্তু কেন? কী ছিল সেই কাজ?

কাজটা ছিল হেস্পেরাইদেস নামক নিম্ফদের কড়া পাহারা থেকে সোনার আপেল চুরি করা। কিন্তু কী এই সোনার আপেলের মাহাত্ম্য? আর কারাই বা এই হেস্পেরাইদেস?

যখন হেরা আর যিউসের বিয়ে হয়, তখন সকল দেবতার মাতা ‘গায়া’ তাদেরকে একটা সোনার আপেলের গাছ উপহার দেন। আরও সঠিকভাবে বললে, আপেল গাছের কলম উপহার দেন। সেই কলমগুলো লাগিয়ে হেরা একটা বাগান তৈরি করেন। সেই বাগানে হাজারে হাজারে স্বর্ণের আপেল ফলতে লাগলো। আপেলগুলো খেলে অমরত্ব লাভ করা যায়। তাই এত দামী আপেলের বাগানকে পাহারাহীনভাবে ফেলে রাখতে সায় দিলো না হেরার মন। তিনি পাহারা দেওয়ার জন্য নিয়োগ করলেন দেবতা এটলাসের নিম্ফ (বন জঙ্গলের দেবী) কন্যাদের, যারা হেস্পেরাইদেস নামে পরিচিত। কিন্তু তারা বাগান পাহারা দেওয়ার ফাঁকে মাঝে মধ্যে দুয়েকটি আপেল গাপ করে দিতো। খেয়ে ফেলত আর কি। তাই হেরা ওদেরকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। ফলে তিনি দ্বিতীয় পাহারাদার হিসেবে বহাল করলেন ল্যাডন নামক একশো মাথাওয়ালা একটা ড্রাগনকে। ড্রাগনের পঞ্চাশটা মাথা যখন বাগান পাহারা দিতো, অপর পঞ্চাশটা মাথা তখন ঘুমিয়ে পরবর্তী টহলের জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করতো। এত পাহারা ভেদ করে চিরশত্রু হেরার এই আপেল হেরাক্লেস অন্য কাজের মত সহজে চুরি করতে পারবে বলে মনে করেন? উঁহু। তার উপর, হেরার বাগানটা যে ঠিক কোথায়, সেটা হেরাক্লেস জানতেন না।

কিন্তু আমরা জানি। এখনকার পর্তুগাল দেশটি যেখানে অবস্থিত, সেখানেই হেরার এই বাগানটা ছিল। মজার ব্যাপার হল, স্বর্ণের আপেল বলে হেরা যাকে মনে করছিলেন, পুরাণ নিয়ে পড়াশোনা করা বিজ্ঞেরা সেগুলোকে বলছেন “কমলা”। যেহেতু কমলা ফলটা মধ্যযুগের ইউরোপ আর ভূমধ্য সাগরীয় অঞ্চলে অপরিচিত ছিল, তাই সে আমলের মানুষ কমলার হলুদ/কমলা রঙ দেখে একে সোনালি আপেল বলতো! এই ফাঁকে আরেকটা মজার তথ্য জানিয়ে রাখি। এই ভুলের উপর ভিত্তি করে সব ধরনের টক ফলের গ্রিক বোটানিক্যাল নাম রাখা হয়েছিলো “hesperidoids”। এখনো গ্রিস দেশে গেলে দেখবেন, কমলার গ্রিক নাম পোর্তোকালি, যা রাখা হয়েছে পর্তুগালের নামানুসারে।

যা হোক, খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি হচ্ছে। ফিরে আসি আসল গল্পে।

হেরাক্লেস যখন আপেল নিয়ে আসতে বের হলেন, তখন তার হাতে ধরা ছিল তার সেই বিখ্যাত মুগুর, পিঠে চাপানো ছিল নেমিয়ার সিংহের চামড়া। নেমিয়ার অভিযানটির কথা মনে না থাকলে পড়ে আসতে পারেন পেইজের নোট থেকে। তো, হেরাক্লেস বাগান খুঁজতে গিয়ে নিজের দেশ গ্রিস চষে বেড়ালেন। গ্রিসের থেসালি অঞ্চল দিয়ে যাওয়ার সময় যুদ্ধের দেবতা এইরিসের এক পুত্র কিক্নসের সাথে তার দেখা হল। কিক্নস তাকে থামিয়ে বলল, “চলো, হয়ে যাক পাংগা।” বীর কি এমন চ্যালেঞ্জ না নিয়ে পারেন? ফলে শুরু হল চরম মারামারি। দুজন দক্ষ মারবিদের মধ্যে এটা এমনই মারামারি যে, থামছেই না। অবশেষে একটা বজ্রপাত ঘটায় তাদের লড়াই থামে। হেরাক্লেস তখন সময় নষ্ট না করে ইলাইরিয়া অঞ্চলের দিকে রওনা দেন। সেখানে সমুদ্রের দেবতা নেরেউসের কাছ থেকে বাগানের ঠিকানা জানতে হবে।
.
নেরেউস আবার ব্যাডঅ্যাস দেবতা। তিনি নিজের আকার পরিবর্তন করে ভেল্কি দেখাতে পারেন। তাই হেরাক্লেস যখন তাকে চেপে ধরলেন বাগানের ব্যাপারে, নেরেউস বিভিন্ন আকার ধারণ করে হেরাক্লেসের বজ্রমুষ্ঠি থেকে রেহাই পেতে চাইলেন। কিন্তু আমাদের বীর এত সহজে বোকা বনার পাত্র নন। তিনি শক্ত করে নেরেউসকে আঁকড়ে ধরে রাখলেন। একসময় নেরেউস ভেল্কিবাজি দেখাতে দেখাতে ক্লান্ত হয়ে পড়লো। রাজী হল বাগানের ঠিকানা দিতে। সেই ঠিকানা নিয়ে হেরাক্লেস শুরু করলেন তার ভ্রমণ।

(চলবে…)

মিথলজি লিখেছেনঃ নির্ঝর রুথ ঘোষ

হারকিউলিসের একাদশ অভিযানঃ হেস্পেরাইদেসদের সোনার আপেল চুরি (পর্ব ১)TankiBazzমিথলজিhercules
হারকিউলিসের দুঃসাহসিক বারো অভিযানের একাদশ অভিযানঃ হেস্পেরাইদেসদের সোনার আপেল চুরি (পর্ব ১) হেরাক্লেসের উপর দশটা কাজের বোঝা চাপানোর কথা ছিল রাজা ইউরেস্থিউসের। কিন্তু সে কল্পনা করেনি, আট বছর এক মাস ধরে এই দশটা কাজ ঠিকঠাক মত করে হেরাক্লেস তাকে তাক লাগিয়ে দেবে। সে ভেবেছিলো, এগুলো করতে গিয়ে বীরসাহেব পটল তুলবেন,...