নিজের সৈন্যবাহিনীকে কর্ণের হাতে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখে ভীম ক্রুদ্ধ হয়ে একটা ধারালো ঝকঝকে বর্শা তুলে নিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে কর্ণের দিকে ছুঁড়ে মারলেন। ছুঁড়ে মেরে ভাবলেন, যাক, এবার আর ‘সুতপুত্রে’র রেহাই নেই! কিন্তু কর্ণকে চিনতে তখনো ভীমের বাকি ছিল। কর্ণ বর্শাটাকে দেখেই ওটার দিকে সাতটা ধারালো তীর ছুঁড়ে মারলেন, ফলে মাঝ আকাশেই তীরের আঘাতে বর্শাটি টুকরো টুকরো হয়ে গেল। ব্যাপার-স্যাপার দেখে ভীম থ’ হয়ে গেলেন। কিন্তু তা কেবল এক মুহূর্তের জন্যই। এর পরপরই ভীম তাঁর ধনুক তুলে কর্ণের দিকে ক্ষিপ্রগতিতে তীর ছুঁড়তে শুরু করলেন। কর্ণও প্রত্যুত্তরে অসংখ্য তীর ছুঁড়তে লাগলেন। আবার ভয়াবহ তীরন্দাজির খেলা শুরু হয়ে গেল।

কর্ণ-ভীম যুদ্ধ : ১ম খণ্ড

karna Bhima fight

এবার ভীম এক বুদ্ধি আঁটলেন। তিনি তাঁর সারথিকে রথ কর্ণের রথের একেবারে কাছে নিয়ে যেতে আদেশ দিলেন। খুব সহজ পরিকল্পনা ছিল তাঁর। একেবারে কাছে থেকে কর্ণ তীর ছুঁড়তে পারবেন না, এই সুযোগে ভীম তাঁকে গদা নিয়ে আক্রমণ করবেন। ভীম নিশ্চিত ছিলেন যে, গদাযুদ্ধে তিনি কর্ণকে পরাজিত করতে পারবেন। (যখন আমি প্রথমবার এই দ্বৈরথের বিবরণ পড়েছিলাম, তখন এই অংশে পৌঁছে আমার নিজেরও ধারণা ছিল যে, গদাযুদ্ধে কর্ণ ভীমের কাছে পরাজিত হবেন। সত্যি বলতে কী, এই যুদ্ধের আগে আর কোনো সময়ই কর্ণকে গদাযুদ্ধ করতে দেখা যায় নি, এর পূর্বের সবগুলো যুদ্ধে কর্ণ হয় তীর-ধনুক বা তলোয়ার নিয়ে কিংবা শুধু খালি হাতে লড়েছেন, কখনো গদা নিয়ে লড়েননি।)

ভীম পরিকল্পনা মতো তীর ছুঁড়তে ছুঁড়তে কর্ণের রথের একেবারে কাছে চলে এলেন এবং গদা হাতে কর্ণকে আক্রমণ করলেন। কর্ণও ধনুক ফেলে একটি গদা তুলে নিলেন এবং ভীমকে আক্রমণ করলেন। তীব্র গদাযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। কর্ণ এবং ভীমের গদা দু’টো একে অপরকে আঘাত করায় যেন স্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি হলো।

karna Bhima fight

কর্ণের সঙ্গে গদাযুদ্ধ যতটা সহজ হবে বলে ভীম ধারণা করেছিলেন, ঠিক ততটাই কঠিন হয়েছিল সেটা। বস্তুত গদাযুদ্ধে নৈপুণ্য প্রদর্শনের কোনো আগের রেকর্ড না থাকলেও কর্ণ সেদিন প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, গদাযুদ্ধে তিনিও সুদক্ষ। ভীম এবং কর্ণের মধ্যে বহুক্ষণ গদাযুদ্ধ চলল। কেউই অপরজনকে হারাতে পারলেন না। শেষটায় পরিস্থিতি এমন হলো যে, দু’জনেই ক্লান্ত হয়ে পড়লেন! তবুও দু’জনেই একগুঁয়ে, কেউ হার স্বীকার করতে রাজি নন।

এসময় কর্ণ এবং ভীমের রথের সারথিরা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিলেন। দু’জনের সারথিই দেখলেন যে, তাঁদের রথীরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। এমতাবস্থায় শত্রুর কাছাকাছি থাকা বিপজ্জনক। তাই তাঁরা কর্ণ বা ভীম কাউকে কিছু না বলেই রথ দু’টোর একটিকে অপরটি থেকে দূরে সরিয়ে নিলেন। ভীম আর কর্ণের গদাযুদ্ধের ফলাফল দাঁড়ালো একটা আস্ত ঘোড়ার ডিম। অর্থাৎ ম্যাচ ড্র!

এবার কর্ণ আর ভীম আবারও তীর-ধনুক তুলে নিয়ে একে অপরকে আক্রমণ করলেন। দু’জনেই প্রাণপণে লড়ছিলেন, কিন্তু ভীমের পক্ষে আর কর্ণের বাণ বৃষ্টি রোধ করা সম্ভব হচ্ছিলো না, কর্ণের তীর তাঁর প্রতিটি অঙ্গে শেলের মতো এসে বিঁধছিল। ভীমের সমগ্র দেহ থেকে রক্ত ঝরছিল, কিন্তু ব্যথা অগ্রাহ্য করে তিনি যুদ্ধ করতে লাগলেন। যতই কর্ণের তীর তাঁর শরীরে বিঁধছিল, ততই তাঁর ক্রোধও বেড়ে চলছিল।

এবার ক্রুদ্ধ ভীম হাতে তুলে নিলেন তাঁর সেই বিখ্যাত গদা, যেটি মায়াসুর তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন। এই গদাটি একসময়ে দৈত্যদের রাজা বৃষপর্বের ছিল। ইন্দ্রের বজ্রের সমতুল্য শক্তি ছিল এই গদাতে। এবার ক্রোধান্বিত ভীম সেই বিখ্যাত গদা হাতে তুলে নিলেন, কর্ণের জীবনের ইতি ঘটানোর জন্য। অত্যন্ত ভারী গদাটি হাতে নিয়ে বনবন করে ঘুরিয়ে ভীম তাঁর সমস্ত শক্তি দিয়ে গদাটি ছুঁড়ে মারলেন কর্ণের দিকে। গদাটি এত তীব্র বেগে কর্ণের রথকে আঘাত করলো যে, কর্ণ প্রতিক্রিয়া দেখানোর সময়ই পেলেন না। ভীমের গদার আঘাতে কর্ণের রথটি বিস্ফোরিত হলো এবং কর্ণের রথের সারথি ও ঘোড়াগুলো সাথে সাথে মারা গেল।

আশপাশের সকল সৈন্য এবং রথী-মহারথীরা ভাবলেন, কর্ণ নিহত হয়েছেন। ভীম পরিতুষ্ট হয়ে ভাবলেন, “যাক, অবশেষে হতচ্ছাড়া ‘সুতপুত্রে’র জীবনের সমাপ্তি ঘটলো”! এই ভেবে ভীম যখন পরিতৃপ্ত, ঠিক তখনই একগুচ্ছ তীর তাঁর বুকে বিঁধল।

হতবাক হয়ে ভীম এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতে পেলেন যে, যিনি তীর ছুঁড়েছেন তিনি আর কেউ নন, সেই হতচ্ছাড়া ‘সুতপুত্র’ কর্ণ! ভীমের চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল। ব্যাটা বাঁচলো কিভাবে? আসলে ব্যাপারটা ছিল এরকম – ভীমের গদাটাকে তীব্র বেগে ছুটে আসতে দেখেই কর্ণ বুঝতে পেরেছিলেন যে, গদাটাকে প্রতিহত করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তিনি সঙ্গে সঙ্গেই লাফ দিয়ে আরেকটি রথে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। এভাবে অতি অল্পের জন্য মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেলেন সূর্যপুত্র।

karna Bhima fight

আবারও কর্ণ এবং ভীমের মধ্যে মরণপণ সংগ্রাম শুরু হলো। দু’জনেই তাঁদের সর্বোচ্চ দক্ষতা ব্যবহার করছিলেন একে অপরের বিরুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য। তাঁদের মরণপণ যুদ্ধ দেখার জন্য স্বর্গের দেবতা, গন্ধর্ব, অপ্সরা এবং বিদ্যাধরেরা আকাশে নেমে এসেছিলেন। কর্ণ এবং ভীমের সাহস, রণ দক্ষতা এবং সহনশক্তি তাঁদেরকে মুগ্ধ করে তুলল। তাঁরা কর্ণ এবং ভীমের ওপর স্বর্গীয় পুষ্প বর্ষণ করলেন।

তবে কর্ণ বা ভীম কেউই এদিকে মনোযোগ দিচ্ছিলেন না। তাঁরা দু’জনেই ততক্ষণে ভেতরে ভেতরে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন। কর্ণ ভাবছিলেন যে, এই যুদ্ধ তাড়াতাড়ি শেষ করা দরকার, জয়দ্রথকে রক্ষা করাও তো তাঁর কর্তব্য! ভীমও ভাবছিলেন যে, যুদ্ধটা বেশি প্রলম্বিত হয়ে গেছে, অথচ তাঁর কৌরব ব্যূহে প্রবেশের উদ্দেশ্যই ছিল অর্জুনকে সহায়তা করা।

এই ভেবে কর্ণ ও ভীম দু’জনেই তাঁদের আক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে দিলেন। ভীম তাঁর সমস্ত শক্তি এবং দক্ষতা দিয়ে তীর ছুঁড়তে লাগলেন। তাঁর ছোঁড়া অজস্র তীর কর্ণের সমগ্র শরীরে বিঁধল। কর্ণের দেহে যেন রক্তের বন্যা বয়ে যাচ্ছিল। ক্রুদ্ধ কর্ণ এবার একটা এসপার ওসপার করার জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হলেন। তিনি তাঁর সমস্ত দক্ষতা এবং মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে যুদ্ধ শুরু করলেন। তিনি এত দ্রুত তীর ছুঁড়ছিলেন যে, কখন তিনি তীর হাতে নিচ্ছেন, কখন লক্ষ্য নির্ধারণ করছেন আর কখনই বা তীর ছুঁড়ছেন – কেউই লক্ষ্য করতে পারছিল না। কর্ণের ছোঁড়া অজস্র তীর যেন আকাশ জুড়ে চলমান অসংখ্য রেখার সৃষ্টি করেছিল। সমগ্র আকাশ কর্ণের তীরে যেন ঢাকা পড়ে গিয়েছিল! ভীম অজস্র তীর ছুঁড়েও কর্ণের বাণ বৃষ্টি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারলেন না। কর্ণের নিক্ষিপ্ত অজস্র তীর ভীমের শরীরে আঘাত করল। ভীমের শরীরে এত তীর বিঁধে গিয়েছিল যে, তাঁকে ঠিক সজারুর মতো দেখাচ্ছিল। অসহ্য ব্যথায় ভীমের শরীর মোচড় দিয়ে উঠলো। কিন্তু তারপরও ভীম মুহূর্তের জন্যও সংজ্ঞাহারা হন নি। (এইজন্যই তিনি ভীম)

ভীম কর্ণের এই প্রচণ্ড আক্রমণে দুর্বল হয়ে পড়াতে কর্ণ সেই সুযোগে তীরের আঘাতে ভীমের দৈব ধনুক ‘বায়বীয়’ কেটে ফেললেন। ভীমের তূণীরগুলোও তিনি কেটে ফেললেন। এরপর ভীম একটি ভারী গদা তুলে তাঁর সমস্ত শক্তি দিয়ে ঘুরিয়ে কর্ণের দিকে ছুঁড়ে মারলেন। কিন্তু কর্ণ অজস্র তীর ছুঁড়ে গদাটিকে মাঝ আকাশেই টুকরো টুকরো করে ফেললেন। এরপর ভীম একটি ঝকঝকে বল্লম তুলে কর্ণের দিকে তীব্র বেগে ছুঁড়ে মারলেন। কিন্তু কর্ণ এই বল্লমটিকেও তীর ছুঁড়ে মাঝ আকাশেই টুকরো টুকরো করে ফেললেন। এরপর ভীম একটি তলোয়ার এবং ঢাল তুলে নিলেন এবং রথ থেকে লাফিয়ে পড়তে উদ্যত হলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল কর্ণকে তলোয়ার নিয়ে আক্রমণ করা। কিন্তু তিনি রথ থেকে নামার আগেই কর্ণ তীর ছুঁড়ে ঢালটি টুকরো টুকরো করে ফেললেন। ক্রুদ্ধ ভীম তাঁর তলোয়ারটিই তখন কর্ণের দিকে ছুঁড়ে মারলেন। তলোয়ারটি কর্ণের ধনুক কেটে দ্বিখণ্ডিত করে মাটিতে পড়ে গেল। কর্ণ সঙ্গে সঙ্গে নতুন একটি ধনুক তুলে নিলেন এবং তীরের সাহায্যে ভীমের রথের সারথি ও ঘোড়াগুলোকে মেরে ফেললেন। ভীমের রথটিকেও তিনি তীর ছুঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেললেন।
নিরস্ত্র ভীম মাটিতে লাফিয়ে নামলেন। কিন্তু তিনি কোনো কিছু করার আগেই কর্ণ হাজার হাজার তীর তাঁর দিকে নিক্ষেপ করলেন। কর্ণের তীরের আঘাতে ভীম গুরুতর ভাবে আহত হলেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি যুদ্ধ বন্ধ করার কথা মুহূর্তের জন্যও ভাবলেন না। তিনি কর্ণের রথের ওপর লাফিয়ে পড়লেন, কর্ণকে খালি হাতে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে।

ভীমের কাণ্ড দেখে কর্ণ হতবাক হয়ে পড়লেন। কেউ যে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও এতটা বেপরোয়া হতে পারে এটা তাঁর ধারণার বাইরে ছিল। কিন্তু হতবাক হলেও কর্ণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হলেন না। তাঁর কাছে কিছু বিশেষ অতি ক্ষুদ্র তীর ছিল, যেগুলো দিয়ে একেবারে কাছে থাকা শত্রুকে আঘাত করা যেত। কর্ণ এরকম অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তীর দিয়ে ভীমকে আঘাত করলেন। ব্যথায় কাতর ভীম বুঝতে পারলেন যে, কর্ণকে ক্লোজ কমব্যাটে পরাজিত করা সম্ভব নয়। কাজেই তিনি কর্ণের রথ থেকে নেমে পড়লেন এবং তাঁর ভাঙা রথের কাছে গেলেন।
.
সেখানে গিয়ে তিনি তাঁর ভাঙা রথের টুকরোগুলো কর্ণের দিকে ছুঁড়ে মারতে লাগলেন। কর্ণ তীরের আঘাতে সেগুলো কেটে ফেললেন। এরপর ভীম আরো পিছিয়ে গিয়ে একটি বিকল কিন্তু আস্ত রথ তুলে কর্ণের দিকে ছুঁড়ে মারলেন। কর্ণ অজস্র তীর নিক্ষেপ করে তাঁর দিকে নিক্ষিপ্ত বিশাল সেই রথটি টুকরো টুকরো করে ফেললেন। এতেও ভীম আশাহত হলেন না। তিনি আশেপাশে পড়ে থাকা নিহত ঘোড়া এবং হাতির শরীরের অংশগুলো কর্ণের দিকে ছুঁড়ে মারতে লাগলেন। কর্ণ তীরের সাহায্যে এগুলোও কেটে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। এরপর ভীম শেষ চেষ্টা হিসেবে একটি বিশাল মৃত হাতি তুলে নিয়ে কর্ণের দিকে ছুঁড়ে মারলেন। কর্ণ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে অসংখ্য তীর ছুঁড়ে হাতিটিকে টুকরো টুকরো করে ফেললেন।

karna Bhima fight

আশেপাশে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের মতো আর কিছু না পেয়ে ভীম অবশেষে কর্ণের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য আত্মগোপন করতে প্রয়াসী হলেন। তিনি দৌড়ে গিয়ে এমন একটি মৃত হাতির স্তূপের মধ্যে ঢুকলেন, যেখানে কর্ণের রথ পৌঁছতে পারবে না। ব্যাপার দেখে কর্ণ হাসতে হাসতে ধনুক হাতে তাঁর রথ থেকে নেমে এলেন। ভীমের কাছে এসে তিনি ভীমকে তাঁর ধনুকের অগ্রভাগ দিয়ে স্পর্শ করলেন। কিন্তু তিনি ভীমকে ছোঁয়া মাত্রই ভীম তাঁর হাত থেকে ধনুকটি কেড়ে নিলেন এবং ধনুকটি দিয়ে কর্ণের মাথায় সজোরে আঘাত করলেন। কিন্তু ব্যথা পাবার পরিবর্তে কর্ণ হাসতে লাগলেন। তিনি ভীমকে আঘাত করে তাঁর হাত থেকে নিজের ধনুক কেড়ে নিলেন এবং আবারও ভীমকে সেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তীর দিয়ে আঘাত করতে লাগলেন। মারাত্মকভাবে আহত ভীমের প্রথমবারের মতো প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার যোগাড় হলো।

কর্ণ এসময় ইচ্ছে করলে ভীমকে মেরে ফেলতে পারতেন। কিন্তু কুন্তিকে দেয়া প্রতিশ্রুতির কারণে তিনি ভীমকে হত্যা করলেন না। এর পরিবর্তে তিনি তাঁর ধনুকটি ভীমের গলায় ঝুলিয়ে দিলেন এবং হাসতে হাসতে বললেন, “দাঁড়ি বিহীন নপুংসক, মূর্খ পেটুক কোথাকার! দক্ষ না হয়ে আমার সঙ্গে লড়তে এসো না। যুদ্ধক্ষেত্রে তুমি শিশু ছাড়া কিছুই নও! যেখানে প্রচুর পরিমাণে খাদ্য আর পানীয় থাকে, সেখানে তোমার থাকা উচিত, কিন্তু কখনো যুদ্ধক্ষেত্রে নয়। তোমার উচিত ফলমূল খেয়ে আর ব্রত পালন করে জঙ্গলে বসবাস করা, কারণ তুমি যুদ্ধে দক্ষ নও! যুদ্ধ আর একজন মুনির জীবনে আকাশ-পাতাল তফাত। কাজেই তুমি জঙ্গলে চলে যাও, কারণ তুমি যুদ্ধে দক্ষ নও! তোমার মধ্যে জঙ্গলের জীবনযাপনের উপযোগিতা আছে। তুমি কেবল তোমার রাতের খাবারের জন্য চাকর-বাকরদের ধমকাতে পারবে। যাও, মুনিদের জীবনধারা গ্রহণ করে জঙ্গলে চলে যাও, কারণ তুমি যুদ্ধে অদক্ষ। এতদিন ফলমূল আর শাকসবজি কেটে আর অতিথিদের সেবাযত্ন করে তুমি যুদ্ধ করা ভুলে গেছ।”

এরপর কর্ণ হাসতে হাসতে আবার বললেন, “তুমি অন্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারো, কিন্তু আমার মতো যোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা তোমার উচিত না। কারণ, যারা আমার মতো যোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে, তাদের এরকম অপমান সহ্য করতে হয়। যাও, যেখানে অর্জুন আর কৃষ্ণ আছে সেখানে চলে যাও, তারা তোমাকে রক্ষা করবে। কিংবা বাড়ি ফিরে যাও। যেহেতু তুমি শিশুর মতো, যুদ্ধের সঙ্গে তোমার কি কারবার?”

ভীম সমস্ত অপমান চুপচাপ হজম করলেন। কারণ, এছাড়া তখন তাঁর আর কিছু করার ছিল না। ভীমকে এভাবে তীব্রভাবে অপমান করে কর্ণ বহু বছর আগে হস্তিনাপুরের রঙ্গভূমিতে তাঁর যে অপমান হয়েছিল, তার প্রতিশোধ নিলেন। এরপর কর্ণ সেখান থেকে তাঁর রথে করে ফিরে গেলেন। ভীমও সাত্যকির রথে চড়ে অর্জুনকে সহায়তা করার জন্য ছুটলেন।

এভাবে সমাপ্তি ঘটলো কর্ণ-ভীম যুদ্ধের। পরবর্তীতে অবশ্য তাঁদের মধ্যে আরো যুদ্ধ হয়, কিন্তু সেগুলোর কোনোটাই এটার মতো এতো ব্যাপক বা প্রলম্বিত ছিল না।

সূত্র:
i) The Mahabharata of Krishna Dwaipayana Vyasa – Kisari Mohan Ganguly
ii) The Mahabharata of Krishna Dwaipayana Vyasa – P.C. Roy
iii) The Critical Edition of the Mahabharata – BORI
iv) Bharatgatha – an ancient version of the Mahabharata

মিথলজি লিখেছেনঃ হিমেল রহমান

কর্ণ-ভীম যুদ্ধ : ২য় ও শেষ খণ্ডTankiBazzমিথলজিkarna Bhima fight
নিজের সৈন্যবাহিনীকে কর্ণের হাতে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখে ভীম ক্রুদ্ধ হয়ে একটা ধারালো ঝকঝকে বর্শা তুলে নিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে কর্ণের দিকে ছুঁড়ে মারলেন। ছুঁড়ে মেরে ভাবলেন, যাক, এবার আর 'সুতপুত্রে'র রেহাই নেই! কিন্তু কর্ণকে চিনতে তখনো ভীমের বাকি ছিল। কর্ণ বর্শাটাকে দেখেই ওটার দিকে সাতটা ধারালো তীর ছুঁড়ে মারলেন,...