সমগ্র মহাভারত জুড়ে অসংখ্য দ্বন্দ্বযুদ্ধ বা দ্বৈরথ যুদ্ধ বর্ণিত হয়েছে। ভীষ্ম-পরশুরাম যুদ্ধ, অর্জুন-শিব যুদ্ধ, কর্ণ-ঘটোৎকচ যুদ্ধ, কর্ণ-অর্জুন যুদ্ধ, ভীম-দুর্যোধন যুদ্ধ — মহাভারতের সঙ্গে পরিচিত প্রত্যেক ব্যক্তিই এই আগ্রহোদ্দীপক দ্বন্দ্বযুদ্ধগুলোর সম্পর্কে কমবেশি জানেন। তবে যে দ্বন্দ্বযুদ্ধ সম্পর্কে অনেকেই জানেন না, কিংবা জানেন, কিন্তু ভালোভাবে জানেন না, সেটি হচ্ছে কর্ণ-ভীম দ্বন্দ্ব। হ্যাঁ, মহাবলী ভীম এবং মহাধনুর্ধর কর্ণের দ্বন্দ্ব নিয়েই আজকের এ পর্ব।

karna Bhima fight

কর্ণ সম্পর্কে বেশিরভাগ মানুষ যা জানেন, সেটা হলো — কর্ণ একজন অত্যন্ত দক্ষ ধনুর্ধর বা ধনুর্বিদ বা তীরন্দাজ। কিন্তু অনেকে এটা জানেন না যে, কর্ণের শারীরিক শক্তিও ছিল অতুলনীয়। কর্ণ অপরিমেয় বাহুবলের অধিকারী ছিলেন, এবং বাহুবলের দিক থেকে ভীমের চেয়ে কোনো অংশেই কম ছিলেন না। Wrestling বা মল্লযুদ্ধেও কর্ণ অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। এর প্রমাণ হিসেবে এটা উল্লেখ করাই যথেষ্ট যে, কর্ণ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মল্লযুদ্ধে মগধের রাজা জরাসন্ধকে পরাজিত করেছিলেন (যেখানে একই জরাসন্ধকে মল্লযুদ্ধে পরাজিত করতে ভীমের সময় লেগেছিল দীর্ঘ দুই সপ্তাহ!)। অর্থাৎ কর্ণ একদিকে যেমন অত্যন্ত দক্ষ একজন তীরন্দাজ ছিলেন, তেমনি একজন মহাবলী মল্লযোদ্ধাও ছিলেন। কিন্তু কর্ণ প্রায় সময় তীর-ধনুক নিয়ে যুদ্ধ করতেন বলে তিনি তীরন্দাজ হিসেবেই পরিচিত হন, মল্লযোদ্ধা হিসেবে নন।

ভীম সম্পর্কেও বেশিরভাগ মানুষ জানেন যে, ভীম একজন অত্যন্ত শক্তিশালী গদাধারী এবং মল্লযোদ্ধা ছিলেন। কিন্তু ভীম সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষই যা জানেন না তাহলো — ভীম তীরন্দাজিতেও কারো চেয়ে কম ছিলেন না। তীরন্দাজিতে তিনি কর্ণ কিংবা অর্জুনের ঠিক সমান দক্ষ না হলেও তাঁদের সমকক্ষ ছিলেন। উল্লেখ্য, কর্ণ, অর্জুন এবং ভীম — তিনজনই ছিলেন অতিরথী, অর্থাৎ সর্বোচ্চ rank এর যোদ্ধা।

karna Bhima fight

ভীম ধনুর্বিদ্যায় কতটা দক্ষ ছিলেন, কয়েকটা উদাহরণ দিলেই তার আন্দাজ পাওয়া যাবে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ৮ম দিনে ভীমের নিকট স্বয়ং ভীষ্ম পরাজিত হন। পাণ্ডব এবং কৌরবদের অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্যও বেশ কয়েকবার ভীমের নিকট পরাজিত হন (যুদ্ধের ৮ম এবং চতুর্দশ দিনে)। অর্থাৎ ভীম একদিকে যেমন দক্ষ গদাধারী ও মল্লযোদ্ধা ছিলেন, অন্যদিকে তেমনি একজন নিপুণ ধনুর্ধরও ছিলেন। তবে ধনুর্বিদ্যার একটি দিকে ভীম যুধিষ্ঠিরের চেয়েও দুর্বল ছিলেন। সেটি হলো — ভীমের নিকট কোনো শক্তিশালী দিব্যাস্ত্র ছিল না, যেমনটি কর্ণ, অর্জুন, অশ্বত্থামার কাছে ছিল। ভীম এবং দুর্যোধন দু’জনেই অত্যন্ত উগ্র মস্তিষ্কের হওয়ায় দ্রোণাচার্য তাঁদের ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারেননি। এজন্য এই দু’জন অত্যন্ত শক্তিশালী যোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও তিনি এঁদের হাতে ব্রহ্মাস্ত্র বা ঐন্দ্রাস্ত্রের মতো কোনো ধ্বংসাত্মক দিব্যাস্ত্র তুলে দেননি।

তবে কর্ণের যেমন একটি দৈব ধনুক ছিল (‘বিজয়া’ ধনুক; মহর্ষি পরশুরাম কর্ণকে এটি উপহার দিয়েছিলেন), তেমনি ভীমেরও একটি দৈব ধনুক ছিল (‘বায়বীয়’ ধনুক; ভীমের পিতা অর্থাৎ পবন দেব ভীমকে এটি উপহার দিয়েছিলেন)। এই দৈব ধনুক ছাড়াও ভীমের কাছে ছিল একটি দৈব গদা (খাণ্ডব-দহনের পর মায়া সুর ভীমকে এটি উপহার দিয়েছিলেন)। এই গদার সাহায্যে ভীম অজস্র সৈনিক এবং রথী-মহারথীকে হত্যা করেছিলেন।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের চতুর্দশ দিনে ভীম এবং কর্ণ প্রথমবারের মতো পরস্পরের মুখোমুখি হন। এদিন অর্জুন জয়দ্রথকে হত্যা করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে কৌরব ব্যূহের ভিতরে প্রবেশ করেছিলেন। পরবর্তীতে অর্জুনকে সহায়তা করার জন্য যুধিষ্ঠিরের নির্দেশে ভীম বিরাট এক সৈন্যবাহিনীসহ কৌরব ব্যূহের ভেতরে প্রবেশ করেন। কৌরবরা সেদিন শকট ব্যূহ রচনা করেছিলেন (‘শকট’ শব্দের অর্থ রথ বা গাড়ি বা যান; শকট ব্যূহ অনুযায়ী সৈন্যদলকে একটি রথের আকৃতিতে সাজানো হতো। রথের সম্মুখ ভাগে যেমন ঘোড়া থাকে, তেমনি শকট ব্যূহের সম্মুখভাগে থাকতো অশ্বারোহী বাহিনী এবং এরপর থাকতো ঘোড়ায় টানারথ নিয়ে গঠিত বাহিনী)।

শকট ব্যূহের প্রবেশ দ্বারে ছিলেন দ্রোণাচার্য স্বয়ং। তিনি ভীমকে বাধা দানের চেষ্টা করলেন। কিন্তু বিধিবাম! ভীমের গদার আঘাতে দ্রোণাচার্যের রথ বিধ্বস্ত হলো। পরাজিত দ্রোণাচার্য পিছু হটতে বাধ্য হলেন। দ্রোণাচার্যকে পরাজিত করে ভীম শকট ব্যূহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন। অজস্র কৌরব সৈনিক এবং রথী-মহারথীরা ভীমের হাতে প্রাণ হারালেন। দুর্যোধনের ১১ জন ভাই একসঙ্গে ভীমকে বাধা দিতে এগিয়ে এলেন, কিন্তু ভীম একাই তাঁদেরকে পরাজিত এবং হত্যা করলেন।

এরপর কৌরবদের রক্ষা করার জন্য দ্রোণাচার্য আবার ভীমের দিকে এগিয়ে এলেন। কিন্তু এবারও ভাগ্য ছিল তাঁর বিরূপ! দ্রোণাচার্যের নিক্ষিপ্ত বাণ বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে ভীম তাঁর রথ থেকে লাফিয়ে নেমে দ্রুত দ্রোণাচার্যের রথের কাছে চলে এলেন এবং দ্রোণাচার্যসহ দ্রোণাচার্যের রথটি দু’হাত দিয়ে তুলে দূরে ছুঁড়ে মারলেন। দ্রোণাচার্যের রথটি ধ্বংস হয়ে গেল এবং তিনি নিজেও আহত হলেন। ভীমের এমন দু:সাহস এবং বীরত্ব দেখে উপস্থিত কৌরব মহারথীরা থ’ মেরে গেলেন। দ্রোণাচার্য আর ভীমের মুখোমুখি হওয়ার সাহস পেলেন না। তিনি আরেকটা রথে চড়ে শকটব্যূহের প্রবেশমুখে চলে গেলেন, পাণ্ডব বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য।

karna Bhima fight

এরপর দুর্যোধনের আরও ২০ জন ভাই একসঙ্গে ভীমকে ঘিরে ফেললেন। তাঁরাও একে একে ভীমের কাছে পরাজিত ও নিহত হলেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন দুর্যোধনের ভাই চিত্রসেন, দুর্মুখ, দুঃসহ এবং বিকর্ণ। শেষোক্ত চারজন দক্ষ যোদ্ধা ছিলেন। কিন্তু তাঁরাও ভীমের হাতে নিহত হলেন। অর্থাৎ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভীম দুর্যোধনের ৩১ জন ভাইকে মেরে ফেললেন।

অবশ্য ভীমের রক্তপিপাসা এতেও মেটেনি। তিনি তাঁর আসল লক্ষ্য, অর্থাৎ অর্জুনকে খোঁজার কথা আপাতত ভুলে গিয়ে দুর্যোধনের অবশিষ্ট ভাইদের খুঁজতে লাগলেন। যাঁরাই তাঁকে বাধা দিতে এলেন, তাঁরাই বেঘোরে প্রাণ হারালেন। দুঃশাসন, কৃপাচার্য (কৌরব ও পাণ্ডবদের আরেক গুরু), অশ্বত্থামা এবং মাদ্রারাজ শল্য একে একে ভীমকে বাধা দিতে এলেন, কিন্তু তাঁরা প্রত্যেকেই পরাজিত হয়ে পশ্চাদপসরণে বাধ্য হলেন। ভীমের রণহুঙ্কারে সমগ্র কুরুক্ষেত্র প্রকম্পিত হয়ে উঠল।

এসময় কর্ণ ছিলেন শকটব্যূহের শেষপ্রান্তে। ভীম যেখানে ছিলেন, সেখান থেকে অনেক দূরে। কর্ণ, শকুনি, কর্ণের ছেলে বৃষসেন – এঁরা জয়দ্রথকে অর্জুনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সেখানে জয়দ্রথকে ঘিরে রেখেছিলেন। ভীমের রণহুঙ্কার তাঁদের কানে এলো। সৈনিকদের কাছ থেকে কর্ণ জানতে পারলেন যে, ভীমের হাতে দুর্যোধনের ৩১ জন ভাই ইতোমধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন এবং ভীম বাকি কৌরব ভাইদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন তাঁদের মেরে ফেলার জন্য। কর্ণের সামনে তখন এক নতুন সমস্যা দেখা দিল। তিনি কি দুর্যোধনের ভাইদের রক্ষা করার জন্য এগিয়ে যাবেন, নাকি জয়দ্রথকে অর্জুনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সেখানেই থেকে যাবেন? “শাঁখের করাত” বোধহয় একেই বলে!

যাই হোক, শেষ পর্যন্ত কর্ণ বিবেচনা করে দেখলেন যে, জয়দ্রথের কাছে পৌঁছাতে অর্জুনের এখনো অনেক সময় লাগবে। কাজেই তাঁর উচিত হবে প্রথমে দুর্যোধনের ভাইদের ভীমের হাত থেকে রক্ষা করা। এজন্য তিনি অন্যান্য যোদ্ধাদের নিকট জয়দ্রথকে রক্ষার দায়িত্ব দিয়ে ভীমের দিকে ছুটে গেলেন। কর্ণের রথ তীব্রগতিতে শকটব্যূহের সম্মুখভাগের দিকে ছুটে চললো।

কর্ণ যখন শকটব্যূহের সম্মুখভাগে পৌঁছুলেন, ততক্ষণে ভীম আরো ৭ জন কৌরব রাজকুমারকে খুঁজে বের করে তাঁদের মারবার আয়োজন করছেন। ভাগ্যক্রমে ঠিক সেই মুহূর্তে কর্ণ ভীমের সামনে উপস্থিত হলেন এবং ভীমের দিকে অজস্র তীর নিক্ষেপ করলেন। এতে ভীম সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত হয়ে পড়লেন। এই সুযোগে কৌরব রাজকুমারেরা নিরাপদে কেটে পড়লেন।

কর্ণকে দেখেই ভীম তীব্র ক্রোধে জ্বলে উঠলেন। এই “নিচুবংশে জন্মগ্রহণকারী হতভাগা”-কে (ভীম সবসময় এভাবেই কর্ণকে সম্বোধন করতেন) তিনি প্রথম থেকেই পছন্দ করতেন না। তার ওপর দ্যূতসভায় কর্ণ দ্রৌপদীকে যে অপমান করেছিলেন, তাও ভীম ভুলে যাননি। কাজেই সেই কর্ণকে চোখের সামনে দেখে ভীমের সমগ্র দেহে যেন আগুন জ্বলে উঠল। কর্ণকে নিজ হাতে মেরে ফেলার জন্য তিনি সক্রিয় হয়ে উঠলেন।

কর্ণও ভীমকে মোটেই পছন্দ করতেন না। রঙ্গভূমিতে ভীম তাঁকে যেভাবে অপমান করেছিলেন, তা তিনি কখনোই ভুলে যাননি। এমনিতে হয়তো তিনিও ভীমকে টুকরো টুকরো করতে চাইতেন। কিন্তু তিনি যে কুন্তির কাছে প্রতিজ্ঞা করেছেন — অর্জুন ছাড়া আর কোনো পাণ্ডবকে বধ করবেন না! তার ওপর ভীম না জানলেও তিনি তো জানেন, তাঁরা সহোদর, একই মায়ের সন্তান। কাজেই জেনেশুনে নিজের ভাইকে তিনি হত্যা করবেন কীভাবে?

karna Bhima fight

কর্ণের দ্বিধার ফলাফল দাঁড়ালো এই যে, ভীম তাঁর সর্বশক্তি নিয়ে কর্ণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন, কিন্তু কর্ণ হালকা ভাবে তার প্রতিরোধ করতে লাগলেন। যুদ্ধ শুরুর সময় ভীম এত জোরে রণ হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন যে, আশপাশের সকল যোদ্ধা হতবিহ্বল হয়ে পড়লেন এবং তাঁদের হাত থেকে অস্ত্রশস্ত্র মাটিতে পড়ে গেল। একমাত্র কর্ণের ওপরই এই ভয়ানক শব্দের কোনো প্রভাব দেখা গেল না। তিনি শান্তভাবে ভীমের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করলেন।

ভীম এবং কর্ণ একে অপরের দিকে এত তীর ছুঁড়ছিলেন যে, আকাশে কেবল তীর আর তীরই দেখা যাচ্ছিল। এসময় ভীম তাঁর দৈব ধনুক ‘বায়বীয়’ নিয়ে লড়ছিলেন, আর কর্ণ লড়ছিলেন সাধারণ ধনুক নিয়ে। তীব্র যুদ্ধ চলছিল দু’জনের মধ্যে। ভীমের তীরের আঘাতে যেমন কর্ণের শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছিল, তেমনিভাবে কর্ণের তীরের আঘাতে ভীমের দেহের রক্তধারা প্রবাহিত হচ্ছিল।

কর্ণ আর ভীমের মধ্যে যখন তীব্র যুদ্ধ চলছিল, আকাশে তখন অসংখ্য চিল আর শকুন উড়ছিল। তারা যেন এই বিকট যুদ্ধ দেখতেই সেখানে জড়ো হয়েছিল। যুদ্ধ চলছিল সমানে সমান। কর্ণ এবং ভীম দু’জনেই একে অপরের ওপর অসংখ্য বাণ নিক্ষেপ করছিলেন। ঘটনাচক্রে ভীমের নিক্ষিপ্ত বহুসংখ্যক তীর কর্ণের রথের ঘোড়াগুলোকে আঘাত করল, এবং ঘোড়াগুলো এতে নিহত হলো। কর্ণের রথ অচল হয়ে পড়ল। কর্ণ মুহূর্ত মাত্র বিলম্ব না করে তাঁর ধনুক নিয়ে অচল রথ থেকে লাফ দিয়ে আরেকটি রথে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং কাল বিলম্ব না করে ভীমের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করলেন। (এখানে কর্ণের রণদক্ষতার একটি পরিচয় পাওয়া যায়। সাধারণত কোনো যোদ্ধার একটি রথ ভেঙে গেলে তিনি অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থায় পড়তেন। কেননা যতক্ষণে ঐ যোদ্ধা অন্য রথে গিয়ে চড়তেন, ততক্ষণে শত্রু ইচ্ছে করলে তাঁকে মেরে ফেলতে বা আহত করতে পারত। কিন্তু কর্ণ এত দ্রুত এক রথ থেকে অন্য রথে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন যে, ভীম তাঁকে আঘাত করার সুযোগই পাননি। এটিই ছিল কর্ণের বিশেষত্ব, তিনি ছিলেন অত্যন্ত ক্ষিপ্র।)

ভীম এবং কর্ণের মধ্যে যুদ্ধ বিরতিহীন ভাবে চলছিল। কর্ণ ধীরে ধীরে ভীমের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে লাগলেন। ভীমের নিক্ষিপ্ত অসংখ্য তীর তিনি মাঝ আকাশেই তাঁর নিজের নিক্ষিপ্ত তীর দিয়ে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলছিলেন। ভীমের তীর আর কর্ণের কাছাকাছি পৌঁছতেই পারছিল না। কিন্তু কর্ণ তখন পর্যন্ত ভীমকে ততোটা তীব্রভাবে আক্রমণ করছিলেন না। এদিকে ভীম সর্বশক্তি নিয়ে কর্ণকে আক্রমণ করছিলেন। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে চলার পর ভীমের তীরের আঘাতে আবারও কর্ণের রথের ঘোড়াগুলো নিহত হলো। কর্ণের রথ বিকল হয়ে গেল। কর্ণ কাল বিলম্ব না করে তাঁর ধনুক নিয়ে আবারও নতুন একটি রথে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং সেখান থেকে ভীমের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগলেন।

পরপর দু’টো রথ হারিয়ে কর্ণের মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল। এবার আর কোনো রকম দয়া-মায়া নয় – এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি ভীমের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। হাজার হাজার নয়, লক্ষ লক্ষ তীর ছুঁড়তে লাগলেন তিনি (পাঠকেরা দয়া করে জানতে চাইবেন না, এত তীর কর্ণ কোথায় পেয়েছিলেন!)। কর্ণের তীরের আঘাতে ভীমের দেহ তীব্রভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল। অবশ্য এর মাঝেও ভীম যেন নিহত না হন সেদিকে কর্ণ খেয়াল রাখছিলেন। কারণ, ভীম নিহত হলে তাঁর প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ হয়ে যাবে। ভীমকে আহত করার পর কর্ণ ভীমের সঙ্গে যে সৈন্যবাহিনী ছিল সেটিকে আক্রমণ করলেন। ভীমের বিশাল সৈন্যদল আক্ষরিক অর্থেই ছারখার হয়ে গেল। কর্ণের তীরে হাজার হাজার পাণ্ডব সৈন্য নিহত হলো। ভীমের সৈন্যবাহিনী সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেল।

নিজের সৈন্যবাহিনীকে এভাবে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখে ভীম যারপরনাই ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন। তীর-ধনুক দিয়ে কাজ হবে না ভেবে তিনি এবার একটা ধারালো ঝকঝকে বর্শা তুলে নিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে কর্ণের দিকে ছুঁড়ে মারলেন। ছুঁড়ে মেরে ভাবলেন যে, যাক, এবার আর সুতপুত্রের রেহাই নেই!

কিন্তু কর্ণকে চিনতে তখনো ভীমের বাকি ছিল।

(পরবর্তী খণ্ডে সমাপ্য) কর্ণ-ভীম যুদ্ধ : ২য় ও শেষ খণ্ড

মিথলজি লিখেছেনঃ হিমেল রহমান

কর্ণ-ভীম যুদ্ধ : ১ম খণ্ডTankiBazzমিথলজিkarna Bhima fight
সমগ্র মহাভারত জুড়ে অসংখ্য দ্বন্দ্বযুদ্ধ বা দ্বৈরথ যুদ্ধ বর্ণিত হয়েছে। ভীষ্ম-পরশুরাম যুদ্ধ, অর্জুন-শিব যুদ্ধ, কর্ণ-ঘটোৎকচ যুদ্ধ, কর্ণ-অর্জুন যুদ্ধ, ভীম-দুর্যোধন যুদ্ধ --- মহাভারতের সঙ্গে পরিচিত প্রত্যেক ব্যক্তিই এই আগ্রহোদ্দীপক দ্বন্দ্বযুদ্ধগুলোর সম্পর্কে কমবেশি জানেন। তবে যে দ্বন্দ্বযুদ্ধ সম্পর্কে অনেকেই জানেন না, কিংবা জানেন, কিন্তু ভালোভাবে জানেন না, সেটি হচ্ছে কর্ণ-ভীম দ্বন্দ্ব।...