লিলিথ কি ছিলেন পৃথিবীর প্রথম স্বাধীনতাকামী?

Lilith, একজন নারী, জন্ম থেকেই পুরুষের সমকক্ষ একজন মানুষ। ‘Lady Flying in the Darkness’ বলা হয় তাকে। যদিও পুরাণের ইতিহাসে কুখ্যাত হিসেবে লিলিথকে মনে রাখা হয়েছে, কিন্তু আসলেই কি ঘটনা তাই?

Lilith

ইহুদী পুরাণের অন্যতম কুখ্যাত চরিত্র লিলিথ। কেউ কেউ মনে করেন লিলিথ হল শয়তানের সঙ্গিনী। অথচ তার হওয়ার কথা ছিল অবাধ স্বাধীনতার প্রতীক! তিনি কিভাবে ত্রাস, বিভীষিকা, বিপদ ও অন্ধকারের প্রতীকে পরিণত হলেন? নাকি তার উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল কলংক? এইসব নিয়েই আজ কিছুটা আলোচনা করা যাক।

পরিচয়ঃ
ইহুদী পুরাণ অনুযায়ী, পৃথিবী এবং স্বর্গের আদি নারী লিলিথ। খৃষ্টের জন্মের প্রায় তিন হাজার বছর পূর্বে লিলিথীয় উপাখ্যানের উৎপত্তি। খৃষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে একটি খোদাইকৃত সিরীয় লিপিতে মূলত লিলিথের অস্তিত্বের খোঁজ পাওয়া যায়। সেখানে লেখা ছিল, আসলে দুয়ো দেওয়া হচ্ছিল এইভাবে ‘O flyer in a dark chamber, go away at once, O Lili!’

সৃষ্টি ও সংঘাতঃ
আদম-হাওয়া বা এ্যডাম-ইভের উপাখ্যান আমরা সবাই জানি। কিন্তু ইহুদী মিথলজিতে আরো একজন নারীর দেখা পাওয়া যায় যার আবির্ভাব ঘটেছিল ইভেরও আগে। তিনিই লিলিথ, আদি ও পরিপূর্ণ, পুরুষের সমকক্ষ নারী। তার উৎপত্তি আদমের পাঁজর থেকে নয়, বরং আদমের মতই মাটি থেকে হয়েছিল। সৃষ্টিকর্তা আদমের একাকিত্ব দূর করার জন্য মাটি থেকে লিলিথকে তৈরি করেন একই রকমের সামর্থ্য ও আত্মমর্যাদাবোধ দিয়ে এবং আদমের কাছে নিয়ে আসেন। তবে ‘বুক অব জেনেসিস (১)’-এ লেখা আছে, পুরুষকে আগে নারীকে পরে নয়, বরং পুরুষ-নারী দুজনকে একইসাথে তৈরি করা হয়। “So god created man in his own image in the image of god created he him; male and female created he them (1:27)”। এরপরই চলে আসে নারী আর পুরুষের মধ্যকার দ্বন্দ্বের ঘটনা।

যখন আদম আর লিলিথের মধ্যে ভালবাসা তৈরি হওয়ার কথা, ভালবাসার মাধ্যমে বংশ সৃষ্টি করার কথা, তখন দুইজন মানুষের মধ্যে আত্ম অহমিকার প্রকাশ দেখা যেতে লাগল। কে কার জন্য ত্যাগস্বীকার করবে, সেটা নিয়ে শুরু হল দ্বন্দ্ব। কিন্তু এমন কেন হল? হল কারণ সৃষ্টির শুরু থেকেই দেখা যেতে লাগল পুরুষ সবকিছুর উপর অধিকার ফলাতে যায়, মাতব্বরি করতে যায়, আর নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। সে যেকোনো মূল্যে সবকিছুর শ্রেষ্ঠ হতে চায়, এমনকি জোর জবরদস্তি করে হলেও। কিন্তু লিলিথও যেহেতু আদমের মত একই উন্নাসিক মানসিকতার অধিকারী, সেহেতু সে আদমের এসব কাজ কারবার মোটেও ভাল চোখে দেখল না। সে কিছুতেই আদমের নিয়ন্ত্রণে থাকতে চাইল না। বরং সে সবকিছুতে সমান অধিকার দাবি করল। আদম এই দাবি কিছুতেই মেনে নিল না। ফলে দুজনের মধ্যে সংঘাত বেঁধে গেল। এক পর্যায়ে লিলিথ সমকক্ষতার অধিকার নিয়ে আদমের একাধিপত্যকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বসল।

স্বর্গ ত্যাগ কিংবা পলায়ন-শাস্তি ও পরিণতিঃ প্রত্যাখ্যাত হয়ে আদম যখন নিজের শক্তি প্রকাশের জন্য বল প্রয়োগের চেষ্টা শুরু করল, তখন আত্ম সচেতন লিলিথ স্বর্গ ত্যাগ করে পৃথিবীতে চলে এল। আদম গিয়ে সৃষ্টিকর্তার নিকট নালিশ জানাল “হে মহাবিশ্বের পালনকর্তা, আপনি আমাকে যে নারী দান করেছিলেন, সে পালিয়ে গেছে।“ তখন সৃষ্টিকর্তা তিনজন ফেরেশতাকে হুকুম দিলেন “যাও, লিলিথকে ধরে নিয়ে এস। সে যদি ভালোয় ভালোয় আসতে চায় তো খুব ভালো। না আসতে চাইলে তাকে বোলো যে, প্রতিদিন তার একশোটা করে বাচ্চা মারা যাবে।“

এইভাবে নারীর আবেগের উপর সৃষ্টির শুরুতেই হানা হল চরম আঘাত। তারপরেও এমন ভয়াবহ শাস্তির হুমকিকে লিলিথ পাত্তা দিল না। সে স্বর্গে ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানাল। ফেরেশতাদের কথার জবাবে বলল, “আমি রাজি প্রতিদিন একশোটা বাচ্চাকে উৎসর্গ করতে। তবুও আমি নিজের স্বাধীনতা খোয়ানোর জন্য স্বর্গে যেতে রাজি নই।“

মিথ অনুযায়ী লিলিথ আদি নারী হলেও আমরা দেখতে পাচ্ছি, সে দুনিয়ার প্রথম বিদ্রোহী ও স্বাধীনতাকামীও বটে।

অপবাদ ও অন্ধকারে নিক্ষেপঃ
চরম আগ্রাসী ও বিস্তারবাদী ধ্যান ধারণার কারণে লিলিথকে শুধু স্বর্গ ত্যাগ কিংবা নিজের সন্তানদের মৃত্যুই স্বীকারই করতে হয়নি, পরবর্তীতে তাকে তুলে ধরা হয় অন্ধকারের প্রতিভূ, ব্যভিচারী, খুনি, আর শিশু ভক্ষণকারী হিসাবে। অনেকের মতে লিলিথ শয়তানের স্ত্রী। লিলিথের হাত থেকে গর্ভবতীদের রক্ষার জন্য এক সময় কবজের প্রচলনও ছিল। পুরুষদের মধ্যে লিলিথ সম্পর্কে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল আতংক। তালমুদ (ইহুদিদের একটি পবিত্র গ্রন্থ। এটি শুধুমাত্র ইহুদিদের দ্বারা মৌখিক আইন হিসেবে পরিচিত) অনুযায়ী লিলিথ শুধুমাত্র অন্ধকারের আত্মাই না, সে অনিয়ন্ত্রিত যৌনতার প্রতীকও বটে।

ব্যাবিলনিয় তালমুদ অনুযায়ী (Shabbat151a) “কোনো পুরুষ যেন বাড়িতে একা রাত না কাটায়! লিলিথের আছর পড়তে পারে তার উপর।“ বলা হয়ে থাকে, লিলিথ পুরুষের সঙ্গ নিয়ে নতুন নতুন শয়তানের জন্ম দেয়। সৃষ্টির আদি থেকেই এমন এক ধারণা প্রতিষ্ঠা করা হয় যে, পুরুষ কখনো প্রথা বিরুদ্ধ কিছু করে না, তাকে দিয়ে করানো হয়। হয় শয়তান, না হয় লিলিথ, নয়ত কোনো নারী দ্বারা পুরুষ প্রভাবিত হয়ে খারাপ কাজ করে।

সমাপ্তিঃ
অন্যান্য ধর্ম গ্রন্থ অনুযায়ী, শয়তানকে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হতে হয়েছিল অহংকারের জন্য ও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করায়। কিন্তু সে বিতাড়িত হলেও তাকে বিভিন্ন ধরনের ক্ষমতা দেওয়া হয় মানুষের প্রবৃত্তিকে প্রভাবিত করার। অন্যদিকে লিলিথের ব্যাপার ভিন্ন। সৃষ্টির আদিতেই তাকে এমন এক বিচারের মুখোমুখি হতে হয় যা শুধু প্রশ্নেরই জন্ম দেয়। একই প্রবৃত্তিজাত হওয়ার পরেও তাকে বিতাড়িত, অভিযুক্ত ও অপবাদদুষ্ট হতে হয় শুধুমাত্র নিজের সমতা প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়ায়।

সে কখনো নিজেকে শ্রেষ্ঠ দাবি করেনি। অথচ তারপরেও তাকে অভিশপ্ত ও নিক্ষিপ্ত হতে হয় অন্ধকারে। এমনকি ধীরে ধীরে সমস্ত ইতিহাস থেকেই তাকে মুছে ফেলা হয়। পরবর্তী কোনো ধর্মীয় ক্রমে আর তার সংযুক্তি হয়নি। মোটামুটি সব ধরনের মিথলজির মধ্যেই লিলিথই একমাত্র নারী যিনি জন্ম থেকেই পুরুষের সমকক্ষ, এবং এই অপরাধেই তাকে অভিশপ্ত হতে হয়েছিল

লিখেছেনঃ নাজমুল হাকিম

TankiBazzমিথলজিLilith
লিলিথ কি ছিলেন পৃথিবীর প্রথম স্বাধীনতাকামী? Lilith, একজন নারী, জন্ম থেকেই পুরুষের সমকক্ষ একজন মানুষ। 'Lady Flying in the Darkness' বলা হয় তাকে। যদিও পুরাণের ইতিহাসে কুখ্যাত হিসেবে লিলিথকে মনে রাখা হয়েছে, কিন্তু আসলেই কি ঘটনা তাই? ইহুদী পুরাণের অন্যতম কুখ্যাত চরিত্র লিলিথ। কেউ কেউ মনে করেন লিলিথ হল শয়তানের সঙ্গিনী।...