মাটির প্রজার দেশে গল্পটি আসলে কার?? জামালের, লক্ষ্মীর, ফাতেমার নাকি আব্বাস হুজুরের??? গল্পটি মূলত আমাদের প্রত্যেক মাটির প্রজার – মুভি রিভিউ

Kai Po Che

Matir Projar Deshe মুভি ইনফোঃ
মুভি : মাটির প্রজার দেশে
বিভাগঃ ড্রামা পরিচালকঃ ইমতিয়াজ আহমেদ বিজন
প্রযোজনাঃ গুপী বাঘা প্রডাকশন্স
প্রধান অভিনেতা – অভিনেত্রী: জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, রোকেয়া প্রাচী, কচি খন্দকার

Matir Projar Deshe রিভিউঃ

বাংলা চলচ্চিত্রের প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে সনামধন্য বেশ কিছু চলচ্চিত্র দেশ ছাড়া বিদেশে ও বীরদর্পে দেশের চলচ্চিত্রে মান ইতিহাসের পাতায় নামাঙ্কিত করে গেছে। ধীরে ধীরে দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গি সিনেমা ঘিরে বদলাতে থাকে। তবে সে পরিবর্তন সুদিকে নয়, বরং সিনেমায় রঙচটা বানোয়াট কমিক দৃশ্যসহ মারকুটে দৃশ্যের ঢল নেমে পড়ে। দর্শক কে লক্ষ্য করে সিনেমাগুলো আসতে থাকলেও ভালো-দর্শক ধীরে ধীরে বিমুখী হতে থাকে সিনেমাহল গুলো থেকে। যুগের পর যুগ এভাবে কেটে যেতে থাকে ব্যবসায়িক বাণ্যিজের খাতিরে নানান ছলচাতুরী ভরা মিথ্যে গল্পের এন্টারটেইনমেন্ট দেওয়ার জোর উদ্দ্যোম। কালের পরিক্রমায় হারিয়ে যেতে থাকে সত্যিকারের বাংলা চলচ্চিত্রের অস্তিত্ব। খুব গুটিকতক ভিন্ন কাজ হলেও সবাই সেটা অগ্রাহ্য করতো নাটিকা বলে অভিহিত করে। তাই বলে কি কেউ বাণিজ্যিক বেড়াজালের বাহিরে বেড়িয়ে আসতে সত্যিকারের নেতৃত্ব দিবে না??? যেথায় আমরা পাবো নাচগান হীন সত্যিকারের সিনেমার স্বাদ???

সেই প্রচেষ্টা নিয়ে এসেছেন পরিচালক বিজন ও তার বন্ধু প্রযোজক আরিফুর রহমান। দীর্ঘ ৮ বছর এই সিনেমার পেছনে বহু নামীদামী বিশ্বনন্দিত চলচ্চিত্র কর্মীবৃন্দদের নিয়ে চলেছে স্মৃতিবিজড়িত ঘাত-প্রতিঘাতের মেলবন্ধনের দীর্ঘ সফর। নানান অজুহাতে সিনে রিলিজ নিয়ে বারবার অন্যের দুয়ারে কড়া নাড়াতেও দ্বিধা করেনি এই সিনেমার টিম। এক প্রকারের নাছোড়বান্দা রূপে তাদের সত্যিকারের কাজ ই পর্দায় নিয়ে আসতে সক্ষম হলো।

আসলে কি এমন বৈচিত্র্য রয়েছে গল্পে? এ কি কোন রূপার থালিতে সাজানো রাশি রাশি নামকরা তারকানির্ভর কাজ?? নাকি এটি উচ্চমার্গীয় অকল্পনীয় কিছু??

না এর কোনটি নয়। সিনেমাটি কিভাবে বেড়ে উঠেছে, তার মধ্যকার গল্প জানার আগে আমরা নাহয় সিনেমার আদতে সামাজিক পারিপার্শ্বিকতার ব্যাপারে জেনে নেই।

প্রত্যেকের জীবনের ই কোন না কোন লক্ষ্য থাকে। সে লক্ষ্যে পৌঁছাতে সবার ই করে যেতে হয় দীর্ঘ অধ্যাবসায়। সে অধ্যাবসায়ের সুযোগ টা কি কিছু অবহেলিত গ্রামের কন্যা শিশুরা পায় কি? পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, দেশে যদিও বাল্যবিবাহ অনেকটা কমে এসেছে। তবে এখনো তা নির্মূল হয়ে যায় নি। এখনো লোকচক্ষুর আড়ালে চলছে, সামাজিক কুসংস্কারাচ্ছন্ন অনিয়মের খেলা। যেথায় পুতুল খেলা বয়সী কন্যার বিয়ের পায়তারা করছে সমাজের লোকেরা। সেথায় শিক্ষিত সমাজ থেকেও ধর্মীয় গোঁড়ামিতে অন্ধ। যার বিরূপ প্রভাব পড়ে সে কিশোরীর শারীরিক জীবনে। শুধু শারীরিক ভাবে নয়, বরং মানসিক ভাবেও চলে নীপিড়নতা।

সমাজের সাথে লড়ে যাওয়া সর্বহারা মায়ের সমাজে টিকে থাকা আসলে কতটা কষ্টের!!!! কেউ খেয়াল করে দেখেছেন কি? আমাদের মনোভাব কখনোই সুদিক ভাবে বিবেচনা করতে চায় না ওদের ঘিরে। প্রত্যেকে তাদের ভোগপণ্য রূপে আত্মসাৎ করার দুর্বার নেশায় মেতে উঠে। যখন অসৎ কর্ম হাসিল করা যায় না, তখন ই তাদের নামে ধর্মীয় গোঁড়ামির জের ধরে সমাজে নানান উপায়ে হেনস্তা করা হয়।

পিতৃপরিচয়হীন পথশিশু, তার কথা ভাবলে বুকটা কেঁপে উঠে। কেননা সমাজ ও এদের গ্রহণ করে নিতে চায় না। এদের পাপের ফল রূপে নিষ্ঠুর ভাবাপন্ন রূপে বিবেচনা করা হয়। সেথায় পথশিশু মনের ইচ্ছের চিরকাল ই মৃত্যু ঘটে। কেননা সে চাইলেও সমাজ তাকে সহজভাবে গ্রহণ করে নেয় না। সমাজে বাঁচার মত বাঁচতে চাইলে সম্মান থাকা চাই, আর সে সম্মান টা পিতৃপরিচয় ছাড়া পাওয়া বড্ড দুর্বার হয়ে দাঁড়ায়। যেথায় তার পরিচয় নিয়ে সংশয়ে মেতে উঠে অন্ধ ধর্মীয় গোড়ামি ব্যক্তিবর্গগণেরা, সেথায় এসব শ্রেণীর শিশুদের শিক্ষাগ্রহণ করা অকূলপাথার হয়ে দাঁড়ায়। কেননা মোরা গল্প শুনে আবেগী হলেও পারতপক্ষে মোরা তাদের কষ্ট দেখলেও সহসা মুখ ফিরিয়ে নি।

সমাজের এই দৃষ্টিগুলো সরলতার ভঙ্গিতে ফুটিয়ে তুলেছেন বিজন তার পরিচালিত “মাটির প্রজার দেশে” সিনেমায়। গল্পে বৈচিত্র‍্যতা আছে কিনা সংশয় নেওয়ার প্রশ্ন ই উঠে না। কেননা এক্ষেত্রে বৈচিত্র‍্যতা নয় বরং তাদের কাজ ই হয়ে দাঁড়িয়েছে সুলিখিত বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের সোনালি পাতায় একেবারে প্রথম সারির কাতারে।

গল্পে লক্ষ্য করা যাবে, জামাল ও লক্ষ্মী নামের দুই শিশুশিল্পী কে। এরা দুজনে খেলার সাথী। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিণতিতে ঐটুকু বয়সে লক্ষ্মীর বিয়ে হয়ে যায়। জামাল হারায় তার একমাত্র খেলার সাথী কে। জামাল খুব ই মিশুক ছেলে। তার অন্য বন্ধুরা স্কুলে গেলেও সে যেতে পারে না। কেননা তার অবস্থান তাকে কখনোই স্কুলে যাওয়ার সুযোগ করে দেয় না। সকল পরিস্থিতির বাঁধা টপকে স্কুলে তার নাম লেখাতে চাইলে, পিতৃ-পরিচয়হীন ছেলে বলে তার ভর্তি খারিজ হয়ে যায়।

আরো বেশকিছু গল্পের আলোকে পরিবেশন করা যেত। তবে আমি চাই না, আপনার সিনেমাটি দেখার আনন্দে ছিটেফোঁটা ভাটা পড়ুক।

গল্পের উল্লেখযোগ্য কিছু ডায়ালগের মধ্যে সেরা ছিলো:- “মা জামাই যদি তোর হাত ধরতে চায়, না করিস না। ধরতে দিস।”

কথাটা খুব সরলতার ভঙ্গিতে শোনালেও আদতে তার অর্থবহতা রঙ খুব ই গাঢ়। যেথায় মা তার কন্যাকে বাসর রাতের পূর্ববতী আভাস জানাচ্ছেন। কেননা তার কন্যা এখনো এসব ব্যাপারে তেমন কিছুই বুঝে না। কারণ সে এখনো শিশু ই রয়েছে। অন্যদিকে মা চরিত্রে নেতৃত্বাধীন নারী তিনি নিজেও পার করে এসেছেন তার কন্যার এই অবস্থার সময় টা। তাই সে আঁচলে চোখের পানি মুছতে মুছতে নির্মম বাস্তবতা মাথানত করে মেনে নিচ্ছে।

অন্যটি হচ্ছে:- “পরকালে আত্মার বিচার হয়, রুহের বিচার হয়। শরীরে হয় না, শরীরডা কিছুই না; মনডাই সব।”

শরীরের জোর দেখিয়ে আমরা কত কি অপরাধ করে যাচ্ছি। আসলে সে শরীর কি কোন স্বাদ গ্রহণ করতে পারে কি? শরীর নিস্তেজ এক বস্তু কেবল। সেথায় প্রাণের সঞ্চার না থাকলে শরীর থেকেও লাভ নেই। পার্থিব দোষত্রুটি জেরা করে পরকালে শাস্তি হবে। তখন কি মোদের শরীর কি সে শাস্তি ভোগ করবে কি????

মাটির প্রজার দেশে গল্পটি আসলে কার?? জামালের, লক্ষ্মীর, ফাতেমার নাকি আব্বাস হুজুরের??? গল্পটি মূলত আমাদের প্রত্যেক মাটির প্রজার। যারা সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে জীবনের সাথে লড়াই করে যাচ্ছে। কেউ হয়তো গাছ থেকে ডালপালা হয়ে বিস্তৃত হচ্ছে আবার কেউ শুষ্ক পাতা হিসেবে ঝড়ে পড়ছে। প্রতিটি চরিত্র আমাদের সমাজের গল্প মেলে ধরেছে। যে চরিত্রগুলো খেলছে বাস্তবতার খেলা। কখনো ছিলো গল্পে নিষ্ঠুর নির্মমতা আবার কোথাও ছিলো অনুপ্রেরণার চিমটি প্রভা।

আমাদের সমাজের রূঢ় গাঢ় বাস্তবতা সিনেমার পরতে পরতে ফুটে উঠেছে অভাবনীয় চিত্রনাট্য রূপে। সেথায় দেখা গিয়েছে সমাজের নিষ্ঠুরতার সাথে মাটির প্রজার কিছু লোকদের শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার কখনো দুর্বার কখনো স্বস্তির প্রচেষ্টা।

সিনেমার সংলাপ গুলো এতটাই সঞ্চারণা জাগালো মন মাঝারে, যেথায় প্রবেশপথ খুলে গমনপথের দিকনির্দেশনা নিয়ে ভাবতে হয় নি।

এই সিনেমার সিনেমাটোগ্রাফি কেবল গ্রামীণ সৌন্দর্য মেলে ধরেছে তা নয়। এটি আমাদের স্বল্প পরিসরের দৃশ্যপটে অপূর্ব সিনেমাটোগ্রাফির ঝলকের মুন্সিয়ানা দেখিয়ে বেড়িয়েছেন। যেথায় সিনেমায় ব্যবহৃত ক্যামেরা শটগুলো রয়েছে পারদর্শীতার ঝলক। এক দৃশ্যপটে, ফাতেমা দৌড়ে বেড়াচ্ছিলো তার ছেলে জামালের সাথে। সেখানের গাছঘেরা খোলা প্রান্তরে শুষ্ক পাতা ছড়িয়ে আছে। অথচ শব্দগ্রহণ কিংবা ক্যামেরার শটে ছিটেফোঁটা ত্রুটি অক্ষিগোচর হবে না। দুজনের পদধূলির সাথে হাঁপানোর শব্দ এমনকি ৩৬০ ডিগ্রী এঙ্গেলের ক্লোস শট সবকিছু মিলে একাকার হয়ে জানান দিচ্ছিলো অভাবনীয় ভুবনভোলানো কাজের। আরেক দৃশ্যপটে লক্ষ্মী যখন পালকি থেকে পালানোর জন্য দৌড় লাগায়। উফফ!!! কি ছিলো সেখানে ক্যামেরা শটের সাথে সিনেমাটোগ্রাফি। চোখে যেন রাতবিরাতে সরষে ফুল দেখার মত অবস্থা। এই অকল্পনীয় ব্যাপার টা তেও মুন্সিয়ানার ঝলকের দেখা মিললো তাদের কাজে। আরেকটি দৃশ্যপট বেশ আরাম দিলো চোখে। আব্বাস হুজুর যখন জামাল কে পাইলট কি জিনিস চেনাচ্ছিলো। তখন রাতের অন্ধকারে রূপালি চাঁদের জোসনার আভা গাছপালা বিদীর্ণ করে আলোর জানান দিয়ে যাচ্ছিলো সে দৃশ্যের। সেথায় বাহ্যিক আলোর প্রয়োজন বোধহয় কখনো হয় না।
এতটাই নিখুঁত শব্দগ্রহণ আপনি অন্য কোন বাংলা সিনেমায় পাওয়া অনেকটা দুষ্কর হবে।

“মাটির প্রজার দেশে” এটি আমাদের সিনেমাজগতের গুটিকতক ইউনিক সিনেমাগুলোর একটি যা নিয়ে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে বলতো পারবো এটি আমাদের সিনেমা। এই সিনেমা পথ টা সুগম করে দিয়েছে সেসব নির্মাতাদের প্রতি যারা মন থেকে এমন সিনেমা দর্শক দের মাঝে পৌঁছাতে চান। কিছু সিনেমা থাকে, যাকে কখনোই স্মৃতি থেকে ভোলা যায় না। বরং এটি নিয়ে আজীবন গর্ব করা যায়। সে সিনেমাটি হচ্ছে “মাটির প্রজার দেশে”

যারা আজো নিকটস্থ সিনেমাহলে মাটির প্রজার দেশে দেখতে পারেন নি। তারা চিন্তা করিয়েন না। মাটির প্রজার দেশের টিম দেশের প্রত্যেক জেলায় সিনেমাটি প্রদর্শন করাবেন। এই সিনেমা হলে এসে দেখার মানে হল, এমন সিনেমা ধারা আমাদের দেশে চলতে থাকুক সেপথে আমরা তাদের উজ্জীবিত করছি।

হ্যাপি ওয়াচিং✌

মুভি রিভিউ লিখেছেনঃ Saifuddin Shakil

[review]

মাটির প্রজার দেশে: বাংলা চলচ্চিত্রে নতুন ধারার জাগরণের দিকনির্দেশনাকারীTankiBazzবাংলাদেশী মুভি রিভিউMatir Projar Deshe
মাটির প্রজার দেশে গল্পটি আসলে কার?? জামালের, লক্ষ্মীর, ফাতেমার নাকি আব্বাস হুজুরের??? গল্পটি মূলত আমাদের প্রত্যেক মাটির প্রজার - মুভি রিভিউ Matir Projar Deshe মুভি ইনফোঃ মুভি : মাটির প্রজার দেশে বিভাগঃ ড্রামা পরিচালকঃ ইমতিয়াজ আহমেদ বিজন প্রযোজনাঃ গুপী বাঘা প্রডাকশন্স প্রধান অভিনেতা - অভিনেত্রী: জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, রোকেয়া প্রাচী, কচি খন্দকার Matir Projar Deshe রিভিউঃ বাংলা...