ডিজনির ‘মোয়ানা (Moana)’ মুভির সেই হিরোটার কথা মনে আছে? ঐ যে ‘মাওয়ি’ নামের ঝাঁকড়া চুল এবং ব্যায়াম করা পেটা শরীর বিশিষ্ট নায়কটা? এই মাওয়িকে আসলে ডিজনি কোম্পানি তৈরি করেছিলো পলিনেশীয় অঞ্চলের মিথলজির এক বিখ্যাত চরিত্রের অনুকরণে। পলিনেশীয় অঞ্চলটা অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত। এই অঞ্চলে ছোট ছোট দ্বীপের সমন্বয়ে যেসব রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো – নিউজিল্যান্ড, হাওয়াই, টোঙ্গা, তাহিতি, সামোয়া ইত্যাদি। এই অঞ্চলের পুরাণে আছে মাওয়ি নামের এক দেবতার বর্ণনা, তার বিভিন্ন কিংবদন্তীর বর্ণনা। এই অঞ্চলের সৃষ্টি হতে শুরু করে এখানকার ইতিহাস ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অনেক কিছুতেই এই দেবতা মাওয়ির প্রভাব রয়েছে। আমাদের আগামী কয়েকটা পর্বে আমরা পলিনেশীয় অঞ্চলের দেবতা মাওয়ির জন্ম হতে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত বিভিন্ন দুরন্ত অভিযানের গল্প ভাগাভাগি করার চেষ্টা করবো আপনাদের সাথে। তো শুরু করা যাক…!

দ্যা লিজেন্ড অব মাওয়িঃ পলিনেশীয় পুরাণের হিরো (পর্ব ১)

দ্যা লিজেন্ড অব মাওয়িঃ পলিনেশীয় পুরাণের হিরো (পর্ব ২)

a

মাওয়ি বনাম দুরন্ত গতির সূর্যঃ
মাওয়ি একবার তার মা-কে প্রচণ্ড বিরক্ত দেখে জিজ্ঞেস করলো, কী হয়েছে। মা বিরক্ত মুখেই জবাব দিলো, সূর্যটা বেশিক্ষণ থাকে না আকাশে। দিনের অংশটা রাতের অংশের চেয়ে অনেক ছোট। ঘরদোরের সব কাজ দিনের বেলায় বসে শেষ করা যায় না। এমনকি সূর্যের আলোয় তার ‘কাপা (গাছের বাকলে তৈরি পোশাক)’-টাও ঠিকমতো শুকোয় না।

মাওয়ি বুঝলো পৃথিবীর মানুষের আসলেই সমস্যা হচ্ছে এতো ছোট দিন নিয়ে। তাই সে সিদ্ধান্ত নিলো সূর্যটাকে বাধ্য করাবে এভাবে হুড়মুড় করে দৌড়ে আকাশের এই প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্তে না গিয়ে আরেকটু ধীরে সুস্থে যেতে। ছক কাটলো কীভাবে সে এই কাজ করবে। সূর্যকে ফাঁস দিয়ে টেনে বেঁধে রেখে পরে বাধ্য করাবে তার কথা শুনতে! তারপরে তার ভাইদের কাছে গিয়ে সাহায্য চাইলো সে। সব শুনে চোয়াল ঝুলে পড়লো ভাইদের। তারা বললো, “গরমের চোটে সূর্যের ধারেকাছেই কেউ যেতে পারে না। সেখানে তুমি তাকে ফাঁস দিয়ে বেঁধে রাখার কথা ভাবছো!”
জবাবে মাওয়ি বললো, “কেন? আমাতে তোমাদের বিশ্বাস নেই? আমি কি তোমাদের অনেক জাদুর কৌশল দেখাইনি? বিভিন্ন ধরণের পাখির রূপ ধরে আমার ক্ষমতা দেখাইনি?”

এই যুক্তির পরে আর কথা চলে না। তাই ভাইয়েরা চললো মাওয়ির সাথে, সূর্যকে বেঁধে-মেরেধরে লাইনে আনার মিশনে। মাওয়ি প্রথমে গেলো তার পূর্বসূরী, দেবী ‘মুরিরাঙ্গা-হোয়েনুয়া’-র কাছে। তার চোয়ালের হাড় নিয়ে আসলো সে। এটাকে দিয়ে সে বানালো এক অস্ত্র। এটাই মাওয়ির বিখ্যাত অস্ত্র ‘মানাইয়াকালানি’। অস্ত্রটা দেখতে বড়শির হুক এবং গদার (Club) মিলিত রূপ। এরপরে মাওয়ি তার ভাইদের সাহায্যে বানালো বিশালে এক দড়ি। সেটার এক মাথায় তৈরি করলো ফাঁস। অতঃপর সবকিছু নিয়ে চললো ‘হালেআকালা’ পর্বতের দিকে। ওখান দিয়ে সূর্য প্রতিদিন আকাশে উঠে। সূর্যের নজরে যাতে না পড়ে যায়, তাই মাওয়ি এবং তার ভাইয়েরা দিনের আলোয় লুকিয়ে থাকতো আর রাতে পথ চলতো। এভাবে তারা পৌঁছে গেলো পাহাড়ের চূড়ায়। সেখানে গিয়ে লুকিয়ে থাকলো সবাই।

সকালে রবি তার ঝলমলে কিরণ নিয়ে পূব আকাশে উঠেই পশ্চিম আকাশ বরাবর ধুন্ধুমার দৌড় শুরু করতে যাচ্ছিলো। কিন্তু আজ হঠাৎ করে পিছুটান পড়লো তার দৌড়ে। তাকিয়ে দেখলো মাওয়ির ছোড়া ফাঁসে আটকা পোড়ে গেছে সে। মাওয়ি এবং তার ভাইয়েরা টেনে-হিঁচড়ে সূর্যকে নিচে নামালো। এরপরে মাওয়ি তার মানাইয়াকালানি গদা দিয়ে শুরু করলো সূর্যকে বেদম পেটানো। ধুন্ধুমার মার খেয়ে অস্থির হয়ে পড়লো সূর্যটা। মাফটাফ চেয়ে বললো, দেবতা মাওয়ি যা চাইবে তাই পাবে।
মাওয়ি বললো, এখন থেকে সূর্যকে ঠিকমতো ডিউটি করতে হবে। তাড়াহুড়া না করে আস্তেধীরে অস্ত যেতে হবে। মানুষকে বেশি করে আলো দিতে হবে তাদের ঘরদোরের সব কাজ ঠিকমতো সারার জন্যে। সূর্য বললো, ঠিক আছে, তাই হবে। সে এখন থেকে বছরের অধিকাংশ সময় পৃথিবীতে বেশি করে আলো ছড়াবে। শুধু সামান্য কিছু সময় সে তাড়াতাড়ি ডিউটি শেষ করে ডুবে যাবে।

রাজি হলো মাওয়ি। সূর্যকে ছেড়ে দিলো আবার। সেই থেকে সূর্য মোটামুটি ঠিকমতো তার দায়িত্ব পালন করে। গরমের দিনে বেশি আলো ছড়ায় সে পৃথিবীতে, আর শীতকালে তাড়াতাড়ি ডিউটিতে ইস্তফা দিয়ে ডুবে যায় সে।

পলিনেশীয় দ্বীপগুলো যেভাবে এলোঃ
মাওয়িকে প্রায়ই টিটকারি হজম করতে হতো তার ভাইদের থেকে, কারণ সে ভালো মাছ ধরতে পারতো না। অন্য ভাইদের থেকে তার ধরা মাছের পরিমাণ অনেক কম হতো। ফলে, একদিন ক্ষেপে গিয়ে সে এসব মজা আর টিটকারীর শোধ তোলার পরিকল্পনা করলো। তার ভাইদের বললো তার সাথে যেতে। আজ সে তাদের ‘উলুয়া’ এবং ‘পিমোয়ি’ নামক দুই মৎস দেবতাকে ধরে দেখাবে। ভাইরা চললো তার সাথে। মাওয়ি তার মানাইয়াকালানি নামক অস্ত্রটাকে সুতার এক মাথায় বেঁধে বানালো বড়শির হুক। তারপরে সেখানে একটা পাখি বেঁধে টোপ ফেললো সমুদ্রে। খানিক বাদেই ভীষণ নড়াচড়া শুরু করলো মাওয়ির ছিপ। সে তার ভাইদের বললো ছিপ টেনে তুলতে তাকে সহযোগিতা করতে। সবাই মিলে ব্যাপক টানাহেঁচড়া শুরু করলো।

খানিক বাদেই দেখলো তারা আসলে ছিপ দিয়ে কোনো মাছ ধরেনি। বরং ছিপের হুকে করে বিশাল একটা দ্বীপ চলে এসেছে। তখন তারা নতুন জায়গায় গিয়ে ছিপ ফেললো। সেখানেও একই কাহিনী। মাওয়ির ছিপের মানাইয়াকালানি হুকে মাছ উঠে না, বরং পুরো দ্বীপ উঠে চলে আসে! এভাবে যেখানেই সে ছিপ ফেলে, একটা করে দ্বীপ উঠে আসে সমুদ্রের অতল জলরাশি থেকে। কোনো কোনো বর্ণনায় অবশ্য আছে, মাওয়ি ইচ্ছে করেই মাছ ধরার নাম করে তার ভাইদের দিয়ে ছিপ টানিয়েছিলো, যাতে নতুন নতুন সব অঞ্চল উঠে আসে এবং মানুষেরা সেখানে বসবাস করতে পারে।

হাওয়াই দ্বীপের আরেক বর্ণনায় আবার পাওয়া যায়, মাওয়ি তার ভাইদের নিয়ে মানাইয়াকালানির হুকে ধরেছিলো এক বিশাল মাছ। এত্ত বিশাল মাছ কোনো মানুষ আর কখনো চোখে দেখেনি। মাওয়ি তখন মাছটাকে তার ভাইদের জিম্মায় রেখে গিয়েছিলো এক পুরোহিতের খোঁজে। পুরোহিত এসে প্রার্থনা করলে পরে মাছটা কেটে সবার মাঝে ভাগ করে দিবে সে। কিন্তু মাওয়ি চলে যাবার পরে ভাইয়েরা সিদ্ধান্ত নিলো, মাছটাকে তারা একাই খেয়ে ফেলবে। তখন সেটাকে কাটতে শুরু করলো তারা, আর সেই বিশাল মাছ গগনবিদারী আর্তনাদ করতে শুরু করলো। সেই আর্তনাদে আশেপাশের বিশাল অঞ্চল ভেঙ্গে পুরো চৌচির হয়ে গেলো। এক এলাকা আরেক এলাকা থেকে আলাদা হয়ে পড়লো। ভূমিকম্পের ফলে জেগে উঠলো অনেক পাহাড় আর আগ্নেয়গিরি। ভাইয়েরা মাওয়ির কথা শুনলে ঐ এলাকার সবাই একসাথে মিলেমিশে থাকতে পারতো। কিন্তু বেশি লোভ করার ফলে এখন সবাই একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে গেলো।

মাওরি, হাওয়াইয়ান, তাহিতিয়ান কিংবা সামোয়ান মিথ অনুযায়ী এভাবেই পলিনেশীয় অঞ্চলের বিস্তৃত এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছিলো অসংখ্য দ্বীপপুঞ্জ।

দ্যা লিজেন্ড অব মাওয়িঃ পলিনেশীয় পুরাণের হিরো (পর্ব ১)

মিথলজি লিখেছেনঃ রিজওয়ানুর রহমান প্রিন্স

দ্যা লিজেন্ড অব মাওয়িঃ পলিনেশীয় পুরাণের হিরো (পর্ব ২)TankiBazzমিথলজিmaui
ডিজনির ‘মোয়ানা (Moana)’ মুভির সেই হিরোটার কথা মনে আছে? ঐ যে ‘মাওয়ি’ নামের ঝাঁকড়া চুল এবং ব্যায়াম করা পেটা শরীর বিশিষ্ট নায়কটা? এই মাওয়িকে আসলে ডিজনি কোম্পানি তৈরি করেছিলো পলিনেশীয় অঞ্চলের মিথলজির এক বিখ্যাত চরিত্রের অনুকরণে। পলিনেশীয় অঞ্চলটা অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত। এই অঞ্চলে ছোট ছোট দ্বীপের...