ডিজনির ‘মোয়ানা (Moana)’ মুভির সেই হিরোটার কথা মনে আছে? ঐ যে ‘মাওয়ি’ নামের ঝাঁকড়া চুল এবং ব্যায়াম করা পেটা শরীর বিশিষ্ট নায়কটা? এই মাওয়িকে আসলে ডিজনি কোম্পানি তৈরি করেছিলো পলিনেশীয় অঞ্চলের মিথলজির এক বিখ্যাত চরিত্রের অনুকরণে।

দ্যা লিজেন্ড অব মাওয়িঃ পলিনেশীয় পুরাণের হিরো (পর্ব ১)

দ্যা লিজেন্ড অব মাওয়িঃ পলিনেশীয় পুরাণের হিরো (পর্ব ২)

maui

আকাশকে ঠেলে উপরে তুলে দেয়ার কাহিনী

তখনো সৃষ্টির শুরুর দিকের কথা। আকাশটা পৃথিবীর একদম মাটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে ছিলো। দেখলে মনে হবে আকাশটা মাটির সাথে প্রায় মিশে আছে। এতো নিচু আকাশের কারণে পৃথিবীর মানুষদের বেশ সমস্যা হচ্ছিলো। অন্ধকারে পরিপূর্ণ ছিলো পৃথিবীর অনেক অঞ্চল। তারা কোথাও হাঁটাচলা করতে পারতো না, ভালোমতো কাজকর্ম করতে পারতো না।

পৃথিবীর মানুষদের এই দুর্দশা দেখে মাওয়ি ভাবলো তাদের জন্যে কিছু একটা করার। সে ঠিক করলো আকাশটাকে ঠেলে অনেক উপরে তুলে দেবে। কিন্তু আকাশটা যে ভারী! সে অর্ধদেবতা হলেও এই কাজ তার একার পক্ষে সম্ভব নয়। তার সাহায্য লাগবে। তাই মাওয়ি চললো তার পিতা, দেবতা মাকেয়াতুতারার খোঁজে। বাবার কাছে গিয়ে বললো সে নিচু আকাশের কথা, পৃথিবীর অন্ধকার সব অঞ্চলের কথা, মানুষদের অসুবিধার কথা। তারপরে প্রস্তাব দিলো আকাশটাকে তুলে অনেক উপরে পাঠিয়ে দিতে তাকে সাহায্য করার জন্যে। মাকেয়াতুতারা রাজি হলো।

প্ল্যান অনুযায়ী প্রথমে মাওয়ি মাটিতে শুয়ে পড়লো। শুয়ে পড়ে দু’হাতে ঠেস দিয়ে ধরলো আকাশটা। এরপরে তার বাবাকে ইশারা করলো। বাবাও একই ভঙ্গীতে শুয়ে পড়ে হাত লাগালো মাওয়ির সাথে। এরপরে আরেক ইশারায় দু’জনে একসাথে ঠেলতে লাগলো আকাশটা উপরের দিকে। ঠেলতে ঠেলতে অনেকখানি উপরে তুলে ফেললো তারা দু’জনে আকাশটা। তাদের ধাক্কায় এতোই উপরে উঠে গিয়েছিলো আকাশ যে, আকাশের দিগন্তগুলো একদম সমুদ্র আর পাহাড়ের ওপারে চলে গিয়ে মানুষের চোখের আড়াল হয়ে গিয়েছিলো। যখন মনে হলো আকাশটাকে যথেষ্ট উপরে উঠানো হয়েছে, মানুষ নির্বিঘ্নে হাঁটাচলা-কাজকর্ম করতে পারবে, তখন তারা ক্ষান্ত দিলো। এভাবেই পিতা-পুত্রের মিলিত শক্তিতে আকাশটা উপরে ঠেলে পৃথিবীটাকে মানুষের বাসযোগ্য করে তুলেছিলো দু’জনে।

সেই থেকে আকাশ গিয়ে মিশেছে সবুজ পাহাড় আর ঘন নীল সমুদ্রের দিগন্তের সাথে। তার দিগন্তগুলো হারিয়ে গিয়েছে পাহাড় আর সমুদ্রের ওপারে, লোকচক্ষুর আড়ালে। এই দিগন্ত হতে ঐ দিগন্তে ছুটে গিয়ে খেলা করে রংধনুরা। এখনো আকাশটা যখন অনেক নিচে নেমে এসে কালো হয়ে বৃষ্টি ঝরায়, তখনো সে ভয়ে ভয়ে বেশ তাড়াহুড়ায় থাকে, কখন জানি মাওয়ি এসে তাকে ধাক্কিয়ে-ঠেলে একেবারে পৃথিবী ছাড়াই করে দেয়!

আগুন আবিষ্কার

কাঁচা মাছ আর কাঁচা শাকসবজি খেতে খেতে মাওয়ির মেজাজ পুরো বিলা হয়ে যাচ্ছিলো। তার মায়ের তৈরি কোনো খাবারই আর তার মুখে রোচে না। এই সময় একদিন তার কানে এলো, প্রাচীন এক অ্যালেই পাখির (Hawaiian gallinule – পলিনেশীয় অঞ্চলের জলাভূমিতে চরে বেড়ানো এক বিশেষ পাখি) কাছে নাকি কী এক জাদু আছে, যেটা দিয়ে খাবারদাবার অনেক সুস্বাদু করে তোলা যায়। এই শুনে মাওয়ি তার ভাইদের নিয়ে চললো সেই পাখির খোঁজে।

খুঁজতে খুঁজতে তারা চলে এলো হালেয়াকালা পর্বতের কাছাকাছি। ক্ষুধা পাওয়ায় সেখানকার লেকে মাছ ধরতে শুরু করলো মাওয়ি এবং তার ভাইয়েরা। এই সময় মাওয়ির চোখে পড়লো হালেয়াকালা পর্বতের চূড়া হতে কেমন ধোঁয়ার মতো উঠছে। এই ঘটনা দেখে সে ভাইদের নৌকার কাছে রেখে গেলো রহস্যের অনুসন্ধান করতে। গিয়ে দেখে বিশাল এক অ্যালেই পাখি পাহাড়ের ধারে এক জলাভূমিতে বসে কীসব বস্তু হাতে নিয়ে ঘষে ঘষে সেখান থেকে আলো তৈরি করছে। পরে সেই আলোতে খাবার পুড়িয়ে খাচ্ছে। মাওয়ি বুঝলো এটাই অ্যালেই পাখি-রূপী সেই প্রাচীন দেবতা, যার কাছে খাবার সুস্বাদু করার ম্যাজিক আছে। সে দেখতে চাইলো পাখিটা কী বস্তু ঘষে ঘষে এভাবে আগুন জ্বালায়। তাই সে ওঁত পেতে বসে রইলো আড়ালে।

এদিকে পাখিটা টের পেয়ে গেছে যে তাকে কেউ অনুসরণ করে তার কাছ থেকে আগুন জ্বালানোর কায়দা শিখে নিতে চাইছে। কিন্তু সে চায় না এই ক্ষমতা কাউকে শেখাতে। তাই সে চুপ করে বসে রইলো। সকাল থেকে দুপুর গড়ালো, দুপুর গড়িয়ে বিকেল, তারপরে সন্ধ্যা, অবশেষে নামলো রাত। কিন্তু কেউ কারো কাছে সারেন্ডার করছে না। মাওয়ি অন্ধকারে আড়ালে খিঁচ মেরে বসে আছে, পাখিটাও ঝিম মেরে ধ্যানমগ্ন হয়ে আছে। পাখিটার ক্ষুধা পেয়েছিলো অনেক। কিন্তু মাওয়ির উপস্থিতিতে আগুন জ্বালাতে চায় না সে। তাই একপর্যায়ে “ইয়াক-ইয়াক” করতে করতে কাঁচা মাছ কতোগুলোই গিলে ফেললো সে।

এভাবে তিন দিন পার হয়ে তৃতীয় দিনের রাত নেমে আসলো। তাও কেউ নড়েচড়ে না নিজ নিজ অবস্থান থেকে। কাঁহাতক আর সহ্য করা যায় এসব ঘাউড়ামি! তখন মাওয়ি এক বুদ্ধি খাটালো। রাতের আঁধারে পাহাড় হতে নিচে নেমে এসে নৌকায় তার ভাইদের নিকট গেলো। সেখানে একটা গাছের গুঁড়িকে ছেঁচে মানুষের আকৃতিতে বানিয়ে তার ভাইদের নিকট রেখে আসলো। দূর হতে অন্ধকারে দেখলে মনে হবে, মাওয়ি তার ভাইদের সাথে নৌকায় বসে আছে। এরপরে চুপিচুপি আবার চলে এলো পাখিটার কাছে। এদিকে টানা তিনদিন ধরে কাঁচা খাবার খেয়ে পাখির জিহ্বার স্বাদ গ্রন্থি উঠে যেতে শুরু করেছিলো। সে পাহাড় থেকে নিচে তাকিয়ে দেখলো মাওয়ি অধৈর্য হয়ে চলে গেছে তার ভাইদের কাছে। নৌকায় বসে আছে। তখন পাখিটা আবার নতুন করে আগুন জ্বালালো। আগুন জ্বালিয়ে সারেনি, মাওয়ি এসে ক্যাঁক করে পাখিটার গলা চেপে ধরলো। তারপরে তাকে জেরা শুরু করলো, আলোটা সে কীভাবে জ্বালিয়েছে সেটা জানতে চেয়ে।

মাওয়ির শক্তিশালী হাতের মুঠোয় পড়ে পাখির দম আটকে যেতে শুরু করলো। তখন সে বললো, জলাভূমি থেকে একগাদা ঘাস এনে জড়ো করো। তারপরে সেগুলো জড়ো করে ঘষতে থাকো। তাতে আগুন ধরবে। মাওয়ি গেলো জলাধারের ঘাস খুঁজতে। কিন্তু যাবার আগে পাখিটাকে খাঁচায় আটকে রেখে গেলো। পাখিটা প্রমাদ গুনলো। সে মাওয়িকে ভুল তথ্য দিয়েছে। ভেবেছিলো মাওয়ি ঘাস খুঁজতে যাবার সুযোগে সে পালিয়ে যাবে। কিন্তু সেই প্ল্যান মাঠে মারা গেলো। মাওয়ি ঘাস খুঁজে এনে পাখির কথামতো হাতের তালুতে রেখে ঘষতে শুরু করলো। কিন্তু যথারীতি কিছুতেই কিছু হয় না। রেগে-মেগে তাই আবারো ক্যাঁক করে চেপে ধরলো পাখিটার গলা। পাখি বুঝলো সত্য বলা ছাড়া তার নিস্তার নেই। তাই অবশেষে সত্যটা বললো সে। চন্দনকাঠ এনে একটার সাথে আরেকটাকে ঘষতে বললো। এবারে কাজ হলো। মাওয়ি জ্বালাতে পারলো আগুন।

কিন্তু সত্যিটা বের করতে পারলেও মাওয়ির মেজাজ চাঙ্গে উঠে বসেছিলো। টানা তিনদিন না খাইয়ে বসিয়ে রেখেছে তাকে পাখিটা। তার উপরে মিথ্যা কথা বলে ধোঁকাবাজিও করতে চেয়েছে। তাই সে রেগে-মেগে পাখিটাকে উপুড় করে আগুনের উপরে ধরলো। এতে পাখিটার চাঁদির পালক সব পুড়ে গেলো। এরপরে আগুন নিয়ে মানুষদের কাছে ফিরে গেলো মাওয়ি।

মাওয়ির মাধ্যমে সেই থেকে মানুষেরা আগুনের ব্যবহার শিখলো। আর সেই থেকেই অ্যালেই পাখিরাও তাদের মাথার চাঁদির সব পালক হারালো। এখনো টেকো-মাথা অবস্থাতেই তাদের পাওয়া যায় জলাভূমিতে বিচরণ করতে!

দ্যা লিজেন্ড অব মাওয়িঃ পলিনেশীয় পুরাণের হিরো (পর্ব ১)
দ্যা লিজেন্ড অব মাওয়িঃ পলিনেশীয় পুরাণের হিরো (পর্ব ২)

মিথলজি লিখেছেনঃ রিজওয়ানুর রহমান প্রিন্স

দ্যা লিজেন্ড অব মাওয়িঃ পলিনেশীয় পুরাণের হিরো (পর্ব ৩)TankiBazzমিথলজিmaui
ডিজনির ‘মোয়ানা (Moana)’ মুভির সেই হিরোটার কথা মনে আছে? ঐ যে ‘মাওয়ি’ নামের ঝাঁকড়া চুল এবং ব্যায়াম করা পেটা শরীর বিশিষ্ট নায়কটা? এই মাওয়িকে আসলে ডিজনি কোম্পানি তৈরি করেছিলো পলিনেশীয় অঞ্চলের মিথলজির এক বিখ্যাত চরিত্রের অনুকরণে। দ্যা লিজেন্ড অব মাওয়িঃ পলিনেশীয় পুরাণের হিরো (পর্ব ১) দ্যা লিজেন্ড অব মাওয়িঃ পলিনেশীয় পুরাণের...