প্রাচীন মানুষেরা আশেপাশের জগত নিয়ে কীভাবে চিন্তা করতো, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় বিভিন্ন পৌরাণিক গ্রন্থে উঁকি মারলে। আমাদের জগতটা কীভাবে, কোথা থেকে এলো কিংবা কোনটা সঠিক, কোনটা ভুল, কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায় – এসব চিন্তাভাবনার পাশাপাশি প্রেম-ভালোবাসা নামক জিনিসটাও অবশ্য কালে কালে মানুষকে ভাবিয়ে এসেছে বেশ। ফলে বিভিন্ন পুরাণে সৃষ্টিতত্ত্ব, ন্যায়-নীতির বিভিন্ন তত্ত্ব নিয়ে আলোচনার সাথে সাথেই উঠে এসেছে প্রেম-ভালোবাসা সম্পর্কিত অনেক কাহিনী, যেগুলো আজও অবিস্মরণীয় হয়ে আছে মানুষের হৃদয়ে। বর্তমানকালে মানুষ বিভিন্ন পুরাণের প্রকৃত উৎস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকা সত্ত্বেও এই সব প্রেমের গল্প-গাঁথার রস আস্বাদন হতে বিন্দুমাত্র পিছু হটেনি।

বিভিন্ন পুরাণের প্রেম কাহিনীগুলোঃ ওসাইরিস এবং আইসিস (মিশরীয় পুরাণ)

আ

তাম্মুজ এবং ইশতার (ব্যাবিলনীয় এবং সুমেরীয় পুরাণ)

প্রাচীন মেসোপটেমিয়ান (আক্কাদীয়, আসিরীয় এবং ব্যাবিলনীয়) সভ্যতায় দেবী ইশতার ছিলো প্রতাপশালী ঈশ্বরদের একজন। দেবতাদের রাজা ‘এনকি’-র কন্যা ছিলো সে। সুমেরীয় পুরাণে ইশতার পরিচিত ছিলো ‘ইনান্না’ নামে। সেমিটিক পুরাণে নাম ছিলো ‘আসতারতে’। বহুকাল পরে এই ইনান্না গ্রীক পুরাণে এসে হয়ে গেলো দেবী আফ্রোদিতি, আর রোমান পুরাণে এসে নামধারণ করলো ভেনাস। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার বিশাল এক জনগোষ্ঠী উপাসনা করতো দেবী ইশতারের। সে ছিলো বিপরীতমুখী বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। একদিকে সে ছিলো ভালোবাসা, যৌনতা এবং উর্বরতার দেবী। অন্যদিকে তাকে উপাসনা করা হতো যুদ্ধ এবং ক্ষমতার জন্যেও। দেবী ইশতার ছিলো অত্যন্ত জটিল মন-মানসিকতার অধিকারী। চিরযৌবনা এই দেবীর আবেগ ভালোবাসা হতে ঘৃণার মতো ধ্বংসাত্মক রূপ নিতে খুব বেশি দেরি করতো না। যে তার বন্ধু ছিলো, তাকে উজাড় করে দেয়ার চেষ্টা করতো সে। আর যে একবার তার প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হতো, তাকে চূড়ান্ত ধ্বংসের মুখোমুখি করে দিতো ইশতার। দেবী আফ্রোদিতিকেও ঠিক এভাবেই চরিত্রায়ন করা হয়েছিলো গ্রীক পুরাণে।

ইশতারের এমন বিপরীতমুখী চরিত্রের উপযুক্ত উদাহরণ দেয়া যায় গিলগামেশের উপাখ্যান হতে। গিলগামেশের বিভিন্ন বীরত্ব গাঁথায় মুগ্ধ হয়ে দেবী ইশতার তার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলো। তাকে প্রেম নিবেদন করে বসেছিলো। কিন্তু গিলগামেশ জানতো দেবী ইশতারের খামখেয়ালী মেজাজ সম্পর্কে। ভালোবাসা মুহূর্তেই ঘৃণায় পরিণত হতে সময় নেয় না তার। তাই সে প্রত্যাখ্যান করেছিলো দেবী ইশতারের প্রেমের প্রস্তাবকে। ক্ষেপে গিয়ে ইশতার গিলগামেশের পেছনে লেলিয়ে দিয়েছিলো স্বর্গের এক ক্ষ্যাপা ষাঁড়কে। সেই ষাঁড়কে অসীম বীরত্বের সাথে বধ করে গিলগামেশ এবং তার সহচর এনকিদু সেই যাত্রায় কোনোমতে জান নিয়ে পালিয়ে বেঁচেছিলো ইশতারের হাত থেকে।

তবে আজ আমরা যে গল্পটা বলবো, তা হচ্ছে ইশতার এবং তার স্বামী ‘তাম্মুজ’-এর গল্প। দেবতা তাম্মুজ হচ্ছে সুমেরীয় পুরাণের খাদ্য এবং শস্যের দেবতা। আরবের মতো সেমিটিক দেশগুলোতে তাম্মুজ ‘দুমুজিদ’ নামে পরিচিত। কৈশোরে থাকাকালীনই দেবী ইশতারের সাথে তাম্মুজের প্রেম হয়েছিলো। পরে বড় হয়ে তারা বিয়ে করে। তাম্মুজ এবং ইশতারের এই গল্পের দুইটা সংস্করণ আছে। একটা ব্যাবিলনীয় সংস্করণ। আরেকটা সুমেরীয় সংস্করণ। প্রথমে আমরা ব্যাবিলনীয় সংস্করণটার দিকেই যাচ্ছি।

দেবী ইশতারের স্বামী দেবতা তাম্মুজ যৌবন পেরুতে না পেরুতেই একবার পাতালের ভয়ংকর এক প্রাণীর সাথে লড়াইয়ে প্রাণ হারিয়েছিলো। ফলে তার ঠাঁই হলো পাতালপুরীর মৃতদের সাথে। স্বামীর বিরহ ব্যাথায় ইশতার শোকে কাতর হয়ে পড়লো। সে প্রচণ্ড ক্ষেপে গিয়ে জিদ ধরলো তাম্মুজকে পাতাল হতে উদ্ধার করে নিয়ে আসবে। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। ইশতার রওনা করলো পাতালের উদ্দেশ্যে।

পাতাল শাসন করতো ইশতারেরই আরেক বোন ‘ইরেশকিগাল’। সেই রাজ্যে জীবিতদের ঢোকা নিষেধ। ইশতার গিয়ে দেখলো পাতালপুরীর দরজা বন্ধ। সে ভীষণ চেঁচামেচি শুরু করে দিলো। প্রহরী যথারীতি নির্বিকার রইলো। কানে তুললো না ইশতারের চেঁচামেচি। এক পর্যায়ে ইশতার ধমকি দিয়ে বললো, “যদি গেট না খোলা হয়, তবে সে ভেঙ্গেচুরে খানখান করে ফেলবে গেটটাকে। তখন পাতাল রাজ্যের সমস্ত মৃতকে বাঁধ দিয়ে ঠেকিয়েও জীবিতদের রাজ্যে ঢুকে পড়া আটকানো যাবে না”। সমস্ত পুরাণে ইশতার বিখ্যাত তার এই ধমকির জন্যেই। বেচারা প্রহরী এবারে ভয় পেয়ে দৌড়ালো অন্ধকার রাজ্যের সম্রাজ্ঞী ইরেশকিগালের কাছে। তাকে বললো সব কথা। দেবী ইশতার এসে ভীষণ হাঙ্গামা লাগিয়ে দিয়েছে পাতালের প্রবেশ মুখে!

শুনে ক্ষেপে গেলো ইরেশকিগাল। তবে সে শান্তভাবে প্রহরীকে হুকুম দিলো ইশতারের জন্যে গেট খুলে দেয়ার। সেই সাথে বলে দিলো, “তার সাথে সেভাবেই আচরণ করবে, যেভাবে মৃতদের সাথে আচরণ করো”। মূল ফটকের প্রহরী আদেশ পেয়ে বিদায় নিলো। গিয়ে খুলে দিলো সদর দরজা। ইশতার ঢুকলো ভেতরে। এই অন্ধকারের রাজ্যে এই প্রথম জীবিত কেউ ঢুকতে পেরেছে। কিন্তু সে ঢুকতে না ঢুকতেই প্রহরী তার গলার হার কেড়ে নিলো। ইশতার শুধালো, এমনটা করার কারণ কী?
প্রহরী জানালো, সম্রাজ্ঞীর হুকুম তোমার সাথে মৃতদের মতোই আচরণ করার। আর মৃতদের থেকে এগুলো নিয়ে নেয়ার নিয়ম এখানে।

ইশতার ভ্রুক্ষেপ করলো না খুব একটা। হেঁটে চললো সামনে ভয়ানক আঁধার ঠেলে। সামনে পড়লো আরেকটা দরজা। সেখানকার প্রহরীও তাকে ঢুকতে বাধা দিলো না। তবে সে টান দিয়ে নিয়ে রেখে দিলো ইশতারের কানের দুল। এভাবে করে একে একে সাতটা গেট পেরুলো ইশতার। প্রতি গেটের প্রহরীই একটা করে জিনিস নিয়ে রেখে দিলো নিজের কাছে। যখন সে সপ্তম এবং সর্বশেষ গেট পার হলো, তখন শরীরের শেষ সম্বল পরিধেয় বস্ত্রটুকুও নিয়ে নিলো প্রহরী। পুরো নগ্ন হয়ে পড়লো ইশতার। সেই নগ্ন শরীর নিয়েই দাঁড়ালো তার বোন, পাতাল রাজ্যের সম্রাজ্ঞী ইরেশকিগালের কাছে। দাবী করলো তার স্বামী তাম্মুজের মুক্তির।

ভীষণ অট্টহাসি হেসে ইরেশকিগাল জানালো, একবার যে এই রাজ্যে ঢুকে, সে আর কখনো বের হতে পারে না। ইশতারেরও এখন এমন পরিণতিই ঘটবে। সাথে সাথেই ইরেশকিগাল ইশারা করলো আর ‘নামতার’ নামের এক ভয়ংকর প্রাণী এসে দাঁড়ালো ইশতারের পাশে। তাকে পরিণত করলো নিকষ কালো মাটি আর কাদার শরীরে। তার দু’হাত পালটে হয়ে গেলো পাখিদের ডানার মতো, আগাগোড়া পালকে ভর্তি। তাকে নিয়ে ফেলে রাখা হলো মৃতদের সাথে, গহীন আঁধারে।

এদিকে ভালোবাসা ও উর্বরতার দেবী ইশতারের অনুপস্থিতিতে চরম দুর্যোগ নেমে এলো পৃথিবীতে। প্রেম-ভালোবাসা কমে গেলো, গাছপালা সব শুকিয়ে মরে যেতে লাগলো, দেখা দিলো খরা। দেবতা ‘পাপসুকাল’ দেখলো পৃথিবীর অবস্থা শোচনীয়। সে ছুটে গিয়ে খবর দিলো দেবতা এনকিকে। বললো, ইশতার পাতাল রাজ্যে আটকা পড়েছে। তার অভাবে পৃথিবী এখন মরতে বসেছে। একথা শুনে এনকি একটা লিঙ্গ হীন প্রাণী বানালো, যার নাম ‘আসু-শু-নামির’। তাকে পাঠালো পাতালপুরীতে বার্তাবাহক হিসেবে। দেবতাদের রাজা এনকির পাঠানো প্রাণী, তার উপরে অন্য কারো খবরদারি চলে না। ফলে প্রাণীটা অনায়াসেই ঢুকে পড়লো আঁধারের রাজ্যে। গিয়ে দাঁড়ালো ইরেশকিগালের সামনে। দাবী করলো ইশতারকে ছেড়ে দিতে। সেই সাথে তাম্মুজকেও।

ইরেশকিগাল কতক্ষণ ভীষণ রাগে নেচে-কুঁদে বেড়ালো। কিন্তু একপর্যায়ে বুঝলো, লাভ নেই! পিতা এনকির দাবীর সামনে মাথা নোয়াতেই হবে। তাই সে প্রহরীদের দিয়ে আনালো ইশতার এবং তাম্মুজকে। তাদের গায়ে ছিটালো জীবনামৃতের জলের ফোঁটা। তাতে মৃত হতে পুনরায় জীবিত হয়ে উঠলো দু’জনেই। তাদের ফিরে যেতে দেয়া হলো পৃথিবীতে। ফিরে যাবার সময় ইশতারকে প্রত্যেক প্রহরী ফিরিয়ে দিলো যা যা ছিনিয়ে নিয়েছিলো। অপরূপ সাজে সজ্জিত হয়ে সে তার স্বামী তাম্মুজের সাথে ফিরে এলো পৃথিবীতে। পৃথিবী আবার হয়ে উঠলো সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা।

ইশতারের পাতালে ঢুকার সময়ে একের পর এক পরিধেয় জিনিস হারানোকে তুলনা করা হয় ঋতু পাল্টানোর সময় প্রকৃতির রূপ ও সৌন্দর্য হারানোর সাথে। আর তাম্মুজের সাথে তার পৃথিবীতে ফিরে আসাকে তুলনা করা হয় বর্ষা আসতে আসতে প্রকৃতির আবার নবরূপে শোভিত হবার সাথে। ইহুদী ক্যালেন্ডারে ‘তাম্মুজ’ হচ্ছে খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডারের জুলাই মাস। এই সময়টাকে ধরা হয় চাষাবাদের জন্যে উর্বর কাল হিসেবে।

সুমেরীয় সংস্করণ:

এই সংস্করণে বলা হয়, ইশতার আসলে পাতালে গিয়েছিলো বোনকে উৎখাত করে নিজেই সেখানকার সম্রাজ্ঞী হয়ে বসতে। কিন্তু তাতে সে ব্যর্থ হয় আর ইরেশকিগাল তাকে মৃত বানিয়ে বন্দী করে রাখে। পরে এনকির দাবী অনুযায়ী ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় তাকে। কিন্তু একটা শর্তে। তার বিনিময়ে আরেকটা আত্মাকে রেখে যেতে হবে পাতালে। সেই আত্মাকে সাথে নিয়ে আসার জন্যে ইশতারের সঙ্গে পাঠানো হয় ‘নামতার’ নামক ঐ মৃত্যু দূতকে। ইশতার পৃথিবীতে ফিরে এসে দেখে তার স্বামী তাম্মুজ স্ত্রীর কথা ভুলে গিয়ে বেশ সুখেই দিনযাপন করছে। যে সিংহাসনে ইশতার বসে, সেখানে বসে আছে তাম্মুজ। এটা দেখে সে ক্ষিপ্ত হয়ে নামতারকে বলে তাম্মুজই তার বদলে পাতালে থাকবে। নামতার ধরে নিয়ে যায় তাম্মুজকে পাতালে।

পরে ভীষণ অনুশোচনায় ভুগতে থাকে ইশতার। তাম্মুজের বিরহ ব্যাথায় কাতর হয়ে পড়ে। কী করবে সে ভেবে পায় না। এদিকে তাম্মুজের বোন ‘গেশতিনান্না’ ভাইয়ের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে ইশতারকে বলে কিছু একটা করতে। ইশতার গেশতিনান্নার সাথে আলোচনা করে পরে পাতালে যায়। সেখানে গিয়ে ইরেশকিগালের সাথে চুক্তি করে বছরে ছয় মাস তাম্মুজকে পৃথিবীতে থাকার অনুমতি দিতে। সেই ছয় মাস তাম্মুজের বোন গেশতিনান্না পাতালে থাকবে। ছয় মাস পরে তাম্মুজ আবার ফিরে আসবে তার স্থানে। ইরেশকিগাল মেনে নিলো এই চুক্তি।

ফলে বছরে ছয় মাস যখন তাম্মুজ পৃথিবীতে ফিরে এসে মিলিত হবার সুযোগ পায় তার স্ত্রী ইশতারের সাথে, পৃথিবী ভরে উঠে ফুলে-ফলে-ফসলে। আর বাকি ছয় মাস প্রকৃতি থাকে নিষ্প্রাণ। ইশতার ও তাম্মুজের মিলনের সময়টাকে তাই পালন করা হতো মহাসমারোহে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অনেক বিশেষজ্ঞ ধারণা করেন খ্রিস্টানদের ইস্টার উৎসবের অরিজিন হচ্ছে প্যাগানদের ইশতারের এই উৎসবটা। ইহুদীরা তাম্মুজের নামে উৎসব পালন করে। পরে হয়তো সেখান থেকে কোনোভাবে ক্রিশ্চিয়ানিটির ভেতরেও প্রবেশ করেছে ইস্টার উৎসব, যার নামকরণ “সম্ভবত” হয়েছে ইশথারের নাম হতে।

তথ্যসূত্রঃ
—————
১। https://en.wikipedia.org/wiki/Ishtar
২। https://en.wikipedia.org/wiki/Tammuz_(deity)
৩। http://www.newworldencyclopedia.org/entry/Ishtar
৪। http://www.sacred-texts.com/ane/mba/mba11.htm

লিখেছেন – রিজওয়ানুর রহমান প্রিন্স

বিভিন্ন পুরাণের প্রেম কাহিনীগুলোঃ তাম্মুজ এবং ইশতার (ব্যাবিলনীয় এবং সুমেরীয় পুরাণ)TankiBazzমতামতIshtar mythology,myths of babylonia and assyria
প্রাচীন মানুষেরা আশেপাশের জগত নিয়ে কীভাবে চিন্তা করতো, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় বিভিন্ন পৌরাণিক গ্রন্থে উঁকি মারলে। আমাদের জগতটা কীভাবে, কোথা থেকে এলো কিংবা কোনটা সঠিক, কোনটা ভুল, কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায় - এসব চিন্তাভাবনার পাশাপাশি প্রেম-ভালোবাসা নামক জিনিসটাও অবশ্য কালে কালে মানুষকে ভাবিয়ে এসেছে বেশ। ফলে বিভিন্ন...