গ্রিক ও রোমান মিথলজির পাশাপাশি সুমেরীয়, ব্যবিলনীয় কিংবা নর্স মিথলজি নিয়েও মানুষের আগ্রহের কমতি নেই। কিন্তু গ্রিক, রোমান কিংবা ভারতীয় মিথলজিগুলো অন্যান্য সব মিথলজির থেকে বেশি প্রচার পেয়েছে, কারণ এগুলো বেশ ভালোমতোই লিপিবদ্ধ করা হয়েছিলো। অন্যদিকে বাকি মিথলজিগুলো খেয়াল করলে দেখা যায়, এগুলো এতো পুরাতন যে সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। কিংবা লিপিবদ্ধ করা হলেও এগুলো এতোকাল আগের ছিলো যে কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে লেখাগুলো।

 

a

 

নর্স মিথলজিও শুরুতে মুখে মুখেই প্রচলিত ছিলো নর্ডিক দেশসমূহ, বিশেষত প্রাচীন জার্মানির মানুষের মাঝে। কিন্তু বহুকাল পেরিয়ে গেলেও সেগুলো লিপিবদ্ধ করা হয়ে উঠছিলো না। কারণ, গ্রিস-রোম-ভারতবর্ষের মতো তেমন লিখিত ভাষার চর্চা সেখানে ছিলো না। ফলে কবিতা চর্চাও সেখানে হচ্ছিলো না। “সম্ভবত” ভাইকিংরা বেশিরভাগ সময়েই ব্যস্ত ছিলো মুখে লম্বা চুল-দাড়ি রাখাতে, আর বাকি সময় ব্যস্ত ছিলো একে-অপরের মুখের লম্বা চুল-দাড়ি টেনে ছিঁড়তে। তাই লেখালেখিটা ঠিক হয়ে উঠছিলো না তাদের। পরে যখন রোমান সাম্রাজ্যের মাধ্যমে রোমান হরফের সাথে পরিচয় ঘটে তাদের, তখন ধীরে ধীরে লিপিবদ্ধ করা শুরু হয় নর্স পুরাণের গল্পগুলো। এখন যেসব নর্স পুরাণের গল্প আমরা শুনে থাকি, সেগুলোর অধিকাংশই লিখিত হয়েছিলো ৮০০ – ৯০০ খ্রিস্টাব্দের মাঝে। অনেক কাহিনী ১৪০০ খ্রিস্টাব্দের পরেও এসে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিলো। ফলে খ্রিস্টের জন্মের পূর্বে নর্স পুরাণের কাহিনীগুলো, কিংবা সেগুলোর দেবদেবীরা যেভাবে পরিচিত ছিলো নর্ডিক দেশগুলোতে, তার অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তার উপরে এসে ভিড়েছে গ্রিক ও রোমান মিথলজির আধিপত্য। ফলে, সেগুলোর কিছু রূপ-রস-গন্ধও ঢুকে পড়েছে এখনকার নর্স পুরাণের কাহিনীগুলোর মাঝে। শুধু তাই নয়, ক্রিশ্চিয়ানিটির অনেক ধারণাও অনুপ্রবেশ করেছে এতে।

অনুপ্রবেশ হয়তো হয়েছে। কিন্তু নর্স মিথলজি তার স্বকীয়তা কিংবা মেজাজ হারায়নি। এখনো পৌরাণিক কাহিনীর জগতে জনপ্রিয় সব সংস্কৃতির জনপ্রিয় সব পুরাণের সাথে সমানে সমান পাল্লা দিয়ে চলেছে সে। মনোযোগী পাঠকমাত্রই খেয়াল করে দেখবেন, বাকি সব পুরাণের থেকে নর্স পুরাণের মেজাজটা একটু আলাদা। আমরা মিথলজি পেইজ হতে এর আগে নর্স মিথলজির বিভিন্ন কাহিনী নিয়ে একটা বিশাল সিরিজ লিখেছিলাম। আগ্রহীরা সেগুলো পড়ে দেখতে পারেন। পেইজের ‘নোটস’ সেকশনে গেলেই পাবেন। কোনো সমস্যা হবে না আশা করি।

আর এখন আমরা শুরু করবো নর্স মিথলজি নিয়ে নতুন আরেকটা সিরিজ। এখানে নর্ডিক পুরাণের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দেবদেবীকে নিয়ে আলোচনা করবো আমরা। ভিতরে ঢুকে দেখবো এই চরিত্রগুলোর। বুঝতে চেষ্টা করবো, সেই প্রাচীন নর্ডিক মানুষজন কীভাবে এবং কী উদ্দেশ্য নিয়ে এই ক্ষমতাধর পৌরাণিক চরিত্রগুলোকে কল্পনা করেছিলো। আসুন, যোগ দিন আমাদের সাথে।

———————–
দেবরাজ ওডিন
———————–
বর্তমানে মিথলজি সম্পর্কে কিঞ্চিত জ্ঞান আছে, এমন মানুষও দেবরাজ ওডিনকে বেশ ভালোমতো চিনে থাকবেন। কিংবা মিথলজি সম্পর্কে জানা না থাকুক, অন্তত মার্ভেল কমিক্স ও মার্ভেল সিনেম্যাটিক ইউনিভার্স সম্পর্কে ধারণা আছে, তারাও ওডিনকে চিনেন কিছুটা। তারপরও যারা সবেমাত্র গর্ত থেকে বেরিয়েছেন বাইরের দুনিয়ার হাল-হকিকত সম্পর্কে একটু খোঁজখবর নিতে, এবং গর্ত থেকে বেরিয়েই এই লেখার সামনে এসে পড়েছেন, তাদের উদ্দেশ্যে একটু ওডিনকে পরিচয় করিয়ে দিই।

নর্স পুরাণে ‘ওডিন (Odin)’ হচ্ছেন দেবতাদের দেবতা। গ্রিক পুরাণে যেমন ‘জিউস’, তেমনি জার্মানীয় পুরাণে হচ্ছেন ওডিন। তাকে বেশিরভাগ সময়েই কল্পনা করা হয় বুড়ো দাদুর মতো চেহারারূপে। মাথাভর্তি তার সাদা চুল আর মুখভর্তি লম্বা-সাদা দাড়ি। তার এক চোখ অন্ধ। তাই তাকে এক চোখে কালো পট্টি পরিহিত অবস্থায় চিত্রায়িত করা হয় সাধারণত। নর্ডিক কাহিনীগুলোতে তিনি মাথায় উইজার্ডদের মতো লম্বা কালো টুপি আর গায়ে লম্বা-কালো এক আলখাল্লা চড়িয়ে ঘুরে বেড়াতেন বলে বর্ণনা দেয়া হয়। এর বাইরে, মাথায় ভাইকিং হেলমেট এবং শরীরে বর্ম পরিহিতাবস্থায় যুদ্ধসাজেও তাকে কল্পনা করা হয় সময়ে সময়ে। অর্ধদানব এবং অর্ধঈশ্বর দম্পতি ‘বেস্তলা’ ও ‘বর’-এর সন্তান হচ্ছেন দেবরাজ ওডিন।

নর্স, বিশেষত জার্মানরা তাকে ডাকতো ‘ওয়াডানাজ (Wo3anaz)’ নামে। এই নাম থেকেই ‘Wednesday’ শব্দটার উৎপত্তি। এই দিনটা হচ্ছে ওডিনের দিন, তার নামে উৎসর্গীকৃত। এছাড়াও আরো অনেক নাম প্রচলিত আছে তার। কারণ, তিনি ছিলেন শেইপশিফটার, অর্থাৎ সময়ে সময়ে প্রয়োজনানুযায়ী বিভিন্ন আকার ধারণ করতে পারতেন। টোলকিয়েন তাঁর ‘লর্ড অব দ্যা রিংস’ এবং ‘হবিটস’ নামক বিশ্বখ্যাত ক্লাসিক বইগুলোতে ‘গ্যানডালফ’ নামে যে চরিত্র তৈরি করেছিলেন, সেটা অনেক ক্ষেত্রেই দেবতা ওডিনের চরিত্র ও আকার-অবয়ব দ্বারা প্রভাবিত।

জার্মানীয় পুরাণে তিনি যুদ্ধের দেবতা হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিচিত। ভাইকিংরা দেবতা ওডিনের উপাসনাই সবচেয়ে বেশি করতো। যুদ্ধে বীরের মতো প্রাণ বিলিয়ে দেয়ার মাধ্যমে পরলোকে ‘ভালহাল্লা (Valhalla)’-য় দেবতা ওডিনের সাথে বসে সুরা পান আর ভোজ উৎসব করার স্বপ্ন দেখতো তারা। যুদ্ধের যত কলাকৌশল আছে, সেগুলোর জ্ঞান দেবতা ওডিনের কাছে আছে বলে তারা বিশ্বাস করতো।

কিন্তু এর বাইরেও ওডিনের আরো অনেক ক্ষমতার বর্ণনা আছে নর্ডিক পুরাণে। তাকে পৃথিবীর সকল জ্ঞানের উৎস বলেও ধারণা করা হতো। দেবতাদের মাঝে সবচেয়ে জ্ঞানী তিনিই। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের তাবৎ কিছু সম্পর্কে জ্ঞাত তিনি। তার এই জ্ঞানার্জন নিয়েও এক বিশাল কাহিনী আছে, যেটায় আমরা প্রসঙ্গক্রমে আসবো একটু পরেই (কিংবা এর আগে পেইজে লিখিত নর্স পুরাণের গল্পগুলোও পড়ে দেখতে পারেন)। এছাড়াও তাকে জাদু, সুস্বাস্থ্য, মৃত্যু, কবিতাচর্চা এবং জাদুকরি সব বর্ণমালার দেবতা হিসেবেও দেখা হয়।

নর্স মিথলজি সম্পর্কে পড়তে গেলেই জানবেন, তাতে ‘এইসার’ এবং ‘ভানির’ নামক দুইটা গোত্রের উল্লেখ আছে। দেবরাজ ওডিন ছিলেন এইসার গোত্রীয় দেবতা। বিশ্বব্রহ্মান্ডের উৎপত্তি এবং ধ্বংসের ব্যাপারে তিনি সরাসরি জড়িত। মানুষ সৃষ্টির সাথেও জড়িয়ে আছেন তিনি। আগামী পর্বগুলোতে আমরা এই ব্যাপারগুলো ধীরে ধীরে জানবো।

(চলবে….)

লিখেছেন – রিজওয়ানুর রহমান প্রিন্স

TankiBazzমিথলজিনর্স পুরাণের দেবদেবীর কাহিনিঃ দেবরাজ ওডিন - ০১
গ্রিক ও রোমান মিথলজির পাশাপাশি সুমেরীয়, ব্যবিলনীয় কিংবা নর্স মিথলজি নিয়েও মানুষের আগ্রহের কমতি নেই। কিন্তু গ্রিক, রোমান কিংবা ভারতীয় মিথলজিগুলো অন্যান্য সব মিথলজির থেকে বেশি প্রচার পেয়েছে, কারণ এগুলো বেশ ভালোমতোই লিপিবদ্ধ করা হয়েছিলো। অন্যদিকে বাকি মিথলজিগুলো খেয়াল করলে দেখা যায়, এগুলো এতো পুরাতন যে সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করা...