রাতের আঁধার যখন মুছে যাওয়ার পথে, পৃথিবীকে একটু পরেই যখন সূর্যের আলো ছোঁবে, তখন সুবিশাল এক পাখি আপন মনে তৈরি করে যাচ্ছে তার বাসা। অতি যত্নে সে বাসা বানাচ্ছে মশলার কোয়া, লবঙ্গ আর ডালপালা দিয়ে। পাখিটির চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, অথচ কী সুন্দরই না সে দেখতে!

একটু পড় যখন সূর্য উঠল, পাখিটি তার বিশাল দুটো ডানা ছড়িয়ে দিল। লাল আর সোনালি রঙের ডানা ঝকমক করে উঠল রোদের আলোয়। পাখিটি গাইতে শুরু করল বিষণ্ণ এক গান। সূর্যদেবতা থমকে দাঁড়ালেন। কান পেতে রইলেন সুমধুর কণ্ঠের দিকে। স্বর্গ থেকে বিচ্ছুরিত হল এক স্ফুলিঙ্গ, এসে পড়ল পাখিটির বাসায়। মুহূর্তে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল বাসাটি, আগুন গ্রাস করে নিল পাখিটিকে।

কিন্তু… তিনদিন পর ওই দেখ! পাখিটি ফের জীবিত হয়ে উঠল। নিজের পুড়ে যাওয়া দেহের ছাই থেকে পুনর্জন্ম হল বিশাল ফিনিক্স পাখিটির।

Phoenix

খোঁজাখুঁজি সিরিজঃ ফিনিক্সের খোঁজে (পর্ব ১)

ফিনিক্স পাখি আদতে কী?
গ্রিক পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী ফিনিক্স একটি অতিকায় পাখি, যার আয়ু অত্যন্ত দীর্ঘ। কিছু উৎসে উল্লেখ করা আছে এটি ৫০০ বছর পর্যন্ত বাঁচে, আবার কিছু উৎস অনুযায়ী ফিনিক্সের আয়ু ১০০০ বছর। তবে এটা তার মূল বিশেষত্ব নয়। ফিনিক্স যে কারণে বিখ্যাত সেটা হল ৫০০ বা ১০০০ বছর পরপর সে মারা যায়, আবার মৃত্যু থেকে পুনর্জীবিত হয়ে উঠে। অন্যভাবে বললে, মৃত্যুর পর ফিনিক্স পুনরায় জন্মগ্রহণ করে।

ফিনিক্স পাখিটি দেখতে কেমন?
প্রাচীন এবং মধ্যযুগের বেশ কিছু ছবিতে ফিনিক্স পাখির মাথার চারপাশে জ্যোতিশ্চক্র বা বলয় দেখা যায়। এ থেকে পাখিটির সাথে সূর্যের সম্পর্ক বুঝা যায়। একদম প্রথম দিককার আঁকা ফিনিক্সের ছবিতে এই বলয়ের চারপাশে সাতটা রশ্মিও দেখা গেছে। সাত রশ্মি বিশিষ্ট বলয় দেখা যায় গ্রিক পুরাণের হেলিওস চরিত্রে, যে কিনা ছিল সূর্য।

যদিও ধারণা করা হয় ফিনিক্স একটা রঙবেরঙের পাখি, কিন্তু ঠিক কোন রঙ তার দেহে ছিল, সেটা সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায় না। রোমান ইতিহাসবিদ ‘ট্যাসিটাস’ শুধু লিখে গেছেন, ফিনিক্সের রঙ একে অন্যান্য পাখি থেকে আলাদা করে তুলেছে। অনেকে বলেন, ফিনিক্সের রঙ নাকি ময়ূরের মত ছিল। কিন্তু গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস বলেছেন অন্য কথা। তার মতে, পাখিটির রঙ ছিল লাল, সাথে হলুদ কিংবা সোনালি। এই রঙের ফিনিক্সের ছবি আমরা বিভিন্ন চিত্রকলায় দেখতে পাই। খ্রিস্টপূর্ব সময়ের ইহুদী কবি এজেকিয়েল বলেছেন, ফিনিক্সের ছিল লাল পা আর চকচকে হলুদ চোখ। কিন্তু রোমান লেখক ল্যাক্টানশিয়াস বলছেন, এর চোখ ছিল নীলকান্তমণির মত ঝকঝকে নীল, আর পা ছিল হলুদ-লাল আঁশ দিয়ে ঢাকা। পাখিটির নখর ছিল গোলাপি।
হেরোডোটাস ফিনিক্সকে ঈগল পাখির আকৃতির বলে গেছেন। কিন্তু ল্যাক্টানশিয়াসের মতে, এটি ছিল উটপাখির সমান।

ফিনিক্স পাখির বসবাস কোথায়?
ফিনিক্স পাখির প্রকৃত বসবাস কোথায়, এ বিষয়ে যথেষ্ট মতভেদ আছে। হাজার বছরের পুরনো গল্প তো, লোকমুখে একেকবার একেক জায়গার কথা উঠে এসেছে। তবে পাখিটির বাসস্থান হিসেবে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় জায়গা হল প্যারাডাইস। একে স্বর্গের বিকল্প হিসেবেও ভাবা হয়। প্যারাডাইস অবস্থিত সূর্যের পেছন দিক দিয়ে যেতে যেতে যেতে যেতে আরও বহুদূরে। আবার কিছু ক্ষেত্রে ফিনিক্সের বাসা বলা হয়েছে হেলিওপোলিস নামক জায়গায়। হেলিওপোলিস হল সূর্যের (যার গ্রিক নাম হেলিওস) বাসস্থান।

আবার গ্রিক রূপকথা অনুযায়ী, ফিনিক্সের বাস ছিল আরব দেশের কোনো এক কুয়োর পাশে। পাখিটি প্রতিদিন সূর্যোদয়ের সময় কুয়োতে নেমে স্নান করত আর সুমধুর কণ্ঠে গান গাইত। এই গান শুনে সূর্যদেবতা স্বয়ং অ্যাপোলো তার রথ থামিয়ে কান পেতে রইতেন।

ফিনিক্স পাখির গল্প এল কোথা থেকে?
গ্রিক পুরাণ হতেই মূলত ফিনিক্স পাখি জনপ্রিয় হয়েছে। কিন্তু প্রাচীন মিশরীয় পুরাণকে অনেক বোদ্ধা ফিনিক্স পাখির উৎপত্তিস্থল বলে মনে করেন। দুটো সভ্যতায়ই ফিনিক্স পাখির মত একই রকম গল্প চালু আছে। তবে প্যাঁচ হল, মিশরীয় লিপিগুলোতে স্পষ্ট করে কিছু লেখা নেই এই পাখি সম্পর্কে। তাই গ্রিক পুরাণকেই এখন পর্যন্ত ফিনিক্স পাখির উৎপত্তিস্থল হিসেবে গণ্য করা হয়।

(আসছে পর্ব ২)

লিখেছেনঃ নির্ঝর রুথ ঘোষ

TankiBazzমিথলজিPhoenix,খোঁজাখুঁজি সিরিজঃ ফিনিক্সের খোঁজে (পর্ব ১),নির্ঝর রুথ ঘোষ
রাতের আঁধার যখন মুছে যাওয়ার পথে, পৃথিবীকে একটু পরেই যখন সূর্যের আলো ছোঁবে, তখন সুবিশাল এক পাখি আপন মনে তৈরি করে যাচ্ছে তার বাসা। অতি যত্নে সে বাসা বানাচ্ছে মশলার কোয়া, লবঙ্গ আর ডালপালা দিয়ে। পাখিটির চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, অথচ কী সুন্দরই না সে দেখতে! একটু পড় যখন...