ইলিয়াম বা ট্রয়ের যুদ্ধ বা ট্রোজান ওয়ারের কথা জানে না এমন পুরাণপ্রেমী খুব কমই আছে। যুগ যুগ ধরে মানুষকে রোমাঞ্চিত করেছে ট্রয় যুদ্ধের উপাখ্যান। কিন্তু কেন বেঁধেছিল এই যুদ্ধ? প্রধান কারণ হলো ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিস, যিনি গ্রিসের স্পার্টা নগরীর রাজা মেনিলাসের সুন্দরী স্ত্রী হেলেনকে প্রলুব্ধ করে নিজ বাসভূমিতে নিয়ে যান।

ট্রোজান হর্স

 

এই ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মেনিলাসের ভাই আগামেমনন, যিনি ছিলেন গ্রিসের আর্গস নামক নগরের রাজা, গ্রিক নগরগুলোর বাকি রাজাদের আহ্বান করেন প্যারিসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে। তারপর সবাই মিলে এক হাজারটি জাহাজ নিয়ে যাত্রা শুরু করেন ট্রয়ের দিকে, উদ্দেশ্য ছিল হেলেনকে ফিরিয়ে আনা।

খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ১২৩০ অব্দে ট্রয় নগরে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। দশ বছর ধরে চলেছিলো এই যুদ্ধ। ক্লান্তিকর যুদ্ধ শেষে ট্রোজানরা যখন জয়ের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হল, তখনই যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। গ্রিসের মহাবীর অ্যাকিলিসের মৃত্যুর পরে গ্রিকরা যখন ট্রোজানদের সাথে কিছুতেই পেরে উঠছিলো না, তখন কাঠের তৈরি এক ঘোড়া যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়, তাও মাত্র এক রাতের মাঝেই। কীভাবে? সেটাই আমরা এখন বলতে যাচ্ছি!

দেশ থেকে এতদূরে এসে টানা দশ বছর ধরে যুদ্ধ করতে করতে গ্রিক সৈন্যরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেও তারা ট্রোজানদের সাথে পেরে উঠছিলো না। যুদ্ধে যখন গ্রিকদের পরাজয় হয় হয় করছে, তখন অবস্থা বেগতিক দেখে গ্রিকরা শরণাপন্ন হলো বিচক্ষণ ও বিজ্ঞ গ্রিক গণৎকার ক্যালক্যাসের কাছে। জানতে চাইল, এখন উপায় কী! ক্যালক্যাস এর আগে অ্যাকিলিস সম্বন্ধে যা ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, তা সত্য হয়েছিলো।

ক্যালক্যাস বললেন, “গায়ের জোড়ে সব কাজ সফল হয় না। মাঝে মধ্যে চালাকির আশ্রয় নিতে হয়। চালাকির মাধ্যমেই তোমাদের ট্রয় অধিকার করতে হবে।”

বাণী শুনে গ্রিক বীর ওডেসিয়াস এক চতুর পরিকল্পনা করলেন। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী এক বিরাট বড় কাঠের ঘোড়া তৈরি করা হল। মাত্র তিনদিনের মধ্যে এপিয়াস নামের একজন দক্ষ ছুতার এ ঘোড়াটি তৈরি করলেন। ঘোড়ার গায়ে খোদাই করা হল, “For their return home, the Greeks dedicate this offering to Athena”। এই ঘোড়াই পুরাণে বিখ্যাত হয়ে আছে “ট্রোজান হর্স বা ট্রয়ের ঘোড়া” হিসেবে।

বিরাট ঘোড়াটির ভেতর গ্রিকরা এক আক্রমণকারী বাহিনীকে ঢুকিয়ে দিল এবং ট্রয় নগরের দেয়ালের বাইরে তা ফেলে রাখলো। এরপর তারা তাদের তাবুগুলোকে পুড়িয়ে ফেলে রাতের আঁধারে টেনিডোস নামক একটা দ্বীপে চলে গেল, যেটা ছিল ট্রয়ের খুব কাছে। সাইনন নামের এক গ্রিক সৈন্যকে রেখে যাওয়া হল আলো জ্বালিয়ে তাদের সংকেত দেবার জন্য।

ওডেসিয়াস সাইননকে সমস্ত কিছু শিখিয়ে রেখে গেছেন। যখন ট্রয়ের রাজা তাকে দেখতে পেয়ে ধরে নিয়ে যাবে, তখন কীভাবে কোন গল্প ফাঁদতে হবে ইত্যাদি। তো ট্রয়ের রাজা প্রায়াম যখন সাইননকে ধরে নিয়ে এলেন, সে ওডিসিউসের শেখানো গল্প গড়গড় করে বলে গেল। আরো বলল, “আমাকে বলি দেয়ার সমস্ত ব্যবস্থাই পাকা হয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু ঐ রাত্রে আমি শিবির থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হই আর জংগলের ভেতর গিয়ে লুকিয়ে থাকি। গ্রিকরা চলে যাবার পর আমি বেরিয়ে আসি।”

সাইননের বানানো কাহিনী সকলে বিশ্বাস করল। রাজা তাকে অভয় দিলেন। কৃতজ্ঞতার ভান করে সাইনন গল্পের দ্বিতীয় অংশটি জানাল। সে বলল, “এই কাঠের ঘোড়াটিকে গ্রিকরা রেখে গেছে দেবী এথিনার প্রতি নৈবেদ্য হিসেবে। তবে এর পেছনে তাদের একটা অসৎ উদ্দেশ্য আছে। তারা চায় ট্রয়বাসীরা এটিকে ধ্বংস করুক যাতে দেবী এথিনা ট্রয়ের উপর ক্রুদ্ধ হন। কিন্তু আপনি ভেবে দেখুন, নগরীর অভ্যন্তরে এথিনার যে মন্দির আছে, সেখানে ঘোড়াটি নিয়ে গেলে দেবী তো গ্রিকদের বদলে ট্রয়বাসীদের প্রতিই অনুগ্রহ দেখাবেন, তাই না?”

এই চতুর গল্পের চরম ফল ফলল সঙ্গে সঙ্গে, আর এভাবেই সফল হলো ওডিসিউসের ধূর্ত কৌশল। দশ বছরের যুদ্ধে যা সম্ভব হয়নি, সেই দুঃসাধ্য সাধন হলো একটি বানোয়াট গল্পের মাধ্যমে।

ট্রয়বাসী আনন্দ-উল্লাস করতে করতে ঘোড়াটিকে নগর-দেয়ালের অভ্যন্তরে নিয়ে এলো। নিয়ে গেল এথিনার মন্দিরের চত্বর পর্যন্ত। তারা বুঝতেই পারেনি যে, ঘোড়াটি গ্রিক সৈন্য দ্বারা পরিপূর্ণ।

ঘোড়াটি এতবড় করে বানানো হয়েছিলো যেন শহরের মূল ফটক ভেঙ্গে এটিকে শহরের ভিতরে প্রবেশ করাতে হয়। মধ্যরাতে অন্ধকার মন্দির চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা কাঠের ঘোড়ার পেটের দিকে খুলে গেল একটি দরজা। বেরিয়ে এলো পঞ্চাশ জন দুর্ধর্ষ গ্রিকযোদ্ধা, আর তাদের নেতা মহাবীর ওডিসিউস। তারা পা টিপে টিপে নগরীর মূল ফটকের দ্বার খুলে দিল। সাথে সাথে বাইরে অপেক্ষমান গ্রিকবাহিনী ঢুকে পড়ল ঘুমন্ত নগরীতে।

সামনে যাকে পেল, তাকেই হত্যা করল তারা। বিভিন্ন ভবনে একসাথে লাগিয়ে দিল আগুন। পরাজিত হলো ট্রয়বাসীরা। একদা ইউরোপ মহাদেশের সবচেয়ে সম্পদশালী নগরী ট্রয় একরাতের মধ্যে জ্বলে পুড়ে পরিণত হলো ধ্বংসস্তুপে। অনাদিকাল ধরে মানুষ স্মরণ করবে ট্রয়ের সেই ভয়াল কালো রাত্রের কথা এবং কাঠের ঘোড়া তথা “ট্রোজান হর্স” জীবন্ত হয়ে থাকবে পুরাণের পাতায় পাতায়।

লিখেছেনঃ নাজমুল হাকিম

TankiBazzমিথলজিট্রয়,ট্রোজান হর্স
ইলিয়াম বা ট্রয়ের যুদ্ধ বা ট্রোজান ওয়ারের কথা জানে না এমন পুরাণপ্রেমী খুব কমই আছে। যুগ যুগ ধরে মানুষকে রোমাঞ্চিত করেছে ট্রয় যুদ্ধের উপাখ্যান। কিন্তু কেন বেঁধেছিল এই যুদ্ধ? প্রধান কারণ হলো ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিস, যিনি গ্রিসের স্পার্টা নগরীর রাজা মেনিলাসের সুন্দরী স্ত্রী হেলেনকে প্রলুব্ধ করে নিজ বাসভূমিতে নিয়ে...