বীর যোদ্ধা ‘জাল’-এর বিভিন্ন অভিযানের বর্ণনা দেয়া আছে পারসীয় পুরাণ ‘শাহনামা’ নামক গ্রন্থে। পারস্যের কবি ‘ফেরদৌসি’ ৯৭৭ থেকে ১০১০ খ্রিস্টাব্দের মাঝে লিখেছিলেন এই মহা-কাব্যগ্রন্থটি। এই মহা-কাব্যগ্রন্থের বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনীর সময়কাল পৃথিবী সৃষ্টির সময় হতে খৃস্টীয় সপ্তম শতক পর্যন্ত বিস্তৃত। যাই হোক, এই গ্রন্থে জালের বিভিন্ন অভিযানের পাশাপাশি বর্ণিত আছে রাজকুমারী ‘রুদাবাহ’-এর সাথে তার প্রেম কাহিনীও। আমরা এখন জানবো সেই কাহিনীটা সম্পর্কে।

আ

জাল এবং রুদাবাহ (পারসীয় পুরাণ)

জালের পিতা ছিলো আরেক পারসীয় বীর সম্রাট ‘শাম’। জাল যখন জন্ম নেয়, সে ছিলো পুরো শ্বেতকায় এক ব্যক্তি। তার চুল ছিলো বরফের মতো সাদা। শরীরের চামড়াও ভীষণ রকমের ফর্সা। এসব দেখে পিতা শামের বিশ্বাস হয়ে গেলো, তাদের সংসারে ‘দাইওয়া’ বা অপদেবতার এক বংশধর জন্ম নিয়েছে। ফলে শাম তার পুত্র জালকে পরিত্যাগ করলো। তাকে ছেড়ে আসা হলো পারস্যের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ‘দামোভান্দ’-এ। সদ্যোজাত শিশু জালকে তখন খুঁজে পেলো ‘সিমারগ’ নামক এক পৌরাণিক পাখি। এদের বিশালত্ব সম্পর্কে বলা হয়- এরা যখন ডানা মেলে আকাশে উড়াল দেয়, তখন নিচের পুরো ভূমি অন্ধকার হয়ে যায়। তাছাড়া এরা প্রাচীন সব গুপ্তজ্ঞানের অধিকারী হয়। পারস্যের বিভিন্ন পুরাণে এদের জ্ঞানী পাখি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। এদেরকে অনেক সময় পৌরাণিক ‘ফিনিক্স’ পাখির সাথে তুলনা করা হয়।

যাই হোক, সেই সিমারগ পাখি তার বাসায় নিয়ে যায় জালকে। তার তত্ত্বাবধানে বড় হতে থাকে জাল। মোহনীয় রূপের পাশাপাশি অস্বাভাবিক শক্তিমত্তারও প্রকাশ ঘটতে থাকে তার শরীরে। দামোভান্দ পাহাড়ের আশপাশ দিয়ে চলাচলকারী বিভিন্ন ব্যবসায়ীর মারফতে মনুষ্য সমাজে রটে যায় এক সুদর্শন পুরুষের গল্প। সম্পূর্ণ সাদা চুলের অধিকারী এক দেবতুল্য পুরুষ নাকি থাকে দামোভান্দের পাহাড় চূড়ায়। ধীরে ধীরে এই কাহিনী ছড়াতে ছড়াতে গিয়ে পৌঁছালো সম্রাট শামের কানে। সে কৌতূহলী হয়ে দেখতে চাইলো মানুষটাকে। তাই গিয়ে উপস্থিত হলো দামোভান্দ পাহাড়ের নিকট।

জ্ঞানী সিমারগ পাখিটা বুঝতে পেরেছিলো সন্তানের মতো বড় করে তোলা জালের সাথে তার বিচ্ছেদের সময় ঘনিয়ে আসছে। তাই সম্রাট শাম পাহাড়ের নিকট আসার আগেই জালকে তার জন্মের সময়কার সব কাহিনী খুলে বললো পাখিটা। বললো, এখন বহু বছর পরে আবার তার সাথে তার পিতার সাক্ষাত হবে। তাই এখানেই বিদায়!
এরপরে পাখিটা তার নিজের শরীর হতে তিনটে পালক নিয়ে উপহার দিলো জালকে। বললো, যখনই সে কোনো বিপদে পড়বে, তখন যেন এই পালক প্রতিবারে একটা করে পোড়ায়। তাহলে সিমারগ পাখিটা তার উপকারে ছুটে আসবে। সবশেষে পাহাড়ের চূড়া হতে মাটিতে নামিয়ে দিলো জালকে সিমারগ পাখিটা। সম্রাট শাম এসে দাঁড়ালো তার সামনে। তুষার শুভ্র চুল আর শরীরের গঠন দেখেই চিনে নিলো সে তার পুত্রকে। বহু বছর পরে আবার মিলিত হলো পিতা-পুত্র। বহু বছর আগের কৃতকর্মের জন্যে পুত্র জালের কাছে ক্ষমা চাইলো পিতা শাম। দু’জনে মিলে ফিরে গেলো নিজ রাজ্যে। সেখানে শাম তার পুত্র জালকে পারস্যের নতুন সম্রাট হিসেবে অভিষিক্ত করলো।

জালের অধীনে পারস্য সাম্রাজ্যের ভূয়সী উন্নতি সাধিত হয়েছিলো। জাল ছিলো দয়ালু এবং বিচক্ষণ এক শাসক। কিন্তু একপর্যায়ে তার এই সব রাজকার্যের উপর থেকে মন উঠে গেলো। ইচ্ছে হলো দুনিয়া ভ্রমণে বের হবার। একদিন সে তাই বের হয়ে গেলো প্রাসাদ ছেড়ে। যাত্রা শুরু করলো পারস্যের পূর্বদিকের রাজ্যগুলোর উদ্দেশ্যে। ঘুরতে ঘুরতে বহুদিন পরে এসে হাজির হলো কাবুলে। কাবুলের রাজার সাথে সম্রাট শামের পূর্ব শত্রুতা ছিলো। কাবুলের রাজার জন্ম হয়েছিলো ‘যাহহাক’ নামক এক দানবের পেটে। জাল পিতা শামের সাথে কাবুলের রাজার এই শত্রুতার কথা জানতো। তাই এই রাজ্যে এসে জাল এক বনের মাঝে নিরিবিলি তাঁবু গাঁড়লো।

এই বনের মাঝেই একদিন একদল নারী ঘুরতে এসেছিলো। সেই দলের একজনকে দেখে বুকে মোচড় দিয়ে উঠলো তরুণ সম্রাট জালের। অসাধারণ রূপসী সেই নারীরও চোখে পড়েছিলো জালকে। সেইদিনের মতো কিছুক্ষণ ঘুরেফিরে এরপরে চলে গেলো দলটা। কিন্তু যে দুই জোড়া চোখ একে অপরকে দেখেছিলো মুগ্ধতা নিয়ে, সেই চোখ জোড়া বিনিদ্র রজনী কাটালো। পরদিন সেই নারীটার তিনজন সখী এসে হাজির হলো বনে সম্রাট জালের নিকটে। আলাপ জমালো তার সাথে। তার পরিচয় জেনে নিলো। জালও জানলো, সেই রূপসী নারীটার নাম হচ্ছে ‘রুদাবাহ’। তারপরে ফিরে গেলো আবার। এরপর দিন আবার এলো। জানালো, তাদের বান্ধবী তো জালের প্রতি পাগল হয়ে গেছে রুদাবাহ। সে চাইলে রুদাবাহ তার সাথে গোপন সাক্ষাতে ইচ্ছুক।

জাল সম্মতি দিলো। তিন বান্ধবীর সাথে গেলো সে রুদাবাহ-র সাক্ষাত লাভে। গিয়ে তার চক্ষু চড়কগাছ। সে হাজির হয়েছে কাবুলের রাজার প্রাসাদের সামনে। রুদাবাহ কাবুলের সেই রাজার কন্যা!

প্রাসাদের বাগানের এক কোণায় উপরের ব্যালকনি হতে নিচে রাজকুমারী রুদাবাহ ফেলে দিয়েছিলো নিজের লম্বা চুল। সেটাকে দড়ি বানিয়ে উপরে উঠে এলো জাল। অবশেষে আবার দেখা হলো দু’জনের। জাল বিশ্ব ভ্রমণ বাদ দিয়ে পড়ে রইলো সেই রাজ্যে। গোপনে দেখা করে যেতে লাগলো রাজকুমারী রুদাবাহ-এর সাথে। একপর্যায়ে তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলো। কিন্তু কীভাবে কী? তাদের পিতারা তো একে অপরের শত্রু!

তবুও দু’জনেই সিদ্ধান্ত নিলো নিজ নিজ পিতাকে জানানোর। জাল ফিরে এলো রাজধানীতে। এসে দেখলো যুদ্ধের জন্যে সাজ সাজ রব চলছে। তার পিতা শাম নিজে বাহিনী নিয়ে বের হচ্ছে যুদ্ধের জন্যে। কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ? খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, কাবুলের রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ। ব্যবিলনীয় অপদেবতা ‘যাহহাক’-এর এই বংশধর বহুদিন ধরেই সম্রাটের অবাধ্য হয়ে চলছে। তাই তাকে শায়েস্তা করতে এই যুদ্ধসাজ। জালের আত্মা শুকিয়ে গেলো। তবুও সে নাছোড়বান্দা হয়ে পিতা শামকে বলে ফেললো মনের সব কথা। সে কাবুলের রাজার কন্যা রুদাবাহকে বিয়ে করতে চায়।

প্রচণ্ড রাগে ফেটে পড়েছিলো জাল এবং রুদাবাহ, দু’জনের পরিবারই। তারা সরাসরি অমত জানালো এই প্রস্তাবে। কিন্তু প্রেমিকযুগলও অটুট থাকলো তাদের সিদ্ধান্তে। সবশেষে উপায় না পেয়ে দুই রাজাই দ্বারস্থ হলো জ্যোতিষীর। রাজ-জ্যোতিষীরা জানালো, এদের দু’জনের বিয়ে দিলে যে সন্তান জন্ম হবে, সে হবে দিগ্বীজয়ী বীর। অবশেষে একটু মন গললো দুই পরিবারের। তবুও কাবুলের রাজা জালকে পরীক্ষা করে নিতে চাইলো। তাকে আমন্ত্রণ জানানো হলো রাজদরবারে। সেখানে জালকে অনেক অনেক প্রশ্ন করলো সভার পণ্ডিতেরা। জ্ঞানী সিমারগ পাখির দেয়া সমস্ত শিক্ষা দিয়ে সেই সব প্রশ্নের সমুচিত জবাব দিলো জাল। তার পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে গেলো সবাই। এরপরে আয়োজন করা হলো এক টুর্নামেন্টের। সেখানেও জালকে তার শারীরিক শক্তিমত্তা প্রদর্শন করতে হয়েছিলো।

অবশেষে বিয়ে হয়ে গেলো জাল এবং রুদাবাহ-র। দুই শত্রু পরিবার বন্ধুতে পরিণত হলো। তাদের ভালোবাসার সংসারে এলো নতুন সন্তানের আগমনী ঘোষণা। ভীষণ খুশিতে মত্ত এই দম্পতি। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলো তাদের সন্তানের জন্মক্ষণের জন্যে। জন্মের সময় ভীষণ সংকটে পড়ে গেলো রুদাবাহ-র শরীর। ধাত্রী জানালো, এতো বলিষ্ঠ শিশু সন্তান সে আর আগে কখনো দেখেনি। এই সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যেতে পারে রুদাবাহ। প্রাণাধিক প্রিয় স্ত্রীর জন্যে ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলো জাল। কী করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।

হঠাৎ তার মনে পড়লো সিমারগ পাখির কথা। তিনটে পালকের একটা বের করে পোড়ালো সে খানিকটা। সাথে সাথে পাখিটা উড়ে এসে হাজির হলো জালের সামনে। জাল পরামর্শ চাইলো সিমারগ পাখির। পাখিটা বললো, সে যেন তার দেয়া পালকগুলোর একটা রুদাবাহ-র পেটের উপরে এমাথা-ওমাথা লম্বালম্বি ছুঁয়ে দেয়। জাল তা-ই করলো। এরপরেই কোনো প্রকার ব্যাথা ছাড়া অনায়াসেই জন্ম নিলো তাদের শিশুসন্তান। জন্মকালেই বিশাল স্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে এসেছিলো সে। তার নাম রাখা হলো ‘রুস্তম’। এই রুস্তম পরে পারস্যের আরেক বীর সম্রাট হয়েছিলো। তার অসাধারণ শক্তিমত্তার কথা ছড়িয়ে পড়েছিলো দিকে দিকে।

তথ্যসূত্র:
১। http://classics.mit.edu/Ferdowsi/kings.4.zalrudabeh.html
২। https://en.wikipedia.org/wiki/Zāl
৩। https://en.wikipedia.org/wiki/Rudaba
৪। https://en.wikipedia.org/wiki/Simurgh
৫। https://en.wikipedia.org/wiki/Daeva

লিখেছেন – রিজওয়ানুর রহমান প্রিন্স

TankiBazzমিথলজিZāl Rudaba mythology
বীর যোদ্ধা ‘জাল’-এর বিভিন্ন অভিযানের বর্ণনা দেয়া আছে পারসীয় পুরাণ ‘শাহনামা’ নামক গ্রন্থে। পারস্যের কবি ‘ফেরদৌসি’ ৯৭৭ থেকে ১০১০ খ্রিস্টাব্দের মাঝে লিখেছিলেন এই মহা-কাব্যগ্রন্থটি। এই মহা-কাব্যগ্রন্থের বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনীর সময়কাল পৃথিবী সৃষ্টির সময় হতে খৃস্টীয় সপ্তম শতক পর্যন্ত বিস্তৃত। যাই হোক, এই গ্রন্থে জালের বিভিন্ন অভিযানের পাশাপাশি বর্ণিত আছে...